১০ বছরে দাম বাড়াল আটবার

গ্রাহকসেবা নিয়ে নানা অভিযোগের মধ্যেও আরও এক দফা পানির দাম বাড়াল খুলনা ওয়াসা। এ নিয়ে গত ১০ বছরে আট বার পানির দাম বাড়াল সংস্থাটি। গত বছর জুন মাসে এক লাফে ১০ শতাংশ দাম বাড়িয়েছিল। এর ৯ মাস যেতে না যেতেই এবারে দাম বাড়ানো হয়েছে আরও ৫ শতাংশ। গত ১ মার্চ থেকে এই বিল কার্যকর শুরু হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ খুলনাবাসী।

নগরে ওয়াসার গ্রাহক প্রায় ৪৫ হাজার। নতুন দাম অনুযায়ী আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানি ব্যবহারের জন্য দিতে হবে ১০ টাকা ৩৮ পয়সা। সঙ্গে রয়েছে সার্ভিস চার্জ, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি ৪ টাকা ইউনিট ধরে পানির নতুন মূল্য তালিকা অনুমোদন করে ওয়াসা বোর্ড। এরপর ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি পানির দাম বাড়ানো হয় ২০ শতাংশ। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে দাম বাড়ানো হয় আরও ২০ শতাংশ। এভাবে আট দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ দর নির্ধারণ হয়েছে ৯ টাকা ৮৮ পয়সা, যা গত ১ মার্চ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৩৮ পয়সা।

খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘বছর বছর পানির দাম বাড়ানো অভ্যাসে পরিণত করেছে খুলনা ওয়াসার। গ্রাহকসেবা আইন অনুযায়ী সেবার দাম বৃদ্ধির আগে অবশ্যই গণশুনানি করতে হবে। অথচ ওয়াসা কখনো এই শুনানি করে না।’

ওয়াসার পানিতে মানুষ সন্তুষ্ট নয় উল্লেখ করে নগরের বয়রা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদুল ইসলাম লেনিন বলেন, ‘নগরবাসীর পানির সংকটে ওয়াসা যে ভূমিকা পালন করছে, তা অপ্রতুল ও অপর্যাপ্ত। ওয়াসার পানি এখনো সুপেয় হয়ে ওঠেনি।’

নিরালা এলাকার বাসিন্দা আবদুস সোবহান বলেন, ‘ওয়াসার সেবা পেতে আমরা ভোগান্তি পোহালেও পানির দাম বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটির নিয়মনীতির কোনো বালাই নেই।’

সোনাডাঙ্গা ক্রস রোড এলাকার বাসিন্দা মমতা রানী সাহা ওয়াসার পানির বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘মাঝে মাঝে কোনো নোটিস ছাড়াই পানি বন্ধ হয়ে যায়। নিয়মিত মূল্য পরিশোধ করলেও পানি নিয়ে আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকদের নানান অভিযোগের পরও ওয়াসার সেবার মান বাড়েনি। উল্টো বছর বছর গ্রাহকের খরচ বেড়েছে। এসব কারণে নগরবাসীর বড় একটি অংশ ওয়াসার পানি ব্যবহার না করে ব্যক্তি উদ্যোগে বাড়িতে সাবমার্সিবল পানির ব্যবস্থা রেখেছেন।

তবে খুলনা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, নাগরিক সেবার মান বাড়িয়ে চলেছেন তারা। এরই অংশ হিসেবে পানি সরবরাহের পাশাপাশি নগরে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কাজ চলমান। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, পানির মান এখন আগের থেকে অনেক ভালো। তবে নগরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী নগরে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে না তোলায় বাসাবাড়ির বর্জ্যপানি নালার পানিতে মিশছে।

খুলনা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক এম খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসায় প্রতি ইউনিট পানির মূল্য ১৬ টাকা ৭০ পয়সা, চট্টগ্রাম ওয়াসায় ১৮ টাকা। সেখানে খুলনায় প্রতি ইউনিটের দাম মাত্র ৯ টাকা ৮৮ পয়সা। সব বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিকভাবেই পানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে।’

খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) ঝুমুর বালা বলেন, ‘সরকারের পয়ঃনিষ্কাশনে আইনে রয়েছে বোর্ড অনুমোদন করলে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো যাবে। আইন মেনেই দাম বাড়ানো হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ২ মার্চ সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহব্যবস্থার কিছু কার্যক্রম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় খুলনা ওয়াসা। ২০১১ সালের দিকে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করে সংস্থাটি।

খুলনা নগরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস। প্রতিদিনের পানির চাহিদা প্রায় ২৪ কোটি লিটার। অথচ নগরের পানি সরবরাহব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা খুলনা ওয়াসা দিনে মাত্র সাত কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে পারে। আবার গরমের মৌসুমে সরবরাহকৃত পানির একটি অংশ লবণাক্ত হয়ে পড়ায় তা অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। ফলে পানির সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে খুলনা ওয়াসা পানি সরবরাহব্যবস্থা বুঝে নেওয়ার সময়ে ১০ হাজার নলকূপ ও ৪৮টি উৎপাদক নলকূপ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এ সময় নগরের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ পানির সুবিধা পেত।

ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে ৭২ শতাংশ মানুষ ওয়াসার পানি সেবার আওতায় এসেছে। নগরের ৪৫ হাজার ২০০ বাড়িতে রয়েছে তাদের পানির সংযোগ।