দেশ বাঁচায় মেহনতিরা, দেশটা তাদের

দেশের চলমান সংকটের সমাধান লুকিয়ে আছে একটি সরল অঙ্কের মধ্যে। প্রায়শই নানা সংকটে এই অঙ্কটি সামনে চলে আসে। খবরটি হলো দেশ চালের সংকট পড়ল। টাকার থলি নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়ালাম। চাল পাওয়া যাচ্ছিল না। আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশে চাল থাকলেও তারা বিক্রি করতে রাজি হচ্ছিল না। কারণ বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে নিজস্ব মজুদ জরুরি। একটু মনে করলেই আমরা বুঝতে পারব অনেক সময় অনেক দেশ তাদের নিজস্ব সম্পদ মজুদ রাখার জন্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। তাহলে দাঁড়াল কী? একটি দেশ এবং দেশের মানুষকে স্বনির্ভরতায় এগিয়ে যাওয়ার কাজটি করতে হবে। বিশ্ব পরিস্থিতি, বাস্তবতা সব বিবেচনায় নিয়েও দেশের মানুষের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণে আমাদের স্বনির্ভর হতে হবে। তাহলে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পথ পাব আমরা। নানা সংকটে আমাদের দেশকে যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল রেখে বাঁচানোর কাজটি করে চলেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো আমাদের দেশের কৃষক, গার্মেন্টস শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী, দেশের ক্ষুদ্র উৎপাদক আর বিদেশে অবস্থানরত শ্রমজীবী মানুষ।

দেশ নানা ধরনের সংকটে পড়লেও এমনকি কৃষক ক্ষেতমজুর ফসলের লাভজনক দাম ও পর্যাপ্ত মজুরি না পেলেও কৃষক উৎপাদন বন্ধ রাখেন না। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষিত হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী বেতন না পাওয়া, অনেক কারখানায় কর্মের পরিবেশ না থাকলেও তারা কাজ অব্যাহত রেখেছেন। ক্ষুদ্রশিল্পের উদ্যোক্তাদের অনেকেই পথে বসে গেলেও, সে সম্ভাবনা থাকলেও প্রধানত স্বউদ্যোগে এরা এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রবাসী শ্রমিকদের প্রবাসে মানবেতর জীবনযাপন আর দেশে এসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনা থাকলেও তারা তাদের আয়ের সিংহভাগ দেশে পাঠিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে সচল রাখার কাজ করে চলেছেন।

একটু পেছন ফিরে তাকালেই দেখব, দেশের নানা সংকট থাকলেও উল্লিখিত শ্রমজীবী মানুষেরা নিজেদের কাজ থেকে পেছনে ফেরেননি। নারী-পুরুষ মিলে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার কাজ করে চলেছেন। বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় দেখা গেছে, এসব তথ্য-উপাত্ত দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এবং অধিকাংশ বিশিষ্টজন অস্বীকার করছেন না।

তবে এসব শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জীবন চলার ও ভবিষ্যতের কথা কি আমরা ভেবে অগ্রসর হচ্ছি? এই শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের অনেকেই সকালে না খেয়ে পথে বেরোলে, পেটে ক্ষুধা আর জীবনের অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলেও, কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে একগাল হেসে উত্তর দেবেন, আল্লায় ভালো রাখছে। ভগবান ভালো রাখছে। ভালো রাখছে বলার মধ্যে তার যে অনিশ্চিত জীবন, তা-কি আমরা বুঝতে পারি? এটা বুঝে তাদের স্বার্থে ভূমিকা রাখতে পারলেই দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরও অগ্রসর করার কাজটি আমরা করতে পারতাম। এ ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ  কাজটি হলো এই শ্রমজীবী মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া, তারাই দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। অথচ তারাই বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের হিস্যা আদায় করে নিতে হবে।

এই কাজের কি বিকল্প আছে? হ্যাঁ, এটা নিয়ে নানা কথা বলতে পারেন। কিন্তু হিসাব মিলিয়ে দেখুন, উল্লিখিত অঙ্গনে ধস নামলে আমরা কীভাবে অগ্রগতির কথা ভাবব।

বিশ্বপরিস্থিতির দিকে তাকালে দিন যত যাচ্ছে, এটি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে স্ব স্ব দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে আমাদের আত্মনির্ভরশীলতার পথে এগিয়ে যেতে হবে। নিজস্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বৈষম্যের অবসান, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করে প্রতিটি মানুষের সাংস্কৃতির মান উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। ব্যক্তি-গোষ্ঠীর স্বার্থের বিপরীতে সবার স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এগোতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা যদি আমদানির ওপর নির্ভর করে এগোতে চাই তাহলে এটা যে অনিবার্য নতুন নতুন সংকট নিয়ে আসবে, চলতি সময়ের ঘটনাবলি তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রেও বিকল্প পথ আছে। সেই পথের কথা অনেকদিন ধরে আলোচনা করলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রসঙ্গক্রমে শুধু বলে রাখি, দেশের গ্যাস খাতকে আরও সক্রিয় করা, সৌর-সহ নবায়নযোগ্য জ¦ালানির কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েই দেশের জ¦ালানি নিরাপত্তা ভাবতে হবে। এর বিকল্প নেই। অন্য বিকল্প ভাবলে তা হবে প্রধানত আমদানি নির্ভরতা, যা আমাদের যেকোনো সময় বড় ধরনের সংকটে ফেলতে পারে।

আবার প্রশ্ন আসে, তাহলে হচ্ছে না কেন? সরল অঙ্কের হিসাব মিলিয়ে দেখুন, যারা বিগত দিনে এসব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কি স্বনির্ভরতার দিককে প্রধান করার  দিকে মনোযোগ দিয়েছেন? নাকি বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমদানির নির্ভরতাকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়েছেন? যার সঙ্গে ব্যক্তি, গোষ্ঠী আর মুনাফালোভী সিন্ডিকেটের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ছাড়া আমরা এগোতে পারব না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচারের কথা বলা হয়েছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের সেই আকাক্সক্ষা এখনো পূরণ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের আগের নানা পর্বে, ১৯৯০ ও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে এবং বিভিন্ন সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সাধারণ মানুষের মধ্যে ওই আকাক্সক্ষারই পুনর্জাগরণ ঘটেছে। মানুষ এক্ষেত্রে বারবার আশাহত হয়েছে। এবারও আশাহত হয়েছে মানুষ। গণতন্ত্র ও বৈষম্যবিরোধী কথা সামনে এলেও এগুলোর দেখা মিলছে না। কিন্তু মানুষের আকাক্সক্ষা তো থেকে যাচ্ছে। আমরা বলে এসেছি এই আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য চলতি ব্যবস্থার পরিবর্তন করাই জরুরি কর্তব্য। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম বিষয় হলো চলতি ধারার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন। এছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিক সংক্রান্ত পরিবর্তন তো রয়েছে। অন্য অনেক বিষয়ে আলোচনা সামনে এলেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প ভাবনা খুব একটা সামনে আসে না। এই আলোচনাটি সামনে আনতে হবে। আলোচনায় প্রাধান্য দিতে হবে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের স্বার্থকে। আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে সময়োপযোগী ভাবনায়। একই সঙ্গে স্বনির্ভরতায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রামেও তাদের উদ্দীপ্ত করতে হবে।

আমাদের দেশের মাটি, পানি, বায়ু, সৌর আর মাটির নিচে ও সমুদ্রতলে, বালুকণায় অসংখ্য সম্পদ রয়েছে। এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার কাজটিও আমাদের করতে হবে। দেশের সব মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করে তাদের আশাবাদী করে তুলতে হবে আগামী ভবিষ্যতের জন্য। যা তার কাছে স্বচ্ছ হয়ে উঠবে, নিজের পরিবারের আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার মর্যাদার পূর্ণ চিত্র। বর্তমান প্রজন্ম নিয়ে অনেক হতাশার চিহ্ন দেখা যায়। কিন্তু এর মধ্যেও ইতিবাচক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এগোতে হবে। এই প্রজন্ম যেন বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ না হয়। দেশের প্রকৃত ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য যেন তাদের সামনে দলনিরপেক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় সেই কাজটিও গুরুত্বের সঙ্গে করতে হবে।

একই সঙ্গে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের শ্রমে সৃষ্ট অর্থনীতি নানাভাবে যে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি, অর্থনীতির ফাঁদে পড়ে অন্যের পকেটে চলে যায় সেই অবস্থার অবসান ঘটাতে তরুণ প্রজন্মসহ সব মহলকে এগিয়ে আসতে উদ্দীপ্ত করতে হবে।

এসব কাজের কথা হয়তো বলা সহজ কিন্তু করাটা অনেক কঠিন। এই কঠিনকে জয় করা ছাড়া আমাদের দেশকে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের দেশে পরিণত করা যাবে না।

এই কঠিন সংগ্রামে আমরা যার যার অবস্থানে থেকে আমাদের দায়িত্ব পালন করব, এই অঙ্গীকারটুকু যদি করা যায় সেটুকু বা কম কী?

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি