রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সমন্বিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও তারল্য সংকটে জর্জরিত ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে স্বস্তির আলো দেখতে পায়নি। অর্থনীতিবিদরা সমন্বিত ইসলামী ব্যাংককে এখন গলার কাঁটা হিসেবে দেখছেন, যেখানে সমাধানের চেয়ে চ্যালেঞ্জ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক এই পাঁচটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক দুর্বলতায় ভুগছিল। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ বিতরণ এবং সেসব ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন-ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করে।
সরকার পতনের পর নতুন বাস্তবতায় এসব ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র উন্মোচিত হয়। দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দুর্বল পাঁচটি ব্যাংককে একত্র করায় সব সমস্যা এক জায়গায় জমা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ ও দুর্নীতির মূল কারণগুলোর সমাধান না হলে নতুন ব্যাংকও একই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে জোরালো ভূমিকা রাখেন। বর্তমান গভর্নরও ব্যাংক সংস্কারের বিষয়ে একমত হলেও এখনো এ ব্যাপারে কোনো কার্যকরী উদ্যোগ নিতে পারেননি।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে পাঁচ ব্যাংকে ৪০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দিতে বিলম্ব হচ্ছে, সূত্র মারফত এ কথা জানা গেছে।
সমন্বিত ইসলামী ব্যাংককে অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন, নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপড়েন, চাকরিচ্যুতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা সব মিলিয়ে খাতজুড়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব এখন রাজধানীর বাইরের জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা সমন্বিত ইসলামী ব্যাংকের ৫টি শাখায় তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। প্রতিদিন আমানতকারীরা কোথাও না কোথাও বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছেন। এর আগে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজধানীর মতিঝিলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সমন্বয়ের প্রক্রিয়াধীন ব্যাংকগুলোর শাখার সামনে আন্দোলন করতে দেখা গেছে। তারা চাকরিতে পুনর্বহাল ও আগের কাঠামো ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক মনে করেন, সরকার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিলেও কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়নি। তার মতে, আস্থা সংকট কাটাতে হলে স্বচ্ছ ও সক্ষম উদ্যোক্তাদের হাতে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে এবং দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।
চট্টগ্রামের আমানতকারী সামিনা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্যই টাকা জমিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দরকারে টাকা তুলতে পারছি না। সামনে ঈদুল আজহা, টাকা না পেলে হয়তো কোরবানি দিতে পারব না। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে!’
রাজধানীর উত্তরার আমানতকারী আজাদ সুলাইমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রাহকরা আদৌ তাদের টাকা ফেরত পাবেন কি? একীভূত ইসলামী ব্যাংকের নামে, নাকি আলাদা ব্যাংকের পরিচয়ে টাকা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। আমরা নিশ্চয়তা চাই।’
এদিকে সমন্বিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাওয়ায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে; ভেঙে যাচ্ছে একীভূত ইসলামী ব্যাংক। একীভূত প্রক্রিয়ার অধীনে থাকা ৫টি ব্যাংক ফের আলাদা হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাঁচ ব্যাংকে কৌশলগত পার্টনার নিয়োগ করা হবে এক রকম ধোঁয়াশার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে আমি আজকে কথা বলেছি। বর্তমান অবস্থান থেকে পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসার কোনোরকম সংকেত এখনো দেখা দেয়নি। যদিও একটি ব্যাংক ইতিমধ্যে পৃথক হওয়ার আবেদন করেছে। আবেদনের অপেক্ষায় আছে আরেকটি ব্যাংক।’
তিনি বলেন, ‘একীভূতকরণের মাধ্যমে পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা সরকারের হাতে রয়েছে। এখন সরকার বলছে, আমরা কিন্তু স্থায়ীভাবে এর মালিকানা দাবি করিনি। আমরা সাময়িকভাবে পাঁচটি ব্যাংকের যারা আমানতকারী তাদের ব্রিথিং স্পেস দেওয়ার উদ্দেশ্যে এবং এর স্বাস্থ্য ভালো করার জন্য প্রকৃত ইনভেস্টরদের হাতে প্রাইভেট সেক্টরে আবারও একীভূত পাঁচ ব্যাংককে ছেড়ে দেব। সরকারি মালিকানায় যাওয়ার পরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ডেভেলপমেন্ট এখনো দৃশ্যমান হয়নি। ফলে এখনই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। তারপরও যদি কোনো ইনভেস্টর আসেন, অবশ্যই সেটা বাংলাদেশ ব্যাংক দেখবে, সরকার দেখবে। কিন্তু ওই অবস্থা এখনো সৃষ্টি হয়নি।’
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘যে পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ হলো, স্বাভাবিকভাবেই ওই ব্যাংকগুলোর যারা আগে উদ্যোক্তা-পরিচালক ছিলেন তারা মালিকানায় ফিরতে চাইবেন। তার মানে সাড়ে ৭ শতাংশ শেয়ারের জন্য ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তাদের আবারও মালিকানা ফেরত পাওয়ার দাবি করার সুযোগ রয়েছে। এর অর্থ এই না যে, কেউ সাড়ে ৭ শতাংশ দেওয়া মাত্রই মালিকানা ফেরত পাবে। পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য যে প্রসেস বাংলাদেশ ব্যাংক ফলো করে তাদের সেসব ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হলেই তারা পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানিয়েছে, একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকে এরই মধ্যে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নতুন ব্যাংকের মূলধন হচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাঁদার টাকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বীমা তহবিল থেকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তরিত করা হবে। বাকি সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরিত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত আমানত ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ। বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে শতাংশের হিসাবে সর্বোচ্চ ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক। এই হার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী শরিয়ায় ৬২ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকে ৪৮ শতাংশ।
একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একীভূত ইসলামী ব্যাংকগুলোর মালিকানা স্থায়ীভাবে সরকারের হাতে রাখার পরিকল্পনা নেই। তবে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের আগে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। উপযুক্ত ও সক্ষম বিনিয়োগকারী না পাওয়া পর্যন্ত একীভূত কাঠামো বহাল থাকবে।