৩৩ কিমি জুড়ে মৃত্যুফাঁদ 

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ৩৩ কিলোমিটার ক্রমেই যেন মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছে। সড়কজুড়ে গর্ত-খানাখন্দ আর বেপরোয়া যানবাহনের কারণে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে হাজারো মানুষ। এ সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ। অথচ সড়কটি সংস্কারে ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প পড়ে আছে অনুমোদনের অপেক্ষায়। গত ৭ জুলাই হরিণটানা থানার পল্লীবিদুৎ অফিসের সামনে ট্রাক-ইজিবাইক সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়। গত ৩ জুন ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া এলাকায় যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে পড়ে যায়। কিছুদিন আগে খর্নিয়া-চুকনগর এলাকায় ঘাতক ট্রাকের চাপায় ইজিবাইক ও থ্রি-হুইলার দুমড়ে-মুচড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড় থেকে আঠারো মাইল পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার মহাসড়কটির দুর্ঘটনা রোধ ও যাতায়াত সহজ করতে গত কয়েক বছর খুলনা নাগরিক সমাজের নেতারা সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার দাবি তোলেন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মরকলিপি প্রদানসহ একাধিকবার সড়ক ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে সংগঠনটি। খুলনাবাসীর দাবির মুখে খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ উপকূলবর্তী জনগুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটির জন্য ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বান করে। মোজাহার এন্টারপ্রাইজ ও হাসান টেকনোসহ চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পের কাজ পায়। এ প্রকল্পের জন্য অধিদপ্তরে ১০০ কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় ৫০ কোটি টাকা পাস করে, বাকি ৫০ কোটি টাকা পাস না হওয়ায় অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে আছে প্রকল্পটি।

খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ৬৪ কিলোমিটার। এরমধ্যে খুলনা সড়ক বিভাগের অধীনে খুলনা-আঠারো মাইল অংশের ৩৩ কিলোমিটারের সংস্কারের কাজের জন্য ২০১৭ সালে প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে, শেষ হয় ২০২১ সালের মার্চে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজের সীমাহীন দুর্নীতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং খুলনা সড়ক বিভাগের কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতি কারণে ১৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি মাত্র আড়াই বছরে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়। এছাড়া এই মহাসড়ক সংস্কারের জন্য প্রতি বছর এক-দেড় কোটি টাকা বাজেট হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়সারার মতো কাজ করায় বছর না ঘুরতেই এই সড়ক আবার বেহাল দশায় পরিণত হয়। সড়কজুড়ে তৈরি হয় গর্ত ও খানাখন্দ। বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল দ্বিগুণ হয়ে যায়। তাছাড়া সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে পাথরবোঝাই ভারী যানবাহন চলাচল বেড়ে যাওয়ায় এই মহাসড়কের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে এই সড়কে রেকর্ড সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে।

এ বিষয়ে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, এই মহাসড়কটি বছরে একবার ইট-বালু দিয়ে নামমাত্র সংস্কার করা হয়। কয়েকদিন যেতে না যেতেই আবার পূর্বের রূপে ফিরে আসে। তাছাড়া মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের চাপে রাস্তাটি চলাচলে স্বভাবিক যোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে। জববাদিহি না থাকায় খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ এটা না দেখার ভান করে থাকে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এলাকাবাসী খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

খুলনা সড়ক বিভাগ জানায়, ২০২৫ সালে এই সড়কের আরসিসি ঢালাইয়ের জন্য ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম ইঞ্জিনিয়ারিং এই প্রকল্পের কাজ পায়। এই প্রকল্পের অর্থায়নে নগরীর জিরো পয়েন্টে ১২০০ মিটার ও চুকনগরে ১২৫০ মিটার আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ হয়। এছাড়া আরও কিছু ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কার্পেটিংয়ের কাজ হয়। ৩৩ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র ২৪৫০ মিটার আরসিটি ঢালাই হলেও এই সড়কের ২০ কিলোমিটার একেবারে চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, ‘খুলনা-আঠারো মাইল মহাসড়কটি মজবুত ও টেকসইকরণে আরসিসি ঢালাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এজন্য ঢাকা থেকে দুজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এই সড়ক সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এখন আমরা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমোদন পেলেই দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত