গত শুক্রবার মসজিদে নববির জুমার খুতবায় শায়খ ড. আহমদ ইবনে আলী হুজাইফি কোরআনে বর্ণিত নবী-রাসুলদের ঘটনা থেকে মানবজাতির শিক্ষা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে হজরত ইব্রাহিম, হাজেরা ও ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনাকে তাওহিদ, তাওয়াক্কুল, আত্মসমর্পণ ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। আল্লাহর নির্দেশে জনমানবহীন উপত্যকায় স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে আসা এবং হাজেরা (আ.)-এর অবিচল আস্থা প্রমাণ করে, সত্য বিশ্বাস মানুষকে কখনো হতাশ করে না। ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়ার মাধ্যমে মক্কা নিরাপদ নগরীতে পরিণত হয় এবং মানুষের হৃদয়ে এর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। পরে পিতা-পুত্র মিলে কাবাঘর নির্মাণ করেন, যা আজ তাওহিদের কেন্দ্র। এই কাহিনিতে আল্লাহর প্রতি বিনয়, ইবাদতের গুরুত্ব, শিরক থেকে বাঁচার আকুতি এবং দোয়ার শক্তি স্পষ্ট হয়।
শায়খ বলেন, হে ইমানদার ভাইয়েরা! আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে নবী-রাসুলদের যেসব ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তাতে রয়েছে উপদেশ ও শিক্ষা লাভের অনেক উৎস। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের এ কাহিনিগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, এটা কোনো বানানো গল্প নয়, বরং তাদের পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। আর হেদায়েত ও রহমত ওই কওমের জন্য যারা ইমান আনে।’ (সুরা ইউসুফ ১১১)
কোরআনের কাহিনিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর কাহিনি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম প্রার্থনা করেছিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি এ শহরকে নিরাপদস্থল করো এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের ওপর ইমান আনে, তাদেরকে ফলমূল হতে জীবিকা প্রদান করো। নির্দেশ হলো, যে কেউ কুফরি করবে তাকেও আমি কিছু দিনের জন্য উপকার লাভ করতে দেব এবং তারপর তাকে জাহান্নামের আগুনে দাখেল করব। কতই না নিকৃষ্ট তাদের ফেরার জায়গা।’ (সুরা বাকারা ১২৬)
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম বলল, হে আমার রব, আপনি এ শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন।’ (সুরা ইব্রাহিম : ৩৫)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ইব্রাহিম (আ.) যখন হাজেরা (আ.) ও তার দুগ্ধপোষ্য পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে আল্লাহর আদেশে মক্কায় রওনা হলেন, তখন তিনি তাদের একটি বড় গাছের নিচে কাবার বর্তমান জায়গায় রেখে আসলেন। তখন মক্কায় কোনো পানি ছিল না এবং কোনো মানুষও ছিল না। তিনি তাদের কাছে একটি থলেতে কিছু খেজুর এবং একটি মশকে কিছু পানি রেখে আসলেন। এরপর ইব্রাহিম (আ.) চলে যেতে লাগলেন। ইসমাইলের মা তার পিছু নিলেন এবং বললেন, আপনি আমাদের এমন এক উপত্যকায় রেখে কোথায় চলে যাচ্ছেন যেখানে কোনো মানুষ নেই, কিছুই নেই? তিনি বারবার এ কথা বললেও ইব্রাহিম (আ.) তার দিকে তাকাচ্ছিলেন না। তখন হাজেরা (আ.) বললেন, আল্লাহ কি আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন হাজেরা (আ.) বললেন, তবে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না। এরপর তিনি ফিরে আসলেন। ইব্রাহিম (আ.) যখন কাদা নামক পাহাড়ের মোড়ে পৌঁছলেন, সেখান থেকে তিনি আর তাদেরকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং এই কথাগুলো বলে দোয়া করলেন, যা মহান আল্লাহ কোরআনে তুলে ধরেছেন, ‘হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরদেরকে ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করালাম। হে আমাদের রব, যাতে তারা নামাজ আদায় করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদেরকে রিজিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, আশা করা যায় তারা শোকরিয়া আদায় করবে।’ (সুরা ইব্রাহিম ৩৭)
একদা ইব্রাহিম (আ.) তাদের কাছে ফিরে আসলেন। তখন তার পুত্র ইসমাইল যুবক হয়ে উঠেছেন। ইব্রাহিম (আ.) এসে দেখলেন, ইসমাইল জমজমের কাছে একটি বড় গাছের নিচে তার তীর ঠিক করছেন। তাকে দেখা মাত্রই ইসমাইল (আ.) দাঁড়িয়ে তার কাছে গেলেন এবং পিতা-পুত্র একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বিনিময় করলেন। এরপর ইব্রাহিম (আ.) বললেন, হে ইসমাইল! আল্লাহ আমাকে একটি আদেশ দিয়েছেন। ইসমাইল বললেন, আপনার পালনকর্তা আপনাকে যা আদেশ করেছেন তাই করুন। ইব্রাহিম (আ.) বললেন, তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে? ইসমাইল বললেন, আমি আপনাকে সাহায্য করব। তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে আদেশ দিয়েছেন, এই বলে তিনি চারপাশের তুলনায় একটি উঁচু জায়গার দিকে ইঙ্গিত করলেন। তখন তারা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করলেন। ইসমাইল (আ.) পাথর নিয়ে আসতেন এবং ইব্রাহিম (আ.) গাঁথতেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম ও ইসমাইল কাবার ভিতগুলো উঠাচ্ছিল (এবং বলছিল,) হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।’ (সুরা বাকারা ১২৭) তাদের উভয়ের ওপর এবং আমাদের নবীজির ওপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।
এটি এমন এক কাহিনি, যা মহান আল্লাহর প্রতি ইমান, তার দাসত্বের সত্যতা এবং তার আদেশের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণের অর্থে পরিপূর্ণ। কাহিনির প্রথম পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই, মহান আল্লাহর প্রতি ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই বিস্ময়কর আনুগত্য, যা অটল বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একইভাবে হাজেরা (আ.)-এর সেই আত্মসমর্পণ আমাদের অবাক করে দেয়, যার হৃদয় ছিল মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থায় ভরপুর। এটি ছিল মূলত সেই জনশূন্য উপত্যকায় ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর পবিত্র ঘর নির্মাণের একটি ঐশী প্রস্তুতি। মহান আল্লাহ তার ঘরকে মানুষের মিলনস্থল ও নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং এটাকে তাওহিদের অন্যতম নিদর্শন ও একমাত্র তার ইবাদতের শ্রেষ্ঠ স্থান বানিয়েছেন। মহান আল্লাহ মানুষের হৃদয়কে তাদের প্রতি অনুরাগী করেছেন এবং তাদেরকে ফলমূল দিয়ে রিজিক দান করেছেন, যা ছিল ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়ার ফল।
ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের নিকট হজের ঘোষণা দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং কৃশকায় উটে চড়ে দূর পথ পাড়ি দিয়ে।’ (সুরা হজ ২৭) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। হাজিদের সেই বিশাল জনস্রোত দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে, যাতে তারা তাদের কল্যাণ প্রত্যক্ষ করতে পারে, তাদের হজের কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারে এবং প্রাচীন ঘর তাওয়াফ করতে পারে। তারা এই পবিত্র ভূমিতে দলে দলে আসছে, সেখানে বিরাজ করছে প্রশান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং (আদেশ দিলাম) তোমরা মাকামে ইব্রাহিমকে নামাজের স্থানরূপে গ্রহণ করো। আর আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।’ (সুরা বাকারা ১২৫)
হে মুসলিম জাতি! এই কাহিনির অন্যতম শিক্ষা হলো ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান দোয়াগুলো, যা তিনি তখন করেছিলেন। সেখানে আমরা দেখতে পাই আল্লাহর প্রতি তার বিনয়, মুখাপেক্ষিতা এবং সত্য দাসত্বের চিত্র। সেখানে ফুটে উঠেছে আল্লাহর কাছে শিরক থেকে মুক্তি এবং তাওহিদের মর্যাদা রক্ষার আকুতি। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং নিজের সামর্থ্য ত্যাগ করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলেছিলেন, ‘হে আমার রব, আপনি এ শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন। হে আমার রব, নিশ্চয় এসব মূর্তি অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করেছে, নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত, আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ইব্রাহিম ৩৫-৩৬)
একইভাবে যখন তিনি কাবার ভিত্তি স্থাপন করছিলেন, তখন আল্লাহর কাছে কাজ কবুল হওয়ার আকুতিও প্রকাশ পায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে ও আমার বংশধরদের নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান। হে আমাদের পালনকর্তা! আমার দোয়া কবুল করুন। হে আমাদের পালনকর্তা! হিসাবের দিন আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন।’ (সুরা ইব্রাহিম ৪০-৪১)
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল প্রেরণ করুন যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ পাঠ করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা বাকারা ১২৯)
হে বিশ্বাসীরা! আপনারা এখানে প্রশান্তি ও ইমানের ছায়াতলে রয়েছেন এবং প্রশান্তি ও নিরাপত্তার উদ্যানে বিচরণ করছেন। এটি আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত, যা তার প্রশংসা ও শোকরিয়া আদায়ের দাবি রাখে।
আপনারা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করুন। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর এবং তার পরিবার ও সব সাহাবির ওপর শান্তি ও বরকত নাজিল করুন।
১ মে শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন
মুফতি আতিকুর রহমান