একসময় এসএসসি পরীক্ষার ফল মানেই ছিল সাফল্যের উল্লাস, পাসের হার বৃদ্ধির নতুন রেকর্ড আর জিপিএ-৫ এর ছড়াছড়ি। সেই ধারায় ছন্দপতন হয় গত বছর। এবার সেই ধাক্কাকেও ছাড়িয়ে গেল ফলের পতন। এ বছর পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গতবার এ হার ছিল ৬৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে আরও ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এর আগে ২০০৭ সালে সর্বনিম্ন পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
গতকাল সোমবার ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের এই ফল প্রকাশিত হয়। ফলের এই পতন শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার গতিপথ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ মাত্র কয়েক বছর আগেও এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮০ শতাংশের ওপর। ২০২৪ সালে তা ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে এক ধাক্কায় নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। এবার আরও কমে দাঁড়াল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ। আর ২০২১ সালের রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশের সঙ্গে তুলনা করলে তা ৩১ শতাংশের বেশি দাঁড়ায়।
ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর ১১ শিক্ষা বোর্ডে ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে,
অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। শতভাগ পাস করেছে ৬৬৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠান ৩১২টি। গত বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১৯ লাখ ২৮ হাজার ১৮১ শিক্ষার্থী। পাস করেছিল ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। শতভাগ পাস করেছিল ৯৮৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শূন্য পাস ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় এবার গড় পাসের হার, জিপিএ-৫ ও শতভাগ পাস সব দিক দিয়েই পিছিয়ে রয়েছে।
পাসের হার ও জিপিএতে এগিয়ে ছাত্রীরা : এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্রী ৬৩ হাজার ৮৯৬ ও ছাত্র ৫২ হাজার ৭৮০ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এদিকে পাসের হার ও জিপিএতে এগিয়ে ঢাকা বোর্ড, তলানিতে ময়মনসিংহ ও বরিশাল। ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বোর্ড, জিপিএতেও শীর্ষে ঢাকা। এ বোর্ড থেকে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৪ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়, উত্তীর্ণ হয় ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬৪; অকৃতকার্য হয় এক লাখ ৩ হাজার ৩২০ জন। ঢাকা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন। অপরদিকে পাসের হারে সবচেয়ে তলানিতে ময়মনসিংহ বোর্ড, ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ; জিপিএ-৫ সবচেয়ে কম পেয়েছে বরিশাল বোর্ড, ২ হাজার ৭৭৮ জন।
পাসের হারে কারিগরি ও মাদ্রাসার প্রভাব : এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বছরের ব্যবধানে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় পাসের হারে বড় পতন হয়েছে, যা সামগ্রিক পাসের হারে প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। এবার তা নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরে পাসের হার কমেছে ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই চিত্র মাদ্রাসা বোর্ডেও। গত বছর দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে পতন ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ।
জানা যায়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের ঘাটতি দীর্ঘদিনের আলোচিত সমস্যা। মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানসহ সাধারণ বিষয়গুলোর পাঠদানের মান এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট রয়েছে। এনটিআরসিএর তথ্যানুযায়ী, মাদ্রাসায় শূন্যপদ রয়েছে ৪১ হাজার ৯৬৫টি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পলিটেকনিকসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ৭৩ শতাংশ শিক্ষক পদই শূন্য, যা শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি : এবার ৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, যা গতবার ছিল ১৩৪টি। আর ৬৬৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে, যা গতবার ছিল ৯৮৪টি। এ তালিকায় সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দশা মাদ্রাসা বোর্ডের। এ বোর্ডের ২২৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করতে পারেনি, যা গতবার ছিল মাত্র ৮৬টি। এ ছাড়া বিদেশি কেন্দ্রের মধ্যে একটিতে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি।
মানবিকে ধস : এ বছর মানবিক বিভাগে অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী পাস করেছে। যেখানে বিজ্ঞান বিভাগে ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ ও ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ পাস করেছে, সেখানে মানবিকে এ হার ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। শিক্ষাবিদরা সামগ্রিক ফল বিপর্যয়ের একাধিক কারণকে সামনে এনেছেন। তারা মনে করছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষার হার ও জিপিএ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখাত। এ প্রবণতা বন্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি বদলায় অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান বিএনপি সরকারও এ ধারা অব্যাহত রেখেছে। এটা শিক্ষার জন্য ইতিবাচক বলছেন তারা। পাশাপাশি খারাপ ফলের কারণ চিহ্নিত করে যুগোপযোগী শিক্ষা নীতিমালা তৈরির তাগিদ দেন।
আমাদের দেশে শিক্ষার মানের কতটুকু উন্নতি ঘটল, এটা বোঝাতে সাধারণভাবে পাসের হারকে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পাসের হার যে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না, তার প্রমাণ এইচএসসির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা। প্রতি বছর এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করে। অথচ তাদের ১০ থেকে ১২ শতাংশও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস নম্বর তুলতে পারে না।
বিষয়টি উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনের বক্তব্যে। তিনি বলেন, আমরা বহু বছর ধরে দেখে আসছি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৃত্রিমভাবে জিপিএ-৫ কিংবা পাসের হার বাড়িয়ে দেখানো হতো। আমরা সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসেছি। কারণ প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন আমরা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের যোগ্যতা ও সৃজনশীলতা নিয়ে বের হয়ে আসবে।
পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল শিক্ষকরা উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোর ছিলেন কি না। জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, মন খুলে নম্বর দেওয়া যায় না।’ চলতি বছরের সার্বিক ফলকে বস্তুনিষ্ঠ ও সুন্দর উল্লেখ করে মন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন তোলেন ‘আপনি খারাপ রেজাল্ট বলছেন কেন? রেজাল্ট তো সুন্দর হয়েছে।’
গত বছর পাসের হার কমায় প্রশ্ন উঠেছিল কেন পাসের হার এত কমল। এবার সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। কারণ টানা দুই বছর ধরে ফলের এমন পতনকে কেবল প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়া বা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শুধু ফলের পতন নয়, শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এবারের এসএসসি ফল তাই কেবল কতজন পাস করল আর কতজন ফেল করল এ হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং প্রশ্ন উঠছে শিক্ষার্থীরা আসলে কতটা শিখছে?
