চিঠি কি কেবলই একটি কাগজের পৃষ্ঠা? নাকি মানুষের না বলা কথা, বুকভরা আশা কিংবা বিশ্বাসের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি? রংপুরের ছোট্ট অনুশ্রী আর রাজধানীর এক নিরাপত্তাকর্মী রাকিব প্রমাণ করলেনবিশ্বাস আর ভালোবাসার চিঠি সঠিক ঠিকানায় পৌঁছালে ইতিহাস তৈরি হয়। পঞ্চম শ্রেণির ছোট্ট অনুশ্রীর ছোট্ট একটি চিঠি আর এক তরুণের না বলা আকুতি আজ রূপ নিয়েছে অনন্য বাস্তবতায়। যে প্রধানমন্ত্রীকে তারা এতদিন শুধু দূর থেকে ভালোবেসেছেন, আজ তার স্নিগ্ধ সান্নিধ্যেই কেটে গেল সেরা একটি বিকেল। আবেগঘেরা ঘটনায় গান, বিশ্বাস আর ভালোবাসার কাছে হার মেনেছে সব দূরত্ব।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে স্বপ্নপূরণ হলো রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুশ্রী রায়ের। সে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পূর্ব নবনিদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রতিযোগিতায় দেশের গানে প্রথম এবং নজরুল সংগীতে তৃতীয় স্থান লাভ করে সে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন অনুশ্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে একটি হারমোনিয়াম উপহার দেন।
যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেল অনুশ্রী : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কীভাবে সাক্ষাৎ পেল সে সম্পর্কে অনুশ্রী জানায়, গত ১৫ জুলাই বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে পদক গ্রহণের সময় অনুশ্রী প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তার একজন কর্মকর্তার হাতে একটি চিঠি তুলে দেয়। চিঠিতে খুদে এই শিক্ষার্থী সংগীতচর্চার প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে সংগীতচর্চায় সহযোগিতার জন্য একটি হারমোনিয়াম ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছার কথাও জানায়। পরে প্রধানমন্ত্রী চিঠিটি পড়ে অনুশ্রী ও তার পরিবারকে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানান।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনন্দে আত্মহারা খুদে সংগীতশিল্পী অনুশ্রী জানায়, ‘কখনো বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, আমার চিঠি প্রধানমন্ত্রী পড়বেন এবং সাক্ষাতের জন্য ডাকবেন।’
অনুশ্রী জানায়, ‘আমার সংগীতচর্চার জন্য একটি হারমোনিয়াম খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমার পরিবারের পক্ষে সেটি কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের অনুষ্ঠানের দিন সেসব লিখে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছিলাম। সেই চিঠি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাতেও দিতে পারিনি; তার একজন কর্মকর্তার হাতে দিয়েছিলাম। ভাবিনি, প্রধানমন্ত্রী আমার চিঠি পাবেন এবং পড়বেন। যখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একজন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন) আমাদের ফোন করে জানালেন যে প্রধানমন্ত্রী আমার লেখা সেই চিঠি পড়েছেন এবং আমাদের সাক্ষাতের জন্য ডেকেছেন, তখন যেন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এরপর আজ (গতকাল) আমাদের অবাক করে দিয়ে দেখা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’
অনুশ্রী জানায়, এ সময় স্নেহভরে তার সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তার সংগীতচর্চার খোঁজ-খবর নেন এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি তার সংগীতসাধনায় উৎসাহ দিতে চিঠির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চাওয়া সেই হারমোনিয়ামও উপহার হিসেবে তার হাতে তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রীকে একটি দেশাত্মবোধক গানও শোনায় অনুশ্রী।
সুজন মাহমুদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ায় অনুশ্রীর বাবা আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, ‘তার মেয়েকে প্রধানমন্ত্রী ডেকে উৎসাহ দেবেন; এটা তারা কখনো কল্পনাও করেননি।’
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় মেয়েকে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প বলতেন। এরপর থেকেই অনুশ্রীর বিশ্বাস জন্মায়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখলে হয়তো তার কাছ থেকেও সাড়া পাওয়া যাবে। সেই বিশ্বাস থেকেই জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে এসে সে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি চিঠি লেখে। কিন্তু সেই চিঠি যে প্রধানমন্ত্রীর হাতে পৌঁছাবে, তা জানতেন না। আর সেই চিঠি প্রধানমন্ত্রী পড়বেন; সেটাও ছিল অবিশ্বাস্য। আজ তারা কতটা খুশি, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেন না।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তার কাছ থেকে হারমোনিয়াম উপহার পেয়ে অনুশ্রী ও তার পরিবার গভীর আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। প্রধানমন্ত্রীর এই উৎসাহ তার সংগীতচর্চায় আরও অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং ভবিষ্যতে দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত সংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্নপূরণে তাকে এগিয়ে যেতে সাহস দেবে বলে জানায় তার পরিবার।
ফেসবুকে লিখে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জানান, একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তাবিউল ইসলাম রাকিব নামে এক নিরাপত্তাকর্মী। রাকিব রাজধানীর কুড়িল-বিশ্বরোড এলাকায় একটি বেসরকারি ভবনের নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করেন।
রাকিব জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবারের ভক্ত। তখন থেকেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল । সেই আকাক্সক্ষার কথা জানিয়ে তিনি সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ভিডিওতে তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঢাকা ছাড়বেন না। অবশেষে সেই ইচ্ছা পূরণ হওয়ায় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সাক্ষাৎকালে রাকিব প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার এলাকার দীর্ঘদিনের একটি জনদাবির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, মোরেলগঞ্জের পানগুছি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন। নদী পারাপারে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানে একটি সেতু নির্মিত হলে হাজারো মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে।
রাকিব ৭ মাস ধরে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন। তার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার নুরুল্লাহপুর শিকদারবাড়ি এলাকায়।
