রোস্টার পরিবর্তন করেই কোটিপতি!

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের মেরুদণ্ড। যাত্রীবাহী সেবার পাশাপাশি বিমানের আয়ের একটি অন্যতম উৎস হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি ও রপ্তানি কার্গো হ্যান্ডলিং। তবে সম্প্রতি এ কার্গো ভিলেজকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে, তারা শুধু ডিউটি রোস্টার নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের যোগসাজশের মাধ্যমে এখান থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা। সাধারণ হেলপার থেকে শুরু করে পদস্থ কর্মকর্তাদের একটি চক্র এই ‘রোস্টার বাণিজ্যে’ রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।

সম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব অপকর্ম করে অনেকেই কোটিপতি হয়েছেন। টাকা দিয়ে চাহিদানুযায়ী ডিউটি করছেন অফিসার-হেলপাররা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করছে। বর্তমানে শাহজালালের কার্গো এলাকায় বিমানের ১৩০ জন অফিসার ও ৭০০ জন হেলপার কর্মরত আছেন। এর মধ্যে সিংহভাগ জনবলই প্রয়োজন হয় আমদানি কার্গো শাখায়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কর্মীর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সেকশনে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও তারা সেটি করেন না।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ৮৩০ জন কর্মীর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বছরের পর বছর ধরে ‘সুবিধাজনক’ স্থানে ডিউটি করে আসছেন। বিশেষ করে আমদানি কার্গোর যেখানে পণ্য খালাস ও শুল্কায়নের বিষয়টি সরাসরি জড়িত, সেখানে ডিউটি পাওয়ার জন্য চলে অলিখিত নিলাম। অভিযোগ রয়েছে, একজন সাধারণ হেলপারকে আমদানি কার্গোর বিশেষ পয়েন্টে ডিউটি পেতে প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটকে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ ৭০০ জন হেলপারের একটি বড় অংশকে ডিউটি রোস্টারে নাম রাখার বিনিময়েই মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে।

সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির চিত্র : গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্গো ভিলেজে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে থাকা এই সিন্ডিকেটে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে কমার্শিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (কার্গো) মো. মঈনউদ্দীন, অ্যাসিস্ট্যান্ট কমার্শিয়াল ম্যানেজার ইকবাল বিন আবেদ, এবাদত ইসলাম ও কমার্শিয়াল ম্যানেজার জাহিদুজ্জামান অন্যতম। এ ছাড়া কমার্শিয়াল সুপারভাইজার ও কর্মকর্তাদের মধ্যে মো. মন্তাসার রহমান, কে এম শাহজালাল, মিজানুর রহমান, এস এম জোবায়েদ, আনোয়ার, মোস্তফা কামাল, জুবাইল ইসলাম ও তাহমিদুল ইসলামের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। নিচের স্তরে এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে কার্গো হেলপার মো. শাওন আহমেদ রাজু, মো. শাহাদাত হোসেন ও মো. সুজনসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে। যদিও অভিযুক্তরা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

এদিকে চক্রটি শুধু রোস্টার বাণিজ্যই নয়, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পণ্য চুরিতে সহায়তা ও সরকারি শুল্ক ফাঁকির মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। এ সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী সদস্যরা অবৈধভাবে প্রতি মাসে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকেন, যা সরকারের রাজস্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।

অটোমেশন চালুতে সিন্ডিকেটের বাধা : দীর্ঘদিনের এ অনিয়ম বন্ধে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ‘রোস্টার অটোমেশন সিস্টেম’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিউটি বণ্টন হবে এবং কারও পক্ষেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বারবার একই স্থানে ডিউটি দেওয়া সম্ভব হবে না। রোস্টার বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন বন্ধ হবে, পণ্য চুরি ও সিন্ডিকেট থাকবে না। তবে এ আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সামনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চক্রটি। তারা এ ডিজিটাল পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে ভিত্তিহীন প্রশ্ন তুলছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে লবিং করে এটি বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন : সিন্ডিকেটের অন্যতম একটি দাবি হলো, রোস্টার পরিবর্তন হলে কাজের ব্যাঘাত ঘটবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বাংলাদেশ অ্যাভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে তাদের হাতে-কলমে দক্ষ করে তোলা হয়। ফলে দক্ষ জনবল থাকার পরও ‘কাজের সমস্যা হবে’ এমন অজুহাত কেবল রোস্টার বাণিজ্য টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল মাত্র বলে অনেকেই মনে করছেন।

এদিকে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে চীন থেকে আসা ৪ হাজার ২৩৭ কেজি ফেব্রিকস শুল্কায়ন ছাড়াই খালাস করার মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছে। এইচ বি এস অ্যাপারেলস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান গত বছরের ১৭, ২৩ ও ২৪ নভেম্বর চীন থেকে কার্গো বিমান তায়ানজিন এয়ার কার্গো (টিএইচ-৩৮৭৯) ও এসএফ এয়ারলাইনসের (ও৩-২৩৭) মাধ্যমে এই ফেব্রিকস আমদানি করে। ফেব্রিকসগুলো একই বছরের ২৭ নভেম্বর ও ৭ ডিসেম্বর বিমান ও কাস্টমসের একটি অসাধু চক্রের সহায়তায় বিল অব এন্ট্রি ও কাস্টমস শুল্কায়ন ছাড়াই খালাস করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে কমার্শিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (কার্গো) মঈনউদ্দীন লোটাস বলেন, কোনো অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত কখনও ছিলাম না। কমার্শিয়াল সুপারভাইজার মন্তাসার রহমানও একই দাবি করে বলেছেন, তারাও অটোমেশন চালুর পক্ষে এবং সততার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছেন। 

তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোস্টান পরিবর্তনে অনিয়মের বিষয়টি সত্য। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে হয়রানি করা হবে না।

উত্তরণের জন্য সুপারিশ : সার্বিক বিষয়ে ওই গোয়েন্দা সংস্থার সুপারিশে বলা হয়, শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভবন এখন দুর্নীতির অভয়রণ্যে পরিণত হয়েছে। অটোমেশন সিস্টেম চালু হলে শুধু যে দুর্নীতি কমবে তা নয়, বরং সব কর্মী চক্রাকারে কাজ করার সুযোগ পাবে, যা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করবে। অসাধু কর্মকর্তাদের এ বাধা প্রমাণ করে, রোস্টার অটোমেশন এখন সময়ের দাবি, এটি বাস্তবায়ন করতে না পারলে সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন এবং বিমানকে লোকসানমুক্ত করার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে।

তারা আরও জানান, কোনো প্ররোচনা বা চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে দ্রুত রোস্টার অটোমেশন সিস্টেম চালু করতে হবে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি আইটি মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। যারা দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে কর্মরত থেকে রোস্টার বাণিজ্য ও পণ্য চুরিতে লিপ্ত, তাদের অবিলম্বে বিমান সদর দপ্তর বা অন্যান্য স্টেশনে বদলি করতে হবে। পাশাপাশি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তাদের সম্পদের অনুসন্ধান করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, কার্গো ভিলেজের স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে সিসি ক্যামেরা নজরদারি বাড়ানো এবং ডিউটি রোস্টার স্বচ্ছভাবে নোটিস বোর্ডে ও অনলাইনে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে, বিএটিসি থেকে প্রাপ্ত প্রশিক্ষণ যেন মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং কোনো কর্মী যেন কাজ জানা নেই বলে অজুহাত দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বিভাগীয় পরীক্ষা চালু করা যেতে পারে।