নতুন সরকার যে গণমাধ্যমকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে, পুলিশ পদক স্থগিত করার বিষয়ে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট তার উদাহরণ। গত ৮ মে ‘তদবির সিন্ডিকেটে পুলিশ পদক’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে সংবাদ প্রকাশের পর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পদক স্থগিত করার নির্দেশ আসে। ফলে গতকাল পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পদক দেওয়া হয়নি। এর আগে দেশ রূপান্তরেই প্রকাশিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশকান্ডের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি বালিশ জাদুঘরে রাখার কথা বলেছেন। এ থেকে এটাই প্রমাণ হয়, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং নাগরিকদের ‘তৃতীয় নয়ন’ হিসেবে গণমাধ্যম কিছু ভূমিকা রাখছে। দুর্নীতির উদাহরণ হিসেবে রূপপুরের বালিশ জাদুঘরে যেতে পারে। তবে জাতি চায় দুর্নীতিই চিরদিনের জন্য জাদুঘরে যাক। এই প্রত্যাশা পূরণের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থার সব ক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। পদকের মাধ্যমে পুলিশের দক্ষ, সৎ ও করিৎকর্মা সদস্যদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি পুরো বাহিনীর জন্য গৌরবের বিষয় হওয়ার কথা। অথচ বাহিনীর ভেতরকার সিন্ডিকেট পদককেও ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়ে পরিণত করেছে। তদবির আর বিনিময়ের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ অনেক সদস্যও বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম) নিতে পেরেছে বহুবার, প্রায় প্রতি বছর।
২০২২ ও ২০২৩ সালে বিপিএম ও পিপিএম দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে ২৩০ ও ১১৭ জনকে। ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৪০০ জনকে বিপিএম ও পিপিএম পদক দেওয়া হয়। যাদের অনেকে কী করে পদক পেয়েছেন, সে বিষয়ে বাহিনীটির ভেতরেই নানামুখী প্রশ্ন আছে। গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের কাজকর্মে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সমাজে তখন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা তৎপর হলে আইনশৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করে। ২০২৫ সালে পুলিশ সপ্তাহ সাত দিনের পরিবর্তে তিন দিনে সীমিত আকারে আয়োজন করা হয়। কিন্তু থেমে যায়নি পদক জয়ের তদবির ও ঘুষ-বাণিজ্য। এ বছরও ১০৭ জনকে বিপিএম ও পিপিএম দেওয়ার জন্য তালিকা তৈরি হয়েছিল, তাতে রয়েছে অনেক অযোগ্য ও সুযোগসন্ধানী পুলিশ সদস্য। দুর্নীতিগ্রস্ত এই ব্যবস্থাটি বেশ পুরনো। এর মাধ্যমে যোগ্য ও দক্ষরা বাদ পড়লে গোটা বাহিনীতে খারাপ প্রতিক্রিয়া হয়। ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্বে মনোযোগ ও উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় অপরাধ দমনে ভূমিকা রাখা সদস্যরা যখন বাদ পড়েন, তখন স্বাভাবিকভাবেই হতাশা দেখা দেয় বিভিন্ন পর্যায়ে। আমরা মনে করি, যারা তদবির ও ঘুষের জোরে পদক তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যারা পদকের জন্য ব্যক্তি বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের সবার বিচার হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে যারা সত্যিকার অর্থেই যোগ্য, তাদের পুরস্কৃত করা জরুরি।
পুলিশের কাজ মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সমাজ থেকে দুর্বৃত্তদের শেকড় উৎপাটন এবং নাগরিকদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা। সততা ও দক্ষতা বজায় রেখে মানবিকতা ও নৈতিকতার উঁচু মান স্থাপনের মাধ্যমে যাতে তারা এ দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেজন্য তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবেই সবরকম সহায়তা দিতে হবে। পুলিশে ৮ ঘণ্টা ডিউটিকে ১২ ঘণ্টা করতে বাধ্য করে তাদের হীনবল করার সুযোগ নেই। এ কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ নিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি আমরা। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতার কোনো বিকল্প নেই। আমরা মনে করি, তাদের বেতনভাতাদি মানবিক স্তরে উন্নীত করা দরকার। সমাজে ন্যায় ও কল্যাণকর পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে, আইন প্রয়োগকারীদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাও জরুরি। এসব কারণে পুলিশ পদকেও স্বচ্ছতা ভীষণ দরকার।