হিস্টোপ্যাথলজির হিমঘরে আটকে আছে কুষ্টিয়ার কিশোরী মায়ার হত্যা রহস্য। সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও ফরেনসিক কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক ভূমিকা অবহেলায় দীর্ঘ ৯ মাস ধরে পরে আছে নিহতের ভিসেরা নমুনা। অপেক্ষার পথ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন নিহত কিশোরীর পরিবার। পুলিশের করা ইউডি মামলা (অপমৃত্যু) আর হত্যা মামলায় রূপ নিচ্ছে না। পুলিশের দাবি, ভিসেরা রিপোর্ট হাতে না পাওয়ায় ঝুলে আছে শত শত অপমৃত্যু মামলা। অপরাধীরাও গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
২০২৫ সালের ৬ আগস্ট সকালে শহরের কোর্টপাড়ায় বারো শরীফ দরবারের বিপরীতে অঞ্জাত এক কিশোরীর (১৪) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় অপমৃত্যু মামলা নং ৩৬০, ৬ আগস্ট ২০২৫ নথিভুক্ত করে লাশের ময়নাতদন্তে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরন করে পুলিশ। সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে নিহত ওই কিশোরীর স্বজন মর্গে এসে লাশ সনাক্ত করে নিহতের নাম বলেন মায়া খাতুন। সনাক্তকারী কোর্টপাড়া এলাকার বাসিন্দা বৃদ্ধা নানী আনজু বেগম জানান, নিহত কিশোরী মায়া খাতুন তার নাতনী।
আনজু বেগম জানান, ২০০৮ সালে তার মেয়ে শিরিনা খাতুনের বিয়ে হয় পাবনা জেলার কালামের সাথে। শিরিনা ১১ বছরের দাম্পত্য জীবনে ৯ বছর বয়সী কন্যা মায়া খাতুনকে রেখে প্রথম স্বামীকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যায়। এছাড়া মায়ার বাবা কালামও দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র সংসার বাঁধেন। মায়ার দায়িত্ব নেয়নি কেউই। সব হারিয়ে নি:স্ব মায়ার আশ্রয় হয় নানীর কাছে।
তিনি জানান, আমি অন্যের বাসা বাড়ীতে কাজ করে খাই। এ কারণে নাতনীকে ঠিকমত দেখাশোনা করতে পারিনি। এ সুযোগে ২০২৩ সালে কুষ্টিয়া কোট স্টেশন এলাকার চা বিক্রেতা সোহেল মাত্র ১২ বছর বয়সে মায়াকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় ধর্ষণের অভিযোগে সোহেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় সোহেল গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যায়। জেল থেকে বেড়িয়ে এসে সোহেল বিভিন্ন সময় মামলা তুলে নিতে হুমকি ও ভয় ভীতিসহ চাপ দিয়ে আসছিল। নাহলে আরও বড় ধরনের ক্ষতি করার হুমকি দিচ্ছিলো থানাপাড়া গড়াই সেতুর নিচে বসবাসকারী সোহেল।
তিনি আরও জানান, নাতনী মায়া খাতুনের হত্যাকান্ডের ঘটনায় আমি পুলিশের কাছে বারং বার হত্যা মামলা নিতে বলেছি, কিন্তু ওসি সাহেব জানায় যে ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পেলে এমনিতেই হত্যা মামলা হবে। কিন্তু ভিসেরা রিপোর্টও আসছে না হত্যা মামলাও হচ্ছে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মায়ার লাশ উদ্ধার কালে সুরতহাল রিপোর্টে পুলিশ উল্লেখ করেছে, লাশের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ১০ আগস্ট ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক নিহতের মরদেহের জখম দেখে মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং এর সাথে কি কি ধরণের অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে তা সনাক্ত করতে অধিকতর পরীক্ষার জন্য লাশের ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রসহ প্রাসঙ্গিক নমুনা হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষাগারে প্রেরণের সুপারিশ করেন।
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ আবদুল মান্নান বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ময়নাতদন্ত করে ভিসেরা নমুনা সংগ্রহ করে হিস্টোপ্যাাথলজি রিপোর্টের জন্য ফরেনসিক ল্যাবে প্রেরণ করে। কিন্তু ৯ মাস পূর্বের ঘটনার ভিসেরা রিপোর্ট এতোদিন ধরে কেনো পাওয়া যায়নি তার সঠিক কারন জানতে খোঁজ নিয়ে বলতে পারবেন। তবে সরেজমিন হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খোঁজ নিয়েও মায়া খাতুনের হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মো. কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, ক্লুলেস ইউডি (অপমৃত্যু) মামলার রহস্য উদঘাটনে হিষ্টোপ্যাথলজি রিপোর্ট বা ভিসেরা রিপোর্ট করতে নিহতের নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক ল্যাবে প্রেরণ করা হয়। সাধারণত দুই মাসের মধ্যেই এসব রিপোর্ট পুলিশের হাতে এসে পৌঁছালে রিপোর্টে চিকিৎসকের মতামতের ভিত্তিতে পুলিশ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করে থাকে। কিন্তু এই রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত ওইসব মামলার পরবর্তী অগ্রগামীতা স্থবির হয়ে থাকে। এভাবে অসংখ্য অপমৃত্যু মামলার চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল আটকে আছে। এসব ক্ষেত্রে বিলম্বের কারণটা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে।
কুষ্টিয়া জেলা সিভিল সার্জন, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পুলিশ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, ফায়ার সার্ভিস ও আদালতসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারী থেকে ২০২৬ এর এপ্রিল পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে ৬শ ৬১টি লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এসব মৃত্যু কেস হিষ্ট্রিতে উল্লেখ করা হয়েছে সড়ক ও রেল দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, হত্যা, অজ্ঞাত লাশসহ নানা ঘটনায় সংঘটিত মৃত্যু। এগুলির মধ্যে শতাধিক ইউডি (অপমৃত্যু) মামলার ভিসেরা রিপোর্ট না পাওয়ায় ওইসব মামলার পরবর্তী কার্যক্রম হিমাগারে নথিবন্ধি হয়ে ঝুলে আছে।