দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় যারা দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হন, সেসব ব্যক্তি সংবাদ প্রকাশ ও টেলিভিশনে সম্প্রচার বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন উপায়ে গণমাধ্যমের মালিকদের ওপর চাপ তৈরি করেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম উদ্যোক্তা, টাইমস মিডিয়া লিমিটেড ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ শনিবার ঢাকায় এক সম্মেলনে এ কথা বলেন।
রাজধানীর রেডিসন হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সের’ দ্বিতীয় ও শেষ দিন তিনি এক অধিবেশনে অন্যতম বক্তা হিসেবে অংশ নেন। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে। গণমাধ্যম মালিকদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রায়ই নানা ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হয়, এমন মন্তব্য করে আজাদ বলেন, ‘কেউ বলতে পারবে না, গণমাধ্যম স্বাধীন।’
সৎ সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন এবং পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, এটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কালো টাকার মালিকদের প্রভাব থেকে গণমাধ্যমকে রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক ও শক্তিশালী হতে হবে।
নিজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না, এ কথা অকপটে স্বীকার করে তিনি বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, সৎ সাংবাদিকতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব কারণে তাকে প্রধান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ ও কর্মীদের সুরক্ষার দিকগুলো বিবেচনায় নিতে হয়।
আজাদ বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে একজন প্রতিবেদককে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। নানা ঝুঁকি নিতে হয়। কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সাংবাদিক যখন অভিযুক্ত ব্যক্তির মন্তব্য নিতে যান, তখন প্রায়ই প্রথম চাপ আসে মালিকপক্ষের ওপর। তারা সরাসরি গণমাধ্যমের মালিকপক্ষকে ফোন করে সংবাদ প্রকাশ ও টেলিভিশনে সম্প্রচার বন্ধ করার চেষ্টা করেন। এরপরও কাজ না হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা বা সরকারের উচ্চপর্যায়কে ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
আজাদ জানান, অনেক সময় তিনি নিজেই সাংবাদিকদের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তখন সাংবাদিকদের কাছ থেকে তিনি কঠিন প্রতিক্রিয়া পান। সাংবাদিকরা জানান, যদি সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ না করা হয়, তাহলে তথ্যদাতা মনে করতে পারেন, কোনো কিছুর বিনিময়ের মাধ্যমে সংবাদটি গোপন রাখা হয়েছে। এতে সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গণমাধ্যমের মালিকানার ধরন প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে দুই ধরনের মালিক গণমাধ্যমে আসছেন। একদল সমাজের দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করার উদ্দেশে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করছেন। আরেকটি অংশ নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা, অবৈধ অর্থ ও অন্য অনিয়ম আড়াল করার উদ্দেশে গণমাধ্যমের মালিক হচ্ছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একটি অধিবেশনে বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দেশে ব্যবসা ও রাজনীতির ক্রমবর্ধমান যোগসাজশ গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।