হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে একটি অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র (ফিল্ড হাসপাতাল) স্থাপনের প্রস্তাব দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ বিষয়ে গত সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দেওয়া হয়। তবে মাঠ বরাদ্দে প্রশাসনের ইতিবাচক অবস্থান থাকলেও বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) আপত্তিতে বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এতে এক সপ্তাহ বিলম্বে বিকল্প স্থানে স্থাপন করা হয়েছে হামের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মাঠ ব্যবহারের বিষয়ে ডাকসু নেতাদের আপত্তির কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের মাঠে স্থাপন করা যায়নি হামের অস্থায়ী এ চিকিৎসাকেন্দ্র। অবশেষে ঢাকা মেডিকেলের অডিটরিয়াম চত্বরে ২০ শয্যাবিশিষ্ট এ অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে জায়গা না হওয়া হামে আক্রান্ত শিশুদের সেখানে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সেই সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারকে জানালেও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। মার্চে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে, বিশেষ করে রাজশাহীতে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর বর্তমান সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয় এবং দেশের হাসপাতালগুলোতে হামের চিকিৎসা ব্যবস্থাও সম্প্রসারণ করা হয়।
এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে প্রায় তিনশতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিকল্পনা নিয়েছে, যার অংশ হিসেবে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আপাতত ঢামেকে ২০ শয্যার করা হয়েছে। প্রয়োজন বুঝে আরও ফিল্ড হাসপাতাল করার প্রস্তুতি রয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. সৈয়দ আবু আহমেদ শফি বলেন, পরিস্থিতি কখনো যদি খারাপ হয়, তখন আমরা কি করব? সে জন্য বলা যায়, আগেই একটা ট্রায়াল দেওয়া। আপাতত ঢামেকে ২০ শয্যার ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে। কয়েকটি স্থান দেখে রাখা হয়েছে, প্রয়োজনে যত বাড়ানো দরকার, বাড়ানো হবে। সরকারের সে বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। তিনি বলেন, দুর্যোগময় পরিস্থিতি সামাল দিতে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। টিকা নিয়ে আমরা এমনিতেই একটি জটিলতা ফেস করেছি। সামনে যাতে আর কোনো রকম জটিলতা ফেস করতে না হয়, সে জন্য আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি রাখছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হামের চিকিৎসার জন্য অনেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করছেন এমনকি ঢাকার বাইরে থেকেও রোগীরা আসছেন। এতে চাপ বাড়ছে হাসপাতালটিতে। পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেলে শয্যা সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে ডেকে সার্বিক পরিস্থিতি শুনে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে ঢাকা মেডিকেলের আশপাশের বড় জায়গা নিয়ে একটি অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র বা একটি ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের নির্দেশনা দেন। এ অবস্থায় রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিকল্প হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের মাঠে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলামকে চিঠি দেওয়া হয়।
পরে বিষয়টি নিয়ে ডাকসুর মতামত নিতে উপাচার্য দায়িত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশাকে। তিনি ডাকসুর প্রতিনিধি ও শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে বৈঠকে উপস্থিত ডাকসুর নেতারা মাঠ বরাদ্দের বিষয়ে আপত্তি জানান।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে ডাকসুর জিএস ও শিবির নেতা এসএম ফরহাদ বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কোনো বাধা প্রদান করিনি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আসলে কতদিনের জন্য মাঠটি চাইছে, সেটি তো জানায়নি। অনির্দিষ্টকালের জন্য তো মাঠ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়।’
ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। আমরা মাঠ আপাতত বরাদ্দ দিতে চাইছি না। এখন তো খেলাধুলার মৌসুম। এ মুহূর্তে মাঠ বরাদ্দ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সমাধান হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের ভেতরে নিয়ে গেছে।
উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘আমরা ডাকসুর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা এ মুহূর্তে মাঠ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘এটি এখনো প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভাবা হয়েছে। তবে আশা করছি, দ্রুতই হাম নিয়ন্ত্রণে আসবে, তখন এটির প্রয়োজন নাও হতে পারে।’
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হামের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়লের (শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠকে বিবেচনা করেছিলাম। কিন্তু সেখানে আপত্তি থাকায় অবশেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অডিটরিয়াম চত্বরে স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।