দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় যারা দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হন, সে সকল ব্যক্তিরা সংবাদ প্রকাশ ও টেলিভিশনে সম্প্রচার বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন উপায়ে গণমাধ্যমের মালিকদের ওপর চাপ তৈরি করেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম উদ্যোক্তা, টাইমস মিডিয়া লিমিটেড ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে আজাদ শনিবার (৯ মে) ঢাকায় এক সম্মেলনে এ কথা বলেন।
রাজধানীর র্যাডিসন হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সের’ দ্বিতীয় ও শেষ দিন ‘বাংলাদেশে গণমাধ্যমের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ: পেশাগত নজরদারি, জবাবদিহিতা ও অভিযোগ মোকাবিলা’ শীর্ষক এক অধিবেশনে তিনি অন্যতম বক্তা হিসেবে অংশ নেন।
গণমাধ্যম মালিকদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রায়ই নানা ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হয়, এমন মন্তব্য করে এ কে আজাদ বলেন, ‘কেউ বলতে পারবে না, গণমাধ্যম স্বাধীন।’
সৎ সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন এবং পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, এটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কালো টাকার মালিকদের প্রভাব থেকে গণমাধ্যমকে রক্ষা করা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়নগুলো এক ও শক্তিশালী হতে হবে।
নিজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না, এ কথা অকপটে স্বীকার করে তিনি বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, সৎ সাংবাদিকতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব কারণে তাকে প্রধান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ ও কর্মীদের সুরক্ষার দিকগুলো বিবেচনায় নিতে হয়।
আজাদ বলেন, আমার যে চ্যানেল টোয়েন্টিফোর এবং (দৈনিক) সমকাল, এখানে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। কেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না? তার মূল অন্তরায় আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখানে আমার ৭৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করে। তাদের স্বার্থটা আমাকে আগে দেখতে হবে। তারপর সৎ সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কিংবা গণতন্ত্র এগুলো আমার কাছে সেকেন্ডারি, ফান্ডামেন্টাল হলো এদের প্রটেকশন।
মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে দুই দিনব্যাপি এ সম্মেলনের আয়োজন করে। দেশ-বিদেশের পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক, সম্পাদক, গবেষক এবং সাংবাদিকতার শিক্ষকের অংশগ্রহণে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এ. কে. আজাদ বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে একজন প্রতিবেদককে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। নানা ঝুঁকি নিতে হয়। কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সাংবাদিক যখন অভিযুক্ত ব্যক্তির মন্তব্য নিতে যান, তখন প্রায়ই প্রথম চাপ আসে মালিকপক্ষের ওপর। তারা সরাসরি গণমাধ্যমের মালিকপক্ষকে ফোন করে সংবাদ প্রকাশ ও টেলিভিশনে সম্প্রচার বন্ধ করার চেষ্টা করেন। এরপরও কাজ না হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা বা সরকারের উচ্চপর্যায়কে ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
আজাদ জানান, অনেক সময় তিনি নিজেই সাংবাদিকদের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তখন সাংবাদিকদের কাছ থেকে তিনি কঠিন প্রতিক্রিয়া পান। সাংবাদিকরা জানান, যদি সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ না করা হয়, তাহলে তথ্যদাতা মনে করতে পারেন, কোনোকিছুর বিনিময়ে সংবাদটি গোপন রাখা হয়েছে। এতে সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একজন গণমাধ্যম উদ্যোক্তা হিসেবে এমন অবস্থান গ্রহণ করা তার ব্যক্তিগত বিবেককে নাড়া দেয়, এ বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, একদিকে সাংবাদিকের স্বাধীনতা, অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার চাপ- এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে তাকে চলতে হয়।
আজাদ মনে করেন, গণমাধ্যম মালিকদের জন্য যদি এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, যেখানে হয়রানি, গ্রেপ্তার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক বাধার আশঙ্কা থাকবে না, তাহলে মালিকপক্ষ সাংবাদিকদের কাজের ওপর অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে না।
গণমাধ্যমের মালিকানার ধরন প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে দুই ধরনের মালিক গণমাধ্যমে আসছেন। একদল সমাজের দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করার উদ্দেশে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করছেন। আরেকটি অংশ নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা, অবৈধ অর্থ ও অন্যান্য অনিয়ম আড়াল করার উদ্দেশে গণমাধ্যমের মালিক হচ্ছেন।
বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক আহবায়ক কামাল আহমেদ, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আইন বিশেষজ্ঞ ড. জোয়ান বারাতা ও প্রথম আলোর ইংরেজি বিভাগের প্রধান আয়েশা কবীর আলোচনায় অংশ নেন।