উচ্চশিক্ষার্থে ঘর ছাড়তে হয় শিক্ষার্থীদের, এমনকি দেশও। নতুন পরিবেশে নতুন সদ্য পরিচিত মানুষই হয়ে ওঠে পরিবার। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা দ্বারা এটি প্রমাণিত যে, স্বল্প পরিচয়ে পরিবারের মতো হয়ে ওঠা এই মানুষগুলো মোটেও নিরাপদ নয়। কী দেশে বা বিদেশে, শিক্ষার্থীদের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু ঘটছে নিজের ভাড়া বাসায়, ফ্ল্যাটে; কখনো ফ্ল্যাটমেট বা প্রতিবেশীর হাতে। নতুন পরিবেশে নিরাপদে থাকার জন্য প্রয়োজন তাই সতর্ক থাকা। ফ্ল্যাটমেট বা মেসের সদস্য বাছাইয়ের সতর্কতামূলক কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে জানিয়েছেন ফরেনসিক সাইকোলজিস্ট মো. মিরাজ হোসেন
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে কাছের মানুষ, গৃহকর্মী, সন্তানের টিউটর, রুমমেট বা জীবনসঙ্গী দ্বারা আক্রান্ত হওয়াজনিত অপরাধের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা শুরু হয় অন্ধ বিশ্বাস থেকে, যেখানে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করা হয় না। বাস্তবতা হলো, যেকোনো সম্পর্ক বা সহাবস্থানের আগে তথ্য যাচাই + আচরণ বিশ্লেষণ + সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝা এই তিনটি ধাপ অপরিহার্য।
প্রথম ধাপ, পরিচয় ও ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), ছবি, মোবাইল নম্বর, স্থায়ী ঠিকানা; এসব তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা জরুরি। সম্ভব হলে তার পরিবার বা পূর্বপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলে নিন। অনেক ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য ‘জিম্মাদার’ বা রেফারেন্স ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয় ধাপ, আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ (Behavioral Profiling)
একজন মানুষের আসল চিত্র তার কথায় নয়, আচরণে ধরা পড়ে। লক্ষ করুন
রাগ নিয়ন্ত্রণ কেমন, ছোট বিষয়ে মিথ্যা বলে কি না, দায়িত্ব নেয় নাকি এড়িয়ে যায়, এবং অন্যদের (যেমন ওয়েটার, গার্ড, ড্রাইভার) সঙ্গে তার আচরণ কেমন।
কিছু স্পষ্ট সতর্ক সংকেত (Red Flag) আছে কথায় অসামঞ্জস্য, সবকিছুতে নিজেকে ভিকটিম হিসেবে দেখানো, অতিরিক্ত গোপনীয়তা, কিংবা আক্রমণাত্মক শরীরী ভাষা (যেমন রাগান্বিত দৃষ্টি, শক্তভাবে হাত বাঁধা রাখা)। এগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়।
তৃতীয় ধাপ, সামাজিক বৃত্ত ও জীবনধারা বোঝা
একজন ব্যক্তি কাদের সঙ্গে সময় কাটায়, তার বন্ধু বা সামাজিক পরিম-ল কেমন, এগুলো তার চরিত্রের শক্ত ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে লাইফস্টাইল ম্যাচিং গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জীবনযাত্রার ধরন, মাদক বা জুয়া সংক্রান্ত অভ্যাস, এসব ক্ষেত্রে বড় অমিল থাকলে ভবিষ্যতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
চতুর্থ ধাপ, আর্থিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক আচরণ যাচাই
ব্যক্তির আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ, এবং সামাজিক জীবনে ভন্ডামি (hypocrisy) আছে কি না তা খেয়াল করুন। সোশ্যাল মিডিয়া এখানে কার্যকর সূচক হতে পারে।Facebookবা Instagram-এ তার আচরণ, আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বা উগ্র মতাদর্শের উপস্থিতি, কিংবা বাস্তব জীবনের সঙ্গে অনলাইনের অমিল, এ সবই গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দেয়।
লাইফ পার্টনার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো আরও গভীর। এখানে যুক্ত হয় পরিবার, অর্থ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ; আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা; দ্বন্দ্ব সমাধানের ধরন; এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা (ক্যারিয়ার, সন্তান, জীবনধারা)। একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা মনে রাখা দরকার, প্রেমের সময় যে ব্যক্তিত্ব দেখা যায়, বিয়ের পর তা অনেক সময় বদলে যায়।
তাই চাপের পরিস্থিতিতে stress situation) তার আচরণ কেমন, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
সবশেষে, নিজস্ব সীমারেখা (boundary) স্পষ্ট করা এবং প্রয়োজন হলে আইনি বা পেশাদার সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ফরেনসিকবিডি থেকে মানব আচরণ বিশ্লেষণ, লাই ডিটেকশন বা লয়্যালটি চেকিং-এর মতো সেবা গ্রহণ করাও একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হতে পারে।
নিরাপদ থাকার জন্য শুধু ভালো মানুষ খোঁজা যথেষ্ট নয়। সচেতন যাচাই, পর্যবেক্ষণ এবং সিস্টেমেটিক সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
লেখক : পিএইচডি গবেষক (ফরেনসিক সাইকোলজি), পরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ফরেনসিক সাইকোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ফরেনসিকবিডি)