দেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধসহ ৮ হাজার ৪২৮ পণ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, যন্ত্রাংশসহ মোট ১ হাজার ৫৪ পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানিতে একই ধরনের সুবিধা পাবে। এ লক্ষ্যে দুটি দেশের মধ্যে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে দুই দেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের পরই চুক্তিটি কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
গতকাল মঙ্গলবার দীর্ঘ এক বছরের আলোচনার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর এ বিষয়ে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশের প্রধান নেগোশিয়েটর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তার, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান নেগোশিয়েটর পার্ক গিউন-ওহ এবং ডেপুটি প্রধান নেগোশিয়েটর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (এফটিএ) মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় যেসব পণ্য রপ্তানি হয় তার ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা রপ্তানিতে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই সুবিধা পাওয়া যাবে। বর্তমান সরকার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বিশ্বের দুই ট্রিলিয়ন অর্থনীতির একটি বড় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিটির চূড়ান্ত আলোচনা শেষ করতে হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, হোম টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন রপ্তানিপণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করবে।
তিনি বলেন, চুক্তিতে কোনো গোপন শর্ত নেই। এর সব ধারা উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং যে কেউই এটা বিশ্লেষণ করতে পারবে। তিনি জানান, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সে লক্ষ্য অর্জনে ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এ জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার তা বাংলাদেশে নেই। সরকার রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এ ধরনের বাণিজ্যচুক্তিতে যাচ্ছে, যা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার এটা তাড়াহুড়া করে করেনি। দুই বছরের কাজ দিনরাত খেটে মাত্র ছয় মাসে শেষ করে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। এটা কোনো গোপন বিষয় নয়। সবই উন্মুক্ত করা হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও বলেন, বাংলাদেশ ও কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস ৫৬ বছরের। এতদিন সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূলত টেক্সটাইল খাত। এ চুক্তির মধ্য দিয়ে দুদেশের মধ্যে একটি মহাসড়কের মাধ্যমে সেতুবন্ধ তৈরি হলো। সরকার এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে যাতে করে ব্যবসায়ীরা এখান থেকে সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। এখন সময় এসেছে সম্পর্ককে প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, শিল্প সহযোগিতা ও বিনিয়োগের মতো নতুন খাতে সম্প্রসারণের। তিনি বলেন, সিইপিএ কার্যকর হলে কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ আরও বাড়বে।
সেবা খাতেও বড় অঙ্গীকার দক্ষিণ কোরিয়ার : পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও দুই দেশ উল্লেখযোগ্য বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ কোরিয়ার জন্য ৯৫টি উপখাত উন্মুক্ত করবে। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি উপখাতে চারটি মোডে সেবা বাণিজ্যের সুযোগ দেবে। এতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৫ সালের ২২ থেকে ২৭ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে প্রথম দফা আলোচনা শুরু হয়। পূর্বনির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী মোট পাঁচ দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশে দুই দফা এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় তিন দফা বৈঠক হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অনিষ্পন্ন বিষয়ে প্রধান নেগোশিয়েটর পর্যায়ে প্রায় ৪০টি অনলাইন বৈঠক হওয়ার পর আলোচনার সমাপ্তি ঘটে।
বাণিজ্য সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ : বর্তমানে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ডলার, আর আমদানি করে প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৪১১ মিলিয়ন ডলার।
‘ভিলেজ সোসাইটি’র আজ ৫০তম পর্ব
