আজকাল ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ‘নির্মাণকাজ চলিতেছে’ লেখা সাইনবোর্ডের দেখা পাওয়া যাচ্ছে বেশ। চিত্রটা সারা দেশে প্রায় একই। প্রতি বছর এপ্রিল-জুনে দেশজুড়ে প্রচুর ‘উন্নয়ন’ কার্যক্রম চলে। চলে অবিরাম রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি! কিন্তু সারা বছর বাদ দিয়ে, বর্ষাকালে কেন এত কাজ একসঙ্গে শুরু হয় জনমনে এই প্রশ্ন সবসময়ই। বর্ষাকালে এই ধরনের কাজের ‘ঢল’ নামার কারণ আমাদের অর্থবছরের ধরন। জুন মাসে এসে অর্থবছর শেষ হয়, আর সবাই এর ফলে সারা বছর অপেক্ষা করে জুন মাসের। এপ্রিল-জুন মাসে ঝড়-বৃষ্টি যেমন আসে, তেমনি আসে তথাকথিত এই ‘উন্নয়ন’ কাজের ধুম! বাংলাদেশে যখন বর্ষা নামে, তখন শুধু নদী-খাল ভরে ওঠে না, সরকারি ব্যয়ের খাতাও হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে ওঠে। জুন এলেই যেন এক অদৃশ্য তাড়াহুড়ো শুরু হয়: প্রকল্প শেষ করতে হবে, বরাদ্দ খরচ দেখাতে হবে, নইলে ‘অব্যবহৃত’ অর্থের দায় নিতে হবে। এই বার্ষিক দৃশ্যপটটা, এতটাই পরিচিত যে অর্থনীতিবিদরা একে নাম দিয়েছেন ‘জুন রাশ’ বা জুনের ভীষণ ব্যস্ততা। প্রশ্ন হচ্ছে, অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত এই জুন রাশের পেছনে, কাঠামোগত মূল কারণটি কী? উত্তরটি সরল, আমাদের জুলাই-জুন অর্থবছর। যেমনটা আগে উল্লেখ করেছি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও, বাংলাদেশ এখনো এমন একটি অর্থবছর ধরে রেখেছে, যার যৌক্তিকতা বর্তমান বাস্তবতায় ক্রমেই ক্ষীণ।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ, বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো, তাদের আর্থিক পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা ক্যালেন্ডার বছরের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ফেলেছে। অথবা অন্তত এমন সময়সূচি বেছে নিয়েছে যা তাদের জলবায়ু, উৎপাদন চক্র ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সঙ্গে খাপ খায়। আমরা কেন সেই অতি প্রয়োজনীয় বিষয়টি প্রশ্নটি এড়িয়ে যাচ্ছি? বাংলাদেশে জুন মাস এলেই যেন এক অদ্ভুত তাড়াহুড়োর আবহ তৈরি হয়। অফিসপাড়ায় ব্যস্ততা বেড়ে যায়, প্রকল্পের কাজ হঠাৎ গতি পায়, ব্যয় বাড়তে থাকে অস্বাভাবিকভাবে। ফাইলের স্তূপ দ্রুত সরে, সিদ্ধান্ত আসে দ্রুত, যেন সময়ের সঙ্গে এক প্রতিযোগিতা চলছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি নিছক প্রশাসনিক কর্মচাঞ্চল্য মনে হতে পারে, কিন্তু ভেতরে এটি একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। জুলাই-জুন অর্থবছরের এই চক্র আমাদের এমন এক বাস্তবতায় আবদ্ধ করেছে, যেখানে পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা উঠলেই, একটি যুক্তি প্রায়ই সামনে আসে ‘আমরা তো একা নই। আরও অনেকেই তো জুলাই-জুন মাসকে অর্থবছর হিসেবে নিয়েছে!’ কিন্তু সত্যিই কি অনেক দেশ ‘জুলাই-জুন’ মাসকে অর্থবছর হিসেবে গণ্য করে? পুরো পৃথিবীতে মাত্র ১০-১৫টা দেশে জুলাই-জুন মাস এক অর্থবছর হিসেবে স্বীকৃত। অন্যদিকে, ১৩০ থেকে ১৫০টি দেশেই অর্থবছর হয় জানুয়ারি-ডিসেম্বর। দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, চিত্রটি বেশ বৈচিত্র্যময়। বাংলাদেশ ছাড়া কেবল পাকিস্তান এখনো জুলাই-জুন অর্থবছর অনুসরণ করছে।
অন্যদিকে ভারত এপ্রিল-মার্চ চক্রে চলে, নেপাল মধ্য জুলাই থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত তাদের হিসাব রাখে, আর শ্রীলঙ্কা ইতিমধ্যেই জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে, নিজেদের অর্থবছরকে সামঞ্জস্য করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে, এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট প্রবণতা চোখে পড়ে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এদের অধিকাংশই ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে অর্থবছরকে একীভূত করেছে। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন চক্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা। যখন আন্তর্জাতিক বাজার জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের হিসাব ধরে এগোয়, তখন একই সময়চক্র অনুসরণ করলে সমন্বয় সহজ হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হয়, আর তথ্য বিশ্লেষণও হয় আরও সুসংগতভাবে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আমরা কি আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময়কে পুনর্বিবেচনা করতে প্রস্তুত? জুন মাসের এই অস্বাভাবিক ব্যস্ততা কি কেবল একটি মৌসুমি চিত্র, নাকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার লক্ষণ? যদি এর দ্বিতীয়টি হয়, তবে হয়তো এখনই সময়- সেই কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার। কেন আমাদের জুলাই-জুন চক্র থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন? বাংলাদেশে অর্থবছরের শেষ ত্রৈমাসিক (এপ্রিল-জুন) হলো বর্ষার শুরু, এটা সবারই জানা যে বর্ষাকাল অবকাঠামো উন্নয়ন, নির্মাণকাজ, এমনকি গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে প্রতিকূল সময়। অথচ বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই সময়েই সর্বোচ্চ ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়। পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন পর্যালোচনা এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বারবার দেখিয়েছে বছরের প্রথমার্ধে প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীরগতি, আর শেষের দিকে হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ে। এর ফল কী? তড়িঘড়ি কাজ, মানের অবনতি, এবং অনেক ক্ষেত্রে অপচয়। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একাধিক মূল্যায়নে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরের শেষে এ রকম ব্যয়ের প্রবণতাকে একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে দেখা গেছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বড় অংশ শেষ দুই-তিন মাসে ব্যয় করা হয়। এর মানে দাঁড়ায় পুরো বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভার চাপানো হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন প্রকৃতি ও প্রশাসন দুটোই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়েও লক্ষ্যচ্যুতি ক্রমেই বাড়ছে, যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁককে আরও স্পষ্ট করে।
এখানেই প্রশ্ন আসে এটি কি কেবল অদক্ষতার সমস্যা, নাকি কাঠামোগত ত্রুটি? অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি ‘ইনসেনটিভ প্রবলেম’। এর মূল কথা হলো, যেনতেন ভাবে কাজ শেষ করার প্রবণতা তৈরির চাপ বা ব্যবস্থা। যখন একটি ব্যবস্থায় বছরের শেষে খরচ না করলে বরাদ্দ কমে যাওয়ার ভয় থাকে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই শেষ মুহূর্তে ব্যয় বাড়ানোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই প্রবণতাকেই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, দ্রুত টেন্ডার, কিংবা নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের কাজে লাগায় কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বেশিরভাগ বিশ্লেষণ ক্যালেন্ডার বছরের ভিত্তিতে করা হয়। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্য, যা জুলাই-জুনে বিভক্ত, সেটিকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মেলাতে অতিরিক্ত সমন্বয় করতে হয়। এটি শুধু গবেষকদের জন্য জটিলতা তৈরি করে না, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত একটি দেশের জন্য এটি কোনো ছোট বিষয় নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বেসরকারি খাত। বাংলাদেশে কার্যরত অনেক বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় প্রতিষ্ঠান, তাদের হিসাব ক্যালেন্ডার বছরের ভিত্তিতে করে। ফলে সরকারি করব্যবস্থা ও বেসরকারি হিসাবের মধ্যে একটি অমিল তৈরি হয় যা প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ায় এবং ব্যবসা পরিচালনাকে জটিল করে তোলে। ইতিবাচক ব্যবসায়িক সুযোগের সূচকে উন্নতি করতে চাইলে, কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দূর করা জরুরি। তাহলে বিকল্প কী? উত্তম বিকল্প হতে পারে, জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর। এর সুবিধা শুধু তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবভিত্তিক। প্রথমত, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি মৌসুমি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলবে, ফলে বিশ্লেষণ ও তুলনা সহজ হবে। তৃতীয়ত, বছরের শেষের অস্বাস্থ্যকর ব্যয়চাপ কমবে, যা সামগ্রিকভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াবে।
অবশ্যই, এই পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়। সময় লাগবে। এই ধরনের পরিবর্তন বিশ্বে নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন দেশ তাদের অর্থবছর পরিবর্তন করেছে সময়ের প্রয়োজনেই অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ানোর জন্য। বাংলাদেশ এখন একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই বাস্তবতায় একটি পুরনো অর্থবছর কাঠামো ধরে রাখা মানে কেবল একটি ক্যালেন্ডার না বদলানো নয় এটি উন্নয়নের গতিকে অযথা জটিল করে রাখা। সম্ভবত সময় এসেছে এই জটিলতার বিষয়টি স্বীকার করার। তাই সময় এসেছে, অর্থবছরে পরিবর্তন নিয়ে আসার । অর্থবছর কেবল একটি সময়সূচি নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক দর্শন। কিন্তু সেই দর্শন যদি বাস্তবতার সঙ্গে না মেলে, তবে সেটি পরিবর্তন করতেই হয়।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী প্রধান, সামাজিক উন্নয়ন বিভাগ আরডিআরএস বাংলাদেশ