বিপদে ধৈর্য ধারণ ও তকদিরে বিশ্বাস

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩০ এএম

পৃথিবীতে মানুষের জীবন বৈচিত্র্যময়। এখানে সুখ আছে। আবার দুঃখও আছে। আছে প্রাপ্তি ও বঞ্চনা। আছে হাসি ও কান্না। মানুষ কখনো সম্পদ হারায়। কেউ প্রিয়জনকে হারায়। কেউ অসুস্থতায় ভোগে। কেউ আবার অপবাদ, ব্যর্থতা বা দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়। এসব মুহূর্তেই মানুষের ইমানের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। একজন মুমিন জানেন, কোনো ঘটনাই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। প্রতিটি বিপদের পেছনেই রয়েছে তার প্রজ্ঞা। তাই তিনি ধৈর্য ধারণ করেন। তকদিরের প্রতি বিশ্বাস রাখেন। আর আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় থাকেন।

বিপদ আল্লাহর পরীক্ষা : মহান আল্লাহ পৃথিবীকে পরীক্ষার স্থান হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে নানাভাবে পরীক্ষা করা হয়। কখনো সুখ দিয়ে, কখনো দুঃখ দিয়ে, কখনো অভাব দিয়ে, কখনো ভয় দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার ইমান, আন্তরিকতা ও ধৈর্য যাচাই করেন।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জানমাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা ১৫৫)

ধৈর্য মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি : ধৈর্য মানে শুধু কষ্ট সহ্য করা নয়। ধৈর্য মানে আল্লাহর অবাধ্য না হয়ে কঠিন সময় পার করা। অভিযোগে সীমা লঙ্ঘন না করা। হতাশ না হওয়া। নিজের দায়িত্ব পালন করে আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষা করা। ধৈর্য মানুষকে ভেঙে পড়তে দেয় না। বরং আরও শক্তিশালী করে তোলে। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে পারে, সে সংকটের মধ্যেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ১৫৩)

এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর কী হতে পারে? যখন একজন মানুষ বিপদে পড়েও জানেন, আল্লাহ তার সঙ্গে আছেন, তখন তার হৃদয়ে নতুন করে সাহস জন্ম নেয়।

তকদিরে বিশ^াস : ইসলামের মৌলিক আকিদাগুলোর একটি হলো তকদিরের প্রতি বিশ্বাস। অর্থাৎ পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, সবই আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার অধীন।

তবে তকদিরের প্রতি বিশ^াস কখনো অলসতার শিক্ষা দেয় না। ইসলাম মানুষকে চেষ্টা করতে বলে। পরিকল্পনা করতে বলে। চিকিৎসা নিতে বলে। জীবিকা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতে বলে। এরপর ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করতে বলে।

অনেকেই ব্যর্থতার পর বলেন, সবই তকদির। আবার কেউ চেষ্টা না করেই তকদিরের অজুহাত দেন। এটি ইসলামের শিক্ষা নয়। প্রকৃত ইমান হলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং যে ফল আসে, তা আল্লাহর ফয়সালা হিসেবে মেনে নেওয়া।

নবীদের জীবন ধৈর্যের অনন্য শিক্ষা : নবীদের জীবন ধৈর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ভরা। হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘদিন কঠিন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তবুও তিনি আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করেননি। ধৈর্য ধরে তার রহমতের অপেক্ষা করেছেন। হজরত ইয়াকুব (আ.) বহু বছর প্রিয় সন্তান ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদ সহ্য করেছেন। তার চোখের দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। তবুও তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। হজরত ইউসুফ (আ.) ভাইদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। দাস হিসেবে বিক্রি হয়েছেন। কারাগারে বন্দি থেকেছেন। কিন্তু ধৈর্য ও সততার কারণে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনও ছিল কঠিন পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। তায়েফে তাকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। ওহুদের যুদ্ধে তিনি আহত হয়েছেন। তবুও তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখেছেন।

বিপদে লুকিয়ে থাকে কল্যাণ : মানুষ সবসময় বুঝতে পারে না কোন ঘটনার মধ্যে তার জন্য কল্যাণ রয়েছে। অনেক সময় যে কষ্টকে আমরা সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য মনে করি, সেটিই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় কল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ তাতেই তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ করছ, অথচ তাতেই রয়েছে অকল্যাণ। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা ২১৬)

বিপদের সময় করণীয় : বিপদের সময় প্রথম কাজ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। নিয়মিত নামাজ আদায় করা। আন্তরিকভাবে দোয়া করা। বেশি বেশি ইস্তিগফার করা। কোরআন তেলাওয়াত করা। সম্ভব হলে সদকা করা। এগুলো মানুষের হৃদয়কে প্রশান্ত করে। আল্লাহর রহমত লাভের পথ খুলে দেয়। একই সঙ্গে বাস্তব কারণও গ্রহণ করতে হবে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে হবে। আর্থিক সমস্যায় পরিশ্রম বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ নিতে হবে। ইসলাম কখনো নিষ্ক্রিয়তার শিক্ষা দেয় না।

হতাশা মুমিনের কাজ নয় : শয়তান চায় মানুষ বিপদে পড়ে আল্লাহর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলুক। কিন্তু একজন মুমিন জানেন, আল্লাহর রহমত অসীম। যত বড় বিপদই আসুক, তার সাহায্য আসতে পারে যে কোনো মুহূর্তে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুখে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। এটি তার জন্য কল্যাণ। আর দুঃখে সে ধৈর্য ধারণ করে। এটিও তার জন্য কল্যাণ। (সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস একজন মুমিনকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়। তার জীবনকে আশাবাদী করে তোলে।

ধৈর্যের প্রতিদান সীমাহীন : আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ধৈর্যশীলদের প্রতিদান পরিমাপ ছাড়া সীমাহীন দেওয়া হবে। (সুরা জুমার ১০)

দুনিয়ায় ধৈর্য মানুষকে সম্মানিত করে। আখেরাতে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা এনে দেয়। তাই কোনো কষ্টই বৃথা যায় না। আল্লাহর কাছে প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবং প্রতিটি ধৈর্যের মুহূর্ত সংরক্ষিত থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত