এ সময়ের একজন ব্যতিক্রমী ডিজাইনার ফারহানা মুনমুন। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে এখন তিনি পুরোপুরি একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। কাজ করছেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী জামদানির পোশাক ও অন্যান্য অনুষঙ্গ নিয়ে। তার রয়েছে নিজস্ব ফেসবুক পেজ। নাম তার বেনে বৌ। বৈশাখের বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যায় মালঞ্চের পাঠকদের জানালেন তার ডিজাইনার হয়ে ওঠার গল্প। এই গল্প পাঠকের সামনে তুলে ধরলেন মোহসীনা লাইজু
আমার ডিজাইনার হয়ে ওঠা হঠাৎ করে বলা যাবে না। ছোটবেলায় আমার আম্মাকে দেখতাম আমাদের জামাকাপড় নিজে সেলাই করতেন। বিশেষ করে সেই সময়ে রিসাইকেল করে আমাদের জন্য যে জামাকাপড় বানাত, সেটা আমাকে মুগ্ধ করত। পুরনো শাড়ি কেটে আমার মা আমাদের ডিজাইন দিয়ে ফ্রক বানিয়ে দিতেন। পুরনো প্যান্ট কেটে নানা ধরনের ব্যাগ বানাতেন। পুরনো পোশাক কেটে ঘরেরও নানা ধরনের অনুষঙ্গ তৈরি করতেন। এক অর্থে বলতে পারেন মায়ের কাছ থেকেই আমি এসব পেয়েছি।
এরপর যার কথা বলতে হয়, তিনি হলেন স্বনামধন্য ডিজাইনার বিবি রাসেল। আপার সঙ্গেও আমি কাজ করেছি। তিনি হাতে ধরে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন, এখনো শেখাচ্ছেন। এখনো আমি কাজ করে তার কাছে নিয়ে যাই। ভালোমন্দ তিনি ধরিয়ে দেন এবং শেখান। এ ছাড়া পোশাকের নকশা কিংবা কাটিং প্যাটান এসব অনেক কিছু আমি পড়াশোনা করতে করতেও শিখেছি। আমি যেহেতু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের নাট্যকলায় পড়েছি। সেখানে আমার পড়াশোনার মধ্যেই ছিল কস্টিউম ডিজাইন।
জামদানি নিয়ে কাজ করার একটা কারণ বলতে পারেন আমার বাড়ি যেহেতু জামদানির পীঠস্থান ডেমরায়, সেই বিষয়টাও আমার ওপর প্রভাব ফেলেছে। যখন বাড়িতে যেতাম তখন তাঁতের কারিগরদের বুনন দেখতাম। স্কলাসটিকায় চাকরি করার সময় একদিন আমার কয়েকজন সহকর্মী বলল, আমার বাড়ি যেহেতু ডেমরায় আমি যেন তাদের কয়েকটা জামদানি এনে দিই। এনে দিলাম প্রশংসাও পেলাম। এরপর প্রায়ই কারও না কারও আবদার থাকত জামদানির জন্য। এভাবে জামদানির সঙ্গে জড়িয়ে যাই।
এরপর ১৮ সালের মাঝামাঝি আমি ফেসবুক পেজ রেনোবৌ খুলি। চাকরির ফাঁকে ফাঁকে অল্পস্বল্প কাজ করছিলাম। জামদানি নিয়ে ভিডিও কনটেন্ট দেওয়া শুরু করি। ভালো রেসপন্সও পাচ্ছিলাম। ২০২০ সালের মার্চ মাসে যখন করোনার কারণে লকডাউন শুরু হয়। তখন তো ঘরের মধ্যে এক অর্থে বলা যায়। ওয়ার্ক ফরম হোমে আছি। অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছি। এর ফলে দিনের অনেকটা সময় ল্যাপটপে কাটে। ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পেজে নানা রকম পোস্ট দিতাম, ছবি পোস্ট করতাম। ক্রেতাদের প্রশ্নের জবাব দিতাম। পেজে অনেক সময় দিতে পারতাম। যদিও কোভিডের কারণে মানুষ ঘরে বসে ছিল। তারপর কমবেশি অনেকেই জামদানি কিনেছে।
এরই মধ্যে আমার পরিচিত তাঁতিরা ফোন করত আপা কাজ নেই। কাজ না করলে খাব কী, ঘরে বসে আছি। যদিও বিলাসী জিনিস জামদানি বিক্রি করেন তাঁতিরা। কিন্তু তাদের জীবনে তো বিলাসিতা নেই। আমি তখন উদ্যোগ নেই, আমি ওদের ১০টি জামদানি বিক্রি করে দেব। তখন ছোট ছোট কনটেন্ট বানিয়ে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম আমরা যদি না কিনি তাহলে ওদের জীবন চলবে কীভাবে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ১০টি জামদানি বিক্রি করে ফেললাম। এরপর আবার অর্ডার দিলাম। এভাবে কাজটা চালিয়ে গিয়েছি। আমি ন্যূনতম লাভ রেখেছি।
২ বছর আগে আমি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি বেনে বৌতে সময় দিচ্ছি। জামদানি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক নতুন নতুন উপলব্ধি হলো। যেহেতু জামদানি জিআরআই পণ্য। এর বুনন রীতি আলাদা, দাম কমিয়ে কোয়ালিটি ধরে রাখা কষ্টকর। এক কথায় জামদানি সবার জন্য নয় এবং সবসময় পরার উপযোগিতাও নেই। সব মানুষ এটা প্রেফারও করে না। আসলে এক সময় তো জামদানি রাজা-বাদশার পরিবারের লোকরাই পরতেন।
আর একটা বিষয় আমাদের জীবনযাপনে ব্যস্ততা বাড়ছেই। যুগের চাহিদা, অনেক নারীই উপলক্ষ ছাড়া শাড়ি পরেন না। এ ছাড়া এর মেইনটেন যেমন কঠিন, তেমনি কম্ফোটনেসও কম। তাই শুরুতে আমি জামদানি শাড়ি কেটে তা দিয়ে জ্যাকেট, কামিজ, প্যান্ট, স্কার্ট, ফ্রক এগুলো তৈরি করতে শুরু করলাম। জামদানির সঙ্গে পিওর হ্যান্ডলুম কটন যোগ করেছি। শুরুর দিকে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। একেকটা পোশাক তৈরি করেছি আর বিবি আপার কাছে নিয়ে গিয়েছি। তিনি হাতে ধরে ধরে অনেক কিছু দেখিয়েছেন। আসলে বিবি আপা গামছা নিয়ে কাজ করলেও তিনি এত ভালোভাবে হ্যান্ডলুম চেনেনে এটা বিস্ময়কর। তিনি হাতে না ধরেও দূর থেকে দেখে বলে দিতে পারেন এর বুনন কেমন, কেমন সুতা ব্যবহার করা হয়েছে।
পরবর্তী সময় আমি জামদানি শাড়ির বদলে কাপড় বুনন শুরু করি। এখানে আরেকটা বিষয়, জামদানি শাড়িতে যে টেকচারটা আছে সেটা শাড়িতেই থাকুক। আমি বরং কাপড়ের জন্য আলাদা করে টেকচার বেছে নিয়েছি। এই কাপড়টা একটু মোটা, পরতে আরামদায়ক এবং সহজেই ধোয়া যায় এবং ধোয়ার পরও কাপড় একই রকম থাকে। বুনন কাপড় পুরোপুরি হ্যান্ডমেইড। সুতার কাউন্ট ৩২ থেকে ৪২-এর মধ্যে রেখেছি। এর জন্য আলাদা মোটিফও করে দিচ্ছি। জামদানির প্যাঁচওয়ার্কের কাজও করছি।
পোশাকের পাশাপাশি ব্যাগ, পার্স, টেবিল ল্যাম্প, ওয়াল ফ্রেম করেছি। এসব পণ্যে আমি রিসাইকেল করেছি। আমাদের অনেকের কাছে এমন জামদানি শাড়ি আছে, যেগুলো একটু ফেসে গেছে, ছিঁড়ে গেছে। শাড়িটা বাতিল না করে এসব শাড়ি দিয়ে এমন পণ্য করছি। বিশেষ করে আমার করা ওয়াল ফ্রেমের খুব চাহিদা। এ ছাড়াও চুড়ি, টিপ, গলার মালা তৈরি করেছি। অর্থাৎ জামদানির রিসাইকেল করেছি। এই কাজটা শুধু আমি বেনে বৌর জন্য করিনি। আমি কারিগরদের পরিবারের মেয়েদেরও শিখিয়েছি। এরা বাতিল হওয়া জামদানি দিয়ে এসব তৈরি করে দুচার পয়সা উপার্জন করে নিজেদের ছোটখাটো শখ মেটাচ্ছে।
আসলে আমি কত দূর যাব, কোথায় যাব এটা তো জানি না। তবে জামদানির ডাইভারসিটি, রিসাইকেল ও আপসাইকেল করে যেতে চাই। দেশের বাইরেও আমার পণ্যের চাহিদা আছে। কিছুদিন আগে আমি ইউকেতে গিয়েছি। একটা প্রদর্শনীতে আমার তৈরি প্যান্ট একজন ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা নিয়েছেন। পরের দিন তিনি আবার এসে আমাকে বলেন, আমি আমার মেয়ের জন্য নিতে চাই। বলা যায় এটা আমার জন্য অনুপ্রেরণামূলক ঘটনা।
অনেক বছর ধরেই তো তাঁতিদের সঙ্গে কাজ করছি। ছোট-বড় সমস্যার মধ্যে দিয়ে প্রত্যেক ডিজাইনারকেই যেতে হয়। আমারও হয়েছে। প্রথম দিকে তারা যেহেতু অভ্যস্ত ছিল না তাই এ রকম কাপড় এত অল্প বুনতে চাইত না। সেই জায়গাটাতে আমার বোঝাতে হয়েছে। এখন তারা অভ্যস্ত হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে।
ব্যবসার বিনিয়োগ বলতে আমার নিজেরই। ব্যবসা করতে করতে এতদিন আমার যা লাভ হয়েছে সেটাই আবার বিনিয়োগ করেছি। এভাবেই বেনে বৌকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সম্প্রতি রেইজের সঙ্গে ট্রেনার হয়ে কাজ করছি। এখন আমার ৩টি তাঁত আছে। সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়াতে চাই। দুঃখের বিষয় হলো, জামদানি কারিগরদের ছেলেমেয়েরা এই কাজে আসছে না। তারা পড়াশোনা করে অন্য কাজ বেছে নিচ্ছে। কেউ কেউ দেশের বাইরে যাচ্ছে। আমি চাই জামদানি নিয়ে বংশপরম্পরায় আগ্রহ থাক। কারিগরদের ট্রেনিং দিয়ে আরও দক্ষ করে তোলা দরকার। সরকারি-বেসরকারি সবারই এগিয়ে আসতে হবে।
আমি মনে করি, ডাইভারসিটির মধ্য দিয়ে জামদানি টিকে থাকুক। আর শাড়ি আছে, শাড়ি থাকুক। বেনে বৌ হচ্ছে হলুদিয়া পাখির আরেক নাম। আমি চাই আমার বেনে বৌকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরের মানুষ চিনুক-জানুক।