ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নীতি সাফল্যের কারণ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শাহাজালাল ইসলামী ব্যাংকে এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। গত বছর শেষে ব্যাংকটি ৩৬৮ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১৯৯ কোটি টাকা বা প্রায় ১১৮ শতাংশ বেশি। আর্থিক সূচকে শক্তিশালী অবস্থানের পেছনে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নীতি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটিকে সাফল্য এনে দিয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। আজ ১০ মে ব্যাংকটির ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দিবস উপলক্ষে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

দেশ রূপান্তর : প্রতিষ্ঠার পর আড়াই দশক পার করেছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। দীর্ঘ সময় আপনাদের ব্যাংকের গ্রাহক সেবা ও পরিধি কোন পর্যায়ে রয়েছে।

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : ২৫ বছরে আমরা দেশব্যাপী ১৪২টি শাখা, ৫টি উপশাখা, ১৫২টি এটিএম বুথ, ১৩০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট, অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট ও প্রায়োরিটি সেন্টারে দক্ষ জনবলের মাধ্যমে গ্রাহক সেবা দিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই গ্রাহকরা সব লেনদেন করতে পারছেন। আমরা ইসলামি শরিয়াহর ওয়াকালাহ ধারণা অনুসরণ করে ইসলামি ক্রেডিট কার্ড চালু করেছি। ২৪ ঘণ্টা এটিএম সার্ভিস, রিয়েল টাইম অনলাইন ব্যাংকিং, এসএমএস পুশ-পুল সার্ভিসসহ সব সুবিধা রয়েছে। বৈদেশিক রেমিট্যান্সের জন্য ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানিগ্রামসহ বিশ্বের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। সব শাখায় অনলাইন ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট ও ই-জিপি সার্ভিস চালু আছে। ই-জিপিতে কোনো চার্জ নেই। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।

দেশ রূপান্তর : গত দশকে সুশাসনের অভাবে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাটাই নাজুক হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কী কী করা দরকার বলে মনে করেন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : সুশাসন চাইলে সবার আগে ব্যাংকের পর্ষদকে এগিয়ে আসতে হবে। পর্ষদ যদি নিজেরাই সুশাসন মেনে চলে, তাহলে ভেতরের কারও অনিয়ম করার সুযোগ নেই। এটা শুধু দায়িত্ব নয়, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য খুবই জরুরি।

দেশ রূপান্তর : আপনাদের ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক। শরিয়াহ পর্ষদ আসলে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে দুটো পর্ষদ থাকে, মালিকদের বোর্ড আর শরিয়াহ পর্ষদ। অনেক জায়গায় দেখি মালিকদের সিদ্ধান্তই শরিয়াহ পর্ষদকে মেনে নিতে হয়। ফলে শরিয়াহ পর্ষদের গুরুত্ব অনেক কমে যায়। আমরা মনে করি, আইন করে দুই পর্ষদকে সমান শক্তিশালী আর স্বাধীন করা উচিত। তাহলে সুশাসন নিশ্চিত হবে। এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মান বড়বে।

দেশ রূপান্তর : আপনাদের বোর্ড ও পর্ষদের মধ্যে সমন্বয় কেমন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : আমাদের বর্তমান বোর্ড খুবই দক্ষ। তারা সুচিন্তিত নীতি আর দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে ব্যবস্থাপনাকে পুরোপুরি সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন। পর্ষদ আর ব্যবস্থাপনার মধ্যে শতভাগ স্বচ্ছতার সম্পর্ক বিদ্যমান। এ জন্যই আমরা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবার ওপরে এবং দেশের সেরা ব্যাংকগুলোর একটা হয়ে উঠতে পেরেছি।

দেশ রূপান্তর : শুরুতে প্রযুক্তিগত সেবার বিষয়ে বলেছেন। এ সেবা ও মান বৃদ্ধিতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছেন কি?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : বিশ্ব এখন প্রযুক্তিনির্ভর। তাই আমরা ডিজিটাল সেবায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। গ্রাহক যেন ঘরে বসে ঋণের আবেদনসহ যেকোনো ব্যাংকিং সহজে করতে পারেন, সে ধরনের সেবাই আমাদের লক্ষ্য। প্রযুক্তি যত সহজ আর নিরাপদ হবে, গ্রহকদের ততবেশি বিশ্বাস অর্জন করা যাবে।

দেশ রূপান্তর : ক্যাশলেস অর্থনীতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর কতটা গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : মানুষের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের আগ্রহ বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, অ্যাপ আর ক্রেডিট কার্ড একসঙ্গে চললে ক্যাশলেস অর্থনীতি অনেক দ্রুত এগোবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আমরা সব উদ্যোগই বাস্তবায়ন করে আসছি। ক্যাশলেস অর্থনীতিতে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক সফলতা দেখাচ্ছে এবং দক্ষতার পরিচয় রাখবে।

দেশ রূপান্তর : ঋণ বিতরণে আপনারা কাদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন? অর্থাৎ কোন খাতকে প্রাধান্য দিচ্ছেন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : বড় বড় ঋণের চেয়ে ছোট-মাঝারি ঋণকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। রিটেইল, এসএমই, কৃষি, গবাদি পশু, মসলা ও উৎপাদনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য আমাদের বিনা জামানতে ঋণের সুবিধা রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনে আপনার ব্যাংক কতটা সক্রিয়? এই খাতে কী কী উদ্যোগ রয়েছে।

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : আমাদের ব্যাংক যেদিন থেকে যাত্রা শুরু করেছে, সেদিন থেকেই সামাজিক দায়বদ্ধতাকে প্রধান্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। শাহাজালাল ব্যাংক সবসময় মেধাবী শিক্ষার্থী, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, অবহেলিত অঞ্চল ও মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি। আর্থিক সাহায্য, বিনামূল্যে চিকিৎসা, দুর্গত এলাকায় ত্রাণ, মেধাবী  ছেলেমেয়েদের বৃত্তিসহ সবধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ নিয়মিত করে যাচ্ছি। ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাব।

দেশ রূপান্তর : আপনার ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি কী?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : বর্তমানে আমাদের আমানতের পরিমাণ ৩০ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। বিনিয়োগ ২৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। আমদানি ৪৬ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি ৪৪ হাজার কোটি টাকার। গ্রাহক সংখ্যা ১২ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৩ জন। ইমার্জিং ক্রেডিট রেটিং লিমিটেডের দিক থেকে আমারা এএ+ (লং টার্ম) এবং এসটি-২ (শর্ট টার্ম) রেটিং-এ রয়েছি। এটা স্পষ্ট প্রমাণ করে গ্রাহকের আমানত আর বিনিয়োগ দুটোই একদম নিরাপদ।

দেশ রূপান্তর : ব্যাংকিং সেবায় আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : শাখা বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি, যাতে সবাই ঘরে বসে সেবা পায়। গ্রাহকদের মধ্যে প্রবাসী (রেমিট্যান্স) গ্রাহকদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। ঋণের ক্ষেত্রে সিএমএসএমই খাতকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি এবং সামনের দিনে তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দেব।

দেশ রূপান্তরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

দেশ রূপান্তর ও দেশ রূপান্তর পাঠকদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।