চুক্তির নামে মালয়েশিয়ায় ‘অন্তর্বর্তী’ আনন্দ ভ্রমণ

মালয়েশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে সার আমদানির জন্য চুক্তি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সার আমদানি না হলেও চুক্তি উপলক্ষে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক দল কর্মকর্তা মালয়েশিয়ায় আনন্দ ভ্রমণ করে এসেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে যখন বাংলাদেশ সার আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এ ধরনের নিষ্ফল চুক্তি কার স্বার্থে করা হয়েছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে খোদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেই।

জানা গেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই কুয়ালালামপুরের মান্দারিন ওরিয়েন্টাল হোটেলে বিএডিসি এবং মালয়েশিয়ার ফেলক্রা নিয়াগা এসডিএনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এর আলোকে দুই লাখ ৮০ হাজার টন ডিএপি ও সমপরিমাণ টিএসপি সার আমদানি করার কথা। এর এক ছটাকও এখন পর্যন্ত আমদানি হয়নি। 

ফেলক্রা নিয়াগা এসডিএন বিএইচডি হলো মালয়েশিয়ার একটি কৃষিভিত্তিক কোম্পানি, যা ফেলক্রা বেরহাদ নামের একটি কোম্পানির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সারের ব্যবস্থাপনা, বনায়ন ও কৃষিভিত্তিক রাসায়নিক পণ্য সরবরাহের কাজ করে। স্থানীয়ভাবে সরবরাহের জন্য উৎপাদন ও আমদানিও করলেও প্রতিষ্ঠনটির কোনো দেশে সার রপ্তানির নজির নেই। অথচ এই কোম্পানি থেকেই বিপুল পরিমাণে সার আমদানির জন্য মরিয়া হয়ে জিটুজি চুক্তি করেছিল কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের আগস্টে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়ায় সরকারি সফরে যান। তার সফরের আগ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে চুক্তিটি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা এ চুক্তি নিয়ে আরও আগে থেকেই তৎপর ছিলেন। 

এ ধারাবাহিকতায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম সচিব (বর্তমানে কৃষিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা) মো. খোরশেদ আলম ও বিএডিসির ক্রয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আহমেদ হাসান আল মাহমুদ গত বছরের ২৫ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেন। মালয়েশিয়ান কোম্পানিটির খরচে এ ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল চুক্তির যাবতীয় বিষয় নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শেষ করা। এ সফরের পর চুক্তির জন্য চূড়ান্ত প্রতিনিধিদলটি মালয়েশিয়া যায়।

সে অনুযায়ী, প্রথম দলটি মালয়েশিয়ান কোম্পানির ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে সভা এবং কোম্পানি পরিদর্শন শেষে দেশে এসে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে তাদের অভিমত দেয়। সে অনুযায়ী চুক্তির সময় নির্ধারণ করা হয়। চূড়ান্ত চুক্তির উদ্দেশ্যে পরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম, বিএডিসির সাবেক চেয়ারম্যান রুহুল আমীন খানসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি দল মালয়েশিয়ায় যায়, যেখানে এ প্রতিনিধিদলের বাইরেও সাবেক কৃষি উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তির পর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন তাদের ফেসবুকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল মালয়েশিয়ার পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান দাতুক ড. সঙ্খর রাক্সাম এবং বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিএডিসির চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন খান, সেই সময়ে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. শামীম আহসান, উপ-হাইকমিশনার মোসাম্মাৎ শাহানারা মনিকা, হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (বাণিজ্যিক) প্রণব কুমার ঘোষসহ অন্য কর্মকর্তারা।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ চুক্তি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা দুই দেশের কৃষি উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এর মাধ্যমে যৌথ উদ্যোগ, গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময়, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃষি খাতে বাণিজ্যিক সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে। এর সুফল সরাসরি পৌঁছাবে দুই দেশের কৃষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের কাছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চুক্তিটি বাতিল হয়ে গেছে। কারণ টনপ্রতি সার আমদানিতে বাংলাদেশ বড় ছাড় চেয়েছিল। শেষমেশ দুই দেশ প্রতি টনে ১২ ডলার করে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল। একমত হওয়ার পরও এত ছাড় দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সার সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে চুক্তিটি অকার্যকর হয়ে গেছে।’

তিনি দাবি করেন, ‘উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া হয়নি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছিল এবং চুক্তিটি করার অনুমোদনের একটি ফাইল নোটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষর ছিল। সেটাকেই পরের চুক্তিতে রূপ দেওয়া হয়েছিল। ঊর্ধ্বতন কারও কোনো প্রভাবে কাজটি করা হয়নি।’

মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুক্তিটিই হয়েছে ভুল একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তারা রপ্তানির উপযোগী নন-ইউরিয়া সার নিজেরা উৎপাদন করে না এবং রপ্তানিও করে না। এ কারণে কর্মকর্তারা জানতেন চুক্তিটির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কারণ বাংলাদেশ সাধারণত উৎপাদক দেশ এবং সেসব দেশের সরকার মনোনীত প্রতিষ্ঠান  থেকেই জিটুজিতে সার আমদানি করে।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকার ঘনিষ্ঠ একটি পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মিলে কোম্পানিটির মাধমে সার আমদানি চুক্তি করতে উদগ্রীব ছিল। এর প্রধান কারণ কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন পাওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা না থাকায় চুক্তিটি বাতিল হয়েছে এবং তাদের আশাও পূরণ হয়নি।