ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক তিন হাজার ৮১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ এবং কয়েক বছরের মধ্যে একই মহাসড়ক ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আসে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রথমে ‘অনুসন্ধানে’ নামে সংস্থাটি। মহাসড়ক নির্মাণ ও মেরামতে অতিরিক্ত ব্যয়সহ বিভিন্ন উপায়ে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে অর্থ লোপাটের এ অভিযোগ শেষ পর্যন্ত অনুসন্ধান পর্যায়েই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে এমন কথা এখন হচ্ছে দুদকে।
কর্মকর্তারা বলছেন, অন্য সংস্থা থেকে প্রেষণে আসা অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিজের মূল প্রতিষ্ঠানে ‘ফিরে যাওয়া’ এবং তদারকিতে জড়িত কর্মকর্তা ‘অবসরে যাওয়ার’ কারণে শেষ পর্যন্ত যেনতেনভাবে অনুসন্ধানটি শেষ করা হয়।
রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ‘ধামাচাপা দেওয়ার’ মতো গুরুতর বিষয় ভালোভাবে খতিয়ে দেখা দরকার এমনটি মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো অনুসন্ধান কর্মকর্তা অবসরে গেলে বা পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দুদকে থাকবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি যদি বিগত সরকারের সময় চাপা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এটি এখন অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ক্ষমতার পালাবাদলের পরও যদি একই ধারায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে থাকে, তাহলে দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা কমবে। কাজেই দুদকের কাজ হবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিষয়টির দায়িত্ব নেওয়া। এখন যেহেতু কমিশন নেই, বর্তমানে দুদকে কর্মকর্তা যারা আছেন, তাদের দায়িত্ব নেওয়া উচিত।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনুসন্ধান কেন শেষ হয়নি, সেটি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি টোলপ্লাজা থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ১৯২ দশমিক ৩ কিলোমিটার অংশ দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে নির্মাণ-ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ১৬৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারিত ছিল ২০০৬-এর জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর কয়েকবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়। ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি একনেক তৃতীয় দফায় ৬২৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বাড়িয়ে নির্মাণ ব্যয় তিন হাজার ৮১৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করে। নির্মাণ শেষে ২০১৬ সালের ২ জুলাই উদ্বোধন করা হয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।
এ প্রকল্পের নির্মাণে বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর সংস্থার তদানীন্তন উপপরিচালক মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এহসানকে দায়িত্ব দেয় দুদক। গণপূর্ত বিভাগ থেকে প্রেষণে আসা এই কর্মকর্তা প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে ২০২২ সালের জুলাই মাসে কমিশনে একটি প্রতিবেদন জমা দেন।
দীর্ঘ অনুসন্ধান করেও অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র জোগাড়ে তিনি ‘ব্যর্থ হয়েছেন’ বলে কমিশনকে জানানো হয়। একপর্যায়ে তিনি গণপূর্ত বিভাগে ফিরে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এহসান গত ২৭ এপ্রিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনুসন্ধান সমাপ্তির বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে চান না। কোনো কিছু জানতে হলে দুদকে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
অভিযোগটি অনুসন্ধানকালে তদারক কর্মকর্তা ছিলেন সৈয়দ ইকবাল হোসেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে মহাপরিচালক হওয়া এই কর্মকর্তাও ইতিমধ্যে অবসরে চলে গেছেন।
এই অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুদকের একজন শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণ ও মেরামতের নামে সড়ক এবং জনপথের প্রকৌশলী-ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থের ক্ষতিসাধন ও কমিশন-বাণিজ্যের একটি অভিযোগ জমা হয় দুদকে। তিনি দাবি করেন, সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতি যাই হোক, দুদকের পক্ষে তা প্রমাণ করা কঠিন। কারণ ওই প্রকল্পের অভিযোগ অনুসন্ধান চলাকালে আরেকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে যায়। অনুসন্ধান কর্মকর্তা এসব বিষয় উল্লেখ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর এই অনুসন্ধানের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তার এই দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের একজন মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা প্রমাণ করা কঠিন কিছু নয়। প্রকল্প গ্রহণের সময় এর উপযোগিতাসহ বিভিন্ন দিক পরখ করতে সমীক্ষা করা হয়। কেনাকাটার কাগজপত্র থাকে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন আইএমইউডির রিপোর্ট থাকে। এসব রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করে কোনো দুর্নীতি হয়েছে কিনা, তা চিহ্নিত করা যায়।
তিনি বলেন, অনুসন্ধান পর্যায়ে দেখতে হবে অতিরিক্ত দর আছে কিনা, দরপত্র মূল্যায়ন ঠিক আছে কিনা, ভুয়া প্রকল্প হিসেবে লাভজনক দেখানো হয়েছে কিনা, মূল কাজ থেকে অতিরিক্ত কাজ দেখানো হয়েছে কিনা এবং অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা হয়েছে কিনা।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখতে হবে সমীক্ষাটি (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সঠিকভাবে করা হয়েছে কিনা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়েছে কিনা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে ব্যয় বেড়েছে কিনা, শিক্ষা সফরের নামে অর্থ ব্যয় হয়েছে কিনা, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাউকে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কিনা এবং আইএমইডি রিপোর্ট পজিটিভ কিনা। এসব রেকর্ডপত্র নিয়ে যাচাই করলেই প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি বেরিয়ে আসবে।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পটিতে নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। উদ্বোধনের পর সওজ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, মহাসড়কের আয়ুষ্কাল হবে ১০ বছর। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই মহাসড়কটি মেরামতের প্রয়োজন পড়ে। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মহাসড়কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ৭৯৩ কোটি ১৪ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তাতে একদফা মেরামতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয় প্রায় চার কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রেও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ আছে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রকৌশলী-ঠিকাদাররা সিন্ডিকেট গড়ে কমিশন-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন মহাসড়কে নির্মাণ ও মেরামতকাজে বেশি অর্থ ব্যয় দেখিয়ে হাজার-হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) ও সিনিয়র জেলা জজ মো. মঈদুল ইসলাম বলেন, দুদকের কোনো অনুসন্ধান হারিয়ে যেতে পারে না। এর ফলাফল কিছু আসবেই হয় অভিযোগের প্রমাণ পাবে এবং মামলা হবে; আর না হয় রিপোর্ট হবে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, পরিসমাপ্ত হবে। যদি সরকারের সুপারিশেও অনুসন্ধান শেষ করতে চায়, তাহলে পরিসমাপ্ত করতে হবে। এখন নথিটি খুঁজে দেখতে হবে এই অনুসন্ধানের শেষ অবস্থা কী হয়েছে।