ইউরিয়া আসছে হরমুজ এড়িয়ে

নন-ইউরিয়া সারের সরবরাহের নিশ্চয়তা কয়েক মাসের জন্য থাকলেও বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে ইউরিয়া সারের সরবরাহ নিয়ে। আসন্ন আমন মৌসুমে সরবরাহ করার মতো পর্যাপ্ত ইউরিয়া সার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে নেই। এ অবস্থায় তিনটি সার কারখানা চালু হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরব, মিশর ও রাশিয়ার কয়েকটি শিপমেন্ট নিশ্চিত হওয়ায় আসন্ন মৌসুমের সার সংকট কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে দাবি করেছে বিসিআইসি।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ। জাহাজ চলাচল করতে না পারায় যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি করতে পারেনি বাংলাদেশ। একই সঙ্গে স্থানীয় কারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় তৈরি হয়েছে সার সংকট। সংকটের মধ্যে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও সরবরাহকারী না পেয়ে ইউরিয়ার সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

বিসিআইসি বলছে, আসন্ন আমন মৌসুমে ইউরিয়ার সরবরাহ নিয়ে যে শঙ্কা ছিল, সেটি ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। কারণ বিসিআইসি জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরব ও মিশর থেকে ৬৫ হাজার টনের দুটি চালান নিশ্চিত করেছে, যা হরমুজ প্রণালি বাদ দিয়ে বিকল্প পথে আসবে। এসব চালান এ মাসেই দেশে আসবে বলে জানা গেছে। রাশিয়া থেকে আরও এক লাখ টনের ইউরিয়া আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পথে, দাম নিয়ে কথা চলছে। এ চালান আগামী মাসে সরবরাহ-শৃঙ্খলে যুক্ত হতে পারে।

সৌদি আরবের সার চুক্তি অনুযায়ী, আগের দামে পাওয়া গেলেও রাশিয়ার সার কিনতে হচ্ছে বর্তমান দরে। বর্তমান দাম আগে সারের যে দাম ছিল তার প্রায় দিগুণ। যুদ্ধের আগে প্রতি টন ইউরিয়ার আন্তর্জাতিক বাজারদর ছিল ৪৫০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। সর্বশেষ ৩০ এপ্রিল দাম ছিল ৮৭১ ডলার। প্রায় এ দাম দিয়েই সরকারকে রাশিয়া থেকে সার কিনতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত ইউরিয়া সারের দাম কমবে না। কারণ হরমুজ বন্ধ থাকায় চাহিদার তুলনায় বৈশি^ক সরবরাহকারী কমে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ¦ালানি সংকটে দেশের ৫টি ও যৌথ মালিকানার একটি মোট ৬টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে তিনটি কারখানা চালু হওয়ায় স্থানীয়ভাবে সারের সরবরাহ বাড়ছে। আরও দুটি কারখানা আমন মৌসুমের শুরুতে চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিসিআইসি সূত্র জানিয়েছে।

প্রতি বছর দেশে ২৬ লাখ টন ইউরিয়ার প্রয়োজন হয়। স্থানীয় উৎপাদন এবং আমদানির মাধ্যমে বিসিআইসি এর সরবরাহ নিশ্চিত করে। তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে সাড়ে তিন লাখ টন সারের মজুদ রয়েছে, যা আগামী জুন মাস পর্যন্ত সরবরাহ করা যাবে। এরপরই শুরু হবে মিনি পিক সিজন হিসেবে পরিচিত আমন মৌসুম। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ছয় লাখ ৬৬ হাজার টন সারের প্রয়োজন, যার জোগান দিতে মরিয়া বিসিআইসি।

সরকারের নীতি অনুযায়ী, চার লাখ টন ইউরিয়া নিরাপত্তা-মজুদ হিসেবে সব সময়ের জন্য রাখতে হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে এ ধরনের মজুদ গড়ে তুলতে পারেনি বিসিআইসি। একই সঙ্গে বছরের বেশিরভাগ সময় কারখানা বন্ধ করে রাখার যে নীতি, চেষ্টা করেও তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারায় যুদ্ধের সময়ে শঙ্কা আরও বেড়েছে। এমন নীতির কারণেই প্রতি বছর ১০ লাখ টন ইউরিয়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের চেষ্টা করেও সফল হতে পারে না প্রতিষ্ঠানটি। ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। অথচ নিজস্ব সক্ষমতায় পুরো ইউরিয়ার সরবরাহ নিশ্চিতের সুযোগ দেশের হাতেই আছে। কিন্তু তা কাজে লাগানো হয় না।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে শুধু ইউরিয়া নয়, নন-ইউরিয়া সারের সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, আগামী অক্টোবর মাস পর্যন্ত সরবরাহ করার মতো নন-ইউরিয়া সারের মজুদ সরকারের কাছে রয়েছে। সরকারের কাছে ১১ দশমিক ৬১ লাখ টন নন-ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে।

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, চুক্তির আওতায় থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই বিকল্প প্রক্রিয়ায় সার আমদানির চেষ্টা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। দ্রুত সরবরাহ বাড়াতে গত ২৫ মার্চ ও ১ এপ্রিল দুটি আন্তর্জাতিক দরপত্রের আহ্বান করা হয়। প্রতিটি দরপত্রে দুই লাখ টন করে মোট চার লাখ টন সার আমদানির কথা বলা হলেও একটিতে কোনো দরপ্রস্তাব জমাই পড়েনি। অন্যটিতে মাত্র ২৫ হাজার টনের আংশিক প্রস্তাব পাওয়া গেছে। ২৭ এপ্রিল আবারও দুই লাখ টনের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনিশ্চিত হওয়ায় সরবরাহকারীরা চুক্তি করতে অনাগ্রহী ছিল; দরপত্রের কিছু শর্ত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাদের মধ্যে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিচ্ছে না।

যদি হরজুম সংকটের সমাধান না হয় এবং বিকল্প দেশগুলো থেকে সময়মতো ইউরিয়ার সরবরাহ না আসে, তবে আমন মৌসুমে এ সংকটের আঁচ লাগতে পারে। ঝুঁকি একেবারে শেষ হয়ে যায়নি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ আমদানির সারের সরবরাহ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হতে এক থেকে দেড় মাস সময়ের প্রয়োজন। কখনো কখনো আরও বেশি লাগে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরব ও মিশর থেকে ৬০ হাজার টনের বেশি সারের দুটি চালান দেশে আসবে এ মাসেই। সৌদি আরবের ইয়ানবু পোর্ট থেকে সার আসবে। মিশরের সারও আসবে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে।’

তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে এক লাখ টনের একটি চুক্তির কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা আগামী মাসের শেষ দিকে দেশের সরবরাহ-শৃঙ্খলে প্রবেশ করবে। এ ছাড়া আমাদের তিনটি কারখানা চালু হয়ে গেছে, বাকিগুলোও মৌসুমের শুরুতে চালু হতে পারে।’

বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ৪৫০ ডলারের আশপাশে থাকা দাম এখন ৮৭১ ডলারে পৌঁছেছে। এ পর্যায় থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে।

বিসিআইসি বলছে, আন্তর্জাতিকভাবে যখন ইউরিয়া আমদানির প্রক্রিয়া জটিল হয়েছে, তখন স্থানীয় সার কারখানাগুলো আস্তে আস্তে খুলে দেওয়ার চিন্তা করেছে সরকার। যৌথ মালিকানাধীন কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এবং ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানা এ মাসেই চালু হয়েছে। আশুগঞ্জ ছাড়া বাকি দুটি জুনের শেষ দিকে বা জুলাইতে চালুর চিন্তা রয়েছে সরকারের।