মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে শুভেন্দু-শমীক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, আগামী ৯ মে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথগ্রহণ করবেন। অর্থাৎ রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে এক প্রতীকী সূচনা করতে যাচ্ছে বিজেপি।

যদিও এখনো নিশ্চিত নয় কে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নতুন মুখ্যমন্ত্রী চূড়ান্ত করতে রাজ্যের নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে বৈঠকে বসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। বিধানসভায় বিজেপির দলনেতা বেছে নেওয়ার কাজে পর্যবেক্ষক করা হয়েছে তাকে। সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পড়শি রাজ্য ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিকে।

ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করেছে, তাদের একাধিক দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও হামলা হয়েছে। বেশ কয়েকটি জায়গায় ভাঙচুরের পাশাপাশি আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হচ্ছে, যাতে নির্বাচনের ফলকে ঘিরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা যায়। তবে বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত সোমবার ফল ঘোষণার দিনও রাজ্যের বিভিন্ন গণনাকেন্দ্রে উত্তেজনার খবর পাওয়া যায়। কয়েকটি স্থানে দুই পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

এদিকে, বিধানসভা ভোটের ফল মানতে ‘নারাজ’ তৃণমূল কংগ্রেসনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ‘ইস্তফাও’ দেবেন না। তিনি বলেছেন, ‘কেন ইস্তফা দেব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে?’ মমতা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, ‘কমিশনের সাহায্যে একশর ও বেশি আসন লুট করা হয়েছে।

আগের দিন সোমবার পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ করা হয়। তাতে ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিজেপি। এর মধ্যদিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রায় ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তৃণমূলের ঝুলিতে গেছে ৮০টি আসন।

কে হচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে বিজেপির এই বিশাল জয়ের পর এখন সব মহলে একটাই প্রশ্ন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হচ্ছেন? এ নিয়ে দলের ভেতরে যেমন চলছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহলের শেষ নেই।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকা তুলে ধরেছে। তাতে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী বিজেপি নেতার নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে বর্তমানে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাবেক সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্ত, সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, রাজ্য বিজেপির আরেক সাবেক সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নারীনেত্রী অগ্নিমিত্র পাল, রাজ্যসভার সাবেক সাংসদ ও বর্তমানে সোনারপুর দক্ষিণের বিধায়ক রূপা গাঙ্গুলী অন্যতম।

এদের মধ্যে সাংগঠনিক দক্ষতা এবং প্রভাবের জন্য বর্তমানে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে মুখ্যমন্ত্রী পদের একজন বড় দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর আসন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছেন। তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আসা এই নেতা এর আগে মমতার সরকারে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন।

রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য আরএসএস-এর আদর্শে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞ নেতা। সমাজের বিভিন্ন স্তরে দলের ভিত্তি প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি রাজ্যসভার সদস্য এবং গত কয়েক বছরে রাজ্যে বিজেপি-র শক্তি বাড়াতে তার বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে।

সাবেক সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্ত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দৈনন্দিন কার্যক্রমে জড়িত হয়েছিলেন। তিনি বিজেপির একজন ভদ্রলোক মুখ হিসেবে পরিচিত এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ।

সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার নেতৃত্বেই ২০১৯-সালের লোকসভা এবং ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল।

রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

 পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্র পাল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নারীনেত্রী। মহিলা মোর্চার সভানেত্রী থেকে শুরু করে তিনি দ্রুত রাজ্য সহ-সভাপতির পদে জায়গা পেয়েছেন।

বর্তমানে সোনারপুর দক্ষিণের বিধায়ক ও সাবেক রাজ্যসভা সদস্য রূপা গাঙ্গুলী বিজেপির অন্যতম জনপ্রিয় মুখ।

পদত্যাগ করবেন না মমতা : বিধানসভা নির্বাচনের ফল মানতে ‘নারাজ’ তৃণমূল কংগ্রেসনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ‘ইস্তফাও’ দেবেন না। তিনি বলেছেন, ‘কেন ইস্তফা দেব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে?’

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কলকাতার কালীঘাটে নিজের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করেন মমতা। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তিনি এই প্রথম গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তার সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকে।

আগের দিন সোমবার বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ করা হয়। তাতে ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয় পায় বিজেপি। তৃণমূলের ঝুলিতে গেছে ৮০টি আসন।

মমতা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, ‘কমিশনের সাহায্যে ১০০-ও বেশি আসন লুট করা হয়েছে। আমাদের এই লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে ছিল না। নির্বাচন কমিশন এখানে একটা কালো ইতিহাস তৈরি করল। কমিশনই ভিলেন। তারা মানুষের অধিকার লুট করেছে। ভোটের আগে সব জায়গায় রেড করেছে। সব অফিসারকে বদলে দিয়েছে। বিজেপি আর কমিশনের মধ্যে বেটিং হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।’

মমতা বলেন, ‘ওরা এমনি জিতলে আমার কোনো অভিযোগ থাকত না। ভোটে হার-জিত তো থাকেই। কিন্তু তা তো হয়নি। আমরা হারিনি। ওরা ভোট লুট করেছে।’

দলের নির্বাচিত নেতারা তৃণমূলের পাশেই আছেন জানিয়ে মমতা বলেন, তিনি রাস্তায় নামবেন। রাস্তাতেই থাকবেন এবং ঘুরে দাঁড়াবেন। বিজেপিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সব নেতা ফোন করে পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জোট আগামী দিনে আরও শক্তিশালী করব।’

কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, উদ্ধব ঠাকরে, অখিলেশ যাদব, হেমন্ত সোরেনরা মমতাকে ফোন করেছিলেন। সমবেদনা জানিয়েছেন এবং পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন।

বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা : বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জেলায় তাদের দলীয় কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। বেশ কয়েকটি জায়গায় ভাঙচুরের পাশাপাশি আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হচ্ছে, যাতে নির্বাচনের ফলকে ঘিরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা যায়।

অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। দলটির নেতারা বলেছেন, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরেই এসব ঘটনা ঘটতে পারে। তাদের দাবি, বিজেপির সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। সহিংসতার অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নতুন মুখ্যমন্ত্রী চূড়ান্ত করতে অমিত শাহের বৈঠক : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এই প্রথম বিজেপির ভূমিকা বদলাতে চলেছে। যেহেতু সরকার গড়বে তারা, তাই নতুন মুখ্যমন্ত্রীই হবেন বিধানসভায় শাসকদলের পরিষদীয় দলনেতা। নতুন মুখ্যমন্ত্রী চূড়ান্ত করতে রাজ্যো নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে গতকালই বৈঠকে বসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর। বিধানসভায় বিজেপির দলনেতা বেছে নেওয়ার কাজে পর্যবেক্ষক করা হয়েছে তাকে। সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিকে।

যেকোনো রাজ্যে নির্বাচনের পরে পরিষদীয় দলনেতা বাছার সময় সেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের পাঠান বিজেপি নেতৃত্ব। তারা দলের নবনির্বাচিত প্রার্থী বা হবু বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক করেন। সে বৈঠকেই পরিষদীয় দলনেতার নাম ঘোষণা হয়ে যায়।