তপ্ত রোদে সোনামণির সুরক্ষা

বৈশাখী সূর্যের রুদ্ররূপ আর গুমোট গরমে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকছে আমাদের সোনামণিরা। বড়দের শরীর প্রকৃতির এই প্রতিকূলতা সইতে পারলেও, শিশুদের কোমল শরীর দ্রুতই হার মানছে তীব্র তাপপ্রবাহের কাছে। ঘরে ঘরে এখন সর্দি-জ্বর, ডিহাইড্রেশন আর ঘামাচির মতো উপসর্গগুলো যেন নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাম। কিন্তু একটু সচেতনতা আর জীবনযাত্রায় ছোট কিছু পরিবর্তনই পারে এই দাবদাহের মাঝেও আপনার শিশুর হাসিমুখ ধরে রাখতে।

পোশাকে আরাম আর স্বস্তি

গরমে শিশুর প্রশান্তির প্রথম শর্ত হলো সঠিক পোশাক। এ সময় শিশুকে অবশ্যই পাতলা এবং ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরাবেন। সুতি কাপড় ঘাম দ্রুত শোষণ করে এবং শরীরে বাতাস চলাচলে সাহায্য করে। গাঢ় রঙের বদলে হালকা নীল, সাদা বা ঘিয়ে রঙ বেছে নিন, কারণ গাঢ় রঙ তাপ বেশি শোষণ করে। অতিরিক্ত নকশা, লেস বা সিন্থেটিক কাপড় শিশুর ত্বকে ঘামাচি ও র‌্যাশ তৈরি করতে পারে। বাইরে বের হলে রোদের সরাসরি তাপ থেকে বাঁচাতে চওড়া হ্যাট বা টুপি ব্যবহার নিশ্চিত করুন।

খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ সতর্কতা

তীব্র গরমে শিশুদের হজম শক্তি কমে যায় এবং শরীর দ্রুত পানি হারায়। তাই তাদের খাদ্য তালিকায় বিশেষ নজর দিতে হবে তরল খাবারের জোগান : শিশুকে বারবার পানি পান করান। পানির পাশাপাশি ডাবের পানি, ঘরে তৈরি লেবুর শরবত বা চিনির পরিমাণ কম রেখে ফলের রস দিন। ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধই পর্যাপ্ত পানির চাহিদা পূরণ করে।

সহজপাচ্য আহার : অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন। দুপুরে পাতলা খিচুড়ি, সবজি স্যুপ বা দই-চিড়ার মতো ঠান্ডা ও পুষ্টিকর খাবার শিশুকে সতেজ রাখবে।

মৌসুমি ফল : তরমুজ, বাঙ্গি বা শসার মতো পানিজাতীয় ফল শিশুদের জন্য দারুণ উপকারী। তবে খেয়াল রাখবেন কাটা ফল যেন বেশিক্ষণ বাইরে না থাকে, এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

বদলে ফেলুন দৈনন্দিন রুটিন

রোদের তীব্রতা মাথায় রেখে শিশুর প্রাত্যহিক রুটিন সাজানো জরুরি।

গোসলের নিয়ম : শিশুকে প্রতিদিন পরিষ্কার ও স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে গোসল করান। অতিরিক্ত গরম লাগলে দিনে দুবার ভিজে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে দিতে পারেন। তবে গোসলের পর যেন খুব বেশি ঠান্ডা না হয়, তাতে হুট করে ঠান্ডা লাগার ভয় থাকে।

ঘরবন্দি দুপুর : বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদের তেজ সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় শিশুকে নিয়ে পার্কে বা শপিংমলে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। ইনডোর গেম বা ইনডোর বিনোদনের মাধ্যমে তাকে ব্যস্ত রাখুন।

আরামদায়ক ঘুম : শিশুর শোয়ার ঘর যেন পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের উপযোগী থাকে। এসি ব্যবহার করলে তাপমাত্রা ২৫-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামাবেন না এবং এসির বাতাস যেন সরাসরি শিশুর গায়ে না লাগে।

পরিচ্ছন্নতা ও ত্বকের যত্ন

ঘাম ও ধুলোবালি থেকে শিশুদের ত্বকে বিভিন্ন ফাঙ্গাল ইনফেকশন হতে পারে। স্নানের পর শরীর ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। পাউডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধান হোন, কারণ ঘামের সঙ্গে পাউডার মিশে লোমকূপ বন্ধ হয়ে ত্বক আরও বেশি ঘেমে যায়। প্রস্রাব করার পর বেশিক্ষণ ডায়াপার পরিয়ে রাখবেন না, এতে র‌্যাশ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

এত সব যত্নের পরও যদি শিশু অস্বাভাবিকভাবে ঝিমিয়ে পড়ে, গায়ের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায় কিংবা বমি শুরু হয়, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, শিশুদের ডিহাইড্রেশন খুব দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই চলবে, কিন্তু আমাদের একটু বাড়তি মনোযোগ দিতে পারে শিশুর সুরক্ষা। সঠিক খাবার, আরামদায়ক পোশাক আর পরিচ্ছন্নতা এই তিনের সমন্বয়ই হোক এবারের গরমে আপনার সন্তানের সুস্থ থাকার মন্ত্র।