আমাদের দেশে ফ্যাশনের ইন্ডাস্ট্রির জাগরণ শুরু হয়েছে মূলত ৭০-এর দশকে। অতীত থেকেই আমাদের তাঁত ও তাঁতিদের দক্ষতা দুটোই জগদ্বিখ্যাত ছিল। ১৯৭৩ সালে দেশে নিপুণ ফ্যাশন হাউজ-এর যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই আশরাফুর রহমান ফারুক মালিবাগে ছোট একটি আউটলেট দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। পরে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যাশন ও হস্তশিল্পভিত্তিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। নিপুণ শুরু থেকে ক্রাফট ভিত্তিক ছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতের পোশাক বিক্রি করত। ওই সময়টাতে ওজি নামে একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড ছিল। জয়া নামে আর একটি হ্যান্ডিক্রাফটের দোকানের শুরু একই সময়ে। যার প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শিলু আবেদ এবং মালেকা খান। পরবর্তী সময়ে জয়া থেকে বেরিয়ে আড়ং শুরু করেন শিলু আবেদ। আড়ং-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। গ্রামীণ কারুশিল্পীদের তৈরি পণ্য বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রয়াত শিলু আবেদ। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় আছে ব্র্যাক। এখন আড়ং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত। শুরুটা হয়েছিল সোবাহানবাগে ছোট একটা আউটলেট দিয়ে। পাশেই এদের অফিস ছিল। কুমুদিনী ক্রাফটের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। এই প্রতিষ্ঠানটিও দেশের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প সংরক্ষণ ও গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
৮০ দশকের শুরুতেই বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির পরিধি বাড়তে থাকে। এর পেছনে মিডিয়ার ভূমিকা কিন্তু কম নয়। বিশেষ করে অ্যাড এজেন্সি মাত্রার আফজাল হোসেনের অনেক ভূমিকা আছে। তিনি বিজ্ঞাপন তৈরি করে ফ্যাশনের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন বলা যায়। তিনি সে সময় পিয়ারসন্স-এর বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিলেন। সেই বিজ্ঞাপনে মডেলের পোশাক সে সময় খুব সাড়া ফেলে।
অফিশিয়ালি যদি বলা হয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির বাঁকবদলে ক্যাটস আই-এর ভূমিকা বেশ বড়। ছেলেদের পোশাকে তারা বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। ক্যাটস আই যাত্রা শুরু করে ১৯৮০ সালে। প্রথমে ঢাকার গ্রিন সুপার মার্কেটে ছোট একটি দোকান হিসেবে শুরু হলেও ১৯৮৩ সালে এলিফ্যান্ট রোডে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাটস আই ব্র্যান্ডের যাত্রা শুরু হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন সৈয়দ সিদ্দিকী রুমি এবং আশরাফুন সিদ্দিকী ডোরা। চাহিদার প্রেক্ষিতে সে সময় ক্যাটস আই-এর কোব্যান্ড মুনসুন রেইনও তৈরি হয়ে ছিল। ১৯৮০ সালে কুমুদিনী, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের যাত্রা হয়। নাটকপাড়া বেইলি রোডে নতুন পরিচিতি নিয়ে আসে টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির। এই শাড়ি দোকানের দেখাদেখি সে সময় অনেকগুলো দেশীয় শাড়ির দোকান গড়ে উঠেছিল বেইলি রোডে।
দেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির বিস্তৃতির পেছনে আরও একজন খুব বলিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি হলেন প্রয়াত বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী। আশির দশকে বিচিত্রার ঈদ সংখ্যা ও ঈদ ফ্যাশন ক্যাটালগ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তখনকার সময়ের মডেলিং, দেশীয় ফ্যাশন, শাড়ি-পাঞ্জাবির নতুন ধারা এবং তারকাদের ফটোফিচার এই ক্যাটালগে প্রকাশ হতো। বাংলাদেশের আধুনিক ফ্যাশন ফটোগ্রাফি ও ঈদ ফ্যাশন ট্রেন্ড জনপ্রিয় করতে বিচিত্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগীকে ঘিরে অনেক ফ্যাশন ব্র্যান্ড গড়ে উঠেছিল। সময়ের সাথে সাথে আড়ং-এর বিস্তৃতি বেড়েছে। একের পর এক আউটলেট তৈরি হয়। একটা সময় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও আড়ং-এর আউটলেটের যাত্রা শুরু হয়।
একই সময়ে গ্রামীণ উদ্যোগ চেক নিয়ে যাত্রা করে। যদিও চেক কাপড়ের ইতিহাস অনেক পুরনো। তবে এটি আধুনিক ফ্যাশনে নতুনভাবে পরিচিতি পেতে শুরু করে মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে। দেশের তাঁতশিল্প, বিশেষ করে পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের তাঁতিরা এই চেক কাপড় তৈরি করতেন। পরে এটি দেশীয় ফ্যাশনের অন্যতম পরিচিত মোটিফ হয়ে ওঠে।
খ্যাতনামা ডিজাইনার বিবি রাসেল চেক-এর সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তাঁত ও তাঁতের কাপড়কে তুলে ধরেন। প্যারিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোতে বাংলার চেক কাপড়, গামছা ও হাতের তাঁতের পোশাক ব্যবহার করে তিনি তাঁতশিল্পকে নতুন মর্যাদায় নিয়ে আসেন। দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোও গ্রামীণ চেককে আধুনিক পোশাকে ব্যবহার শুরু করে এবং মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। এমনকি বিবি রাসেলের উদ্যোগেই আধুনিক জীবনে গামছার পুনর্জাগরণ ঘটে একরকম।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলার মেলা। আরও বেশ কিছু ফ্যাশন হাউজ এই সময়ে তৈরি হয়। দেশী দশ-এর যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে। বাংলাদেশের দেশীয় ফ্যাশন ও হস্তশিল্পকে একসঙ্গে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে ১০টি শীর্ষ ফ্যাশন হাউজ মিলে এই জোট গঠন করে দেশী দশ প্রতিষ্ঠিত করেন। শুরুতে যে ফ্যাশন হাউজগুলো যুক্ত ছিল তারা হলো—অঞ্জনস, কে-ক্র্যাফট, বিবিয়ানা, নিপুণ, দেশাল, প্রবর্তনা, সাদাকালো, রঙ, নগরদোলা, বাংলারমেলা। পরবর্তী সময়ে দেশী দশের আরও দুটি আউটলেট হয়। এসব ফ্যাশন হাউজগুলোর হাত ধরে দেশের তাঁতি, তাঁতের কাপড়ের ব্যাপক প্রসার লাভ করে। মানুষের মধ্যেও এক ধরনের জাগরণ তৈরি হয় দেশি কাপড় পরার প্রতি। কাঁথাস্টিচ, হ্যান্ড এম্ব্রয়ডারি, ব্লক ও স্ক্রিন প্রিন্টের চাহিদা বাড়তে থাকে।
প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের হাত ধরে ফ্যাশন স্কুল বিজিএমইএ-এর যাত্রা শুরু হয়। এখান থেকে অনেক ছেলেমেয়ে পড়াশোনা শিখে বের হয়। যদিও গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য এরা বেশি তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাশন ডিজাইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু হয়। দুঃখের বিষয় সরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত আমার জানামতে এই বিষয়ে পড়াশোনা নেই। যা আছে তা বেসরকারি উদ্যোগে। যদিও আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে আড়ং তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সে অর্থে ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরি করতে পারেনি। আসলে ট্রেন্ড তখনই তৈরি হয় যখন আপামর মানুষ এটাকে গ্রহণ করে।
একটা সময় বাটেক্স অনেক ভালো ভালো ফ্যাশন শো করত। আড়ং ফ্যাশন শো হতো। কিন্তু এখন যেন এসব থমকে গেছে। আমার প্রায়শই মনে হয় আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ভারত পাকিস্তান ট্রেন্ড তৈরি করে দিচ্ছে। ইন্টারনেট ফ্যাশন ধারা তৈরি করছে। ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে আমাদের পোশাক, ফ্যাশন যেন পিছিয়ে যাচ্ছে। আগে গাউছিয়া ও চাদনী চক মার্কেটে গিয়ে আমরা দেখতাম ভারতে যে কাপড় ও রঙগুলো চলছে সেগুলোই এখানে অরিজিনাল কিংবা রেপ্লিকা হয়ে মার্কেট সয়লাব হয়ে গেছে। একমাত্র পহেলা বৈশাখে সাদা ও লাল রঙ দেখা যেত। পহেলা বৈশাখের সময় দেশীয় কাপড় পরা ও কেনার একটা চাহিদা তৈরি হয়।
ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এত বছর যুক্ত থাকার পরও মনে হয় আমাদের সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও গবেষণা গড়ে ওঠেনি। আড়ং একটা সময় পর্যন্ত বাজার থেকে কিনত না। তাঁতিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করত। একটা সময় এসে সে জায়গা থেকে তাদের সরে আসতে হয়েছে। তাঁতের কাপড়ের দীর্ঘস্থায়িত্ব কম, উজ্জ্বলতা বেশিদিন থাকে না। সুতার দাম, তাঁতিদের মজুরি এসব কিছুর কারণে পিছিয়ে আসতে হয়েছে। বৈশাখ, ঈদ, একুশে ফেব্রুয়ারির সময়ে কাপড় কেনার ট্রেন্ড দেখা যেত। ১৯৯৮ সালে টাইটানিক সিনেমার প্রভাব পড়ে আমাদের ফ্যাশনে। ভ্যালেন্টাইন ডে পালন যুক্ত হয় আমাদের জীবনে। আর্চিস গ্যালারি থেকে কার্ড, গিফট কেনার পাশাপাশি লাল রঙের পোশাক পরার ট্রেন্ড দেখা যায়। ডিজাইনারাও লাল রঙের পোশাক তৈরি করতে শুরু করেন।
আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এখন অনেক কিছু হচ্ছে। ১৫ বছর আগে আমরা ২০১১/১২ সালে খাদি ফ্যাশন উইক করেছিলাম। আগে খাদি কাপড়ের ব্যবহার বলতে পাঞ্জাবি, চাদর ও ঝোলা ব্যাগ দেখা যেত। সেই খাদি কাপড় দিয়ে আমরা ডিজাইনাররা নানা কিছু তৈরি করে মানুষের সামনে নিয়ে এসেছি।
আমাদের আছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্ক। যা দিয়ে অনেক কিছু তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু এই বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই। কিছু পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছি। যেটাকে মসলিন বলে বলে আমরা গলা ফাটাচ্ছি আসলে সেটা অরগাঞ্জা। এই সত্যটা কজন ডিজাইনার কিংবা মানুষ জানে। অসংখ্য জামদানি মোটিফ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। সরকারিভাবে আমাদের ক্রাফট সংগ্রহ নেই।
জুট ইন্ডাস্ট্রি সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। ছোট ছোট অসংখ্য উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে কিন্তু মানসম্পন্ন পণ্যের দেখা নেই। জুটের ব্যবহার লাঞ্চ ব্যাগের মধ্যেই থাকছে। অন্যদিকে একদল শিক্ষিত শিল্পকারখানার মালিক যারা নিজেদের কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করে দেশের বাইরে পাঠাচ্ছেন। আসলে প্রোডাক্ট ডেভেলপ করার জন্য কোনো ধরনের উদ্যোগ বা প্রশিক্ষণ নেই। বিসিকও সেভাবে কাজে এলো না। কামরুল হাসান যে স্বপ্ন নিয়ে বিসিক প্রতিষ্ঠা করেছিল তা থেকে আমরা আজ অনেকটাই সরে এসেছি।
পৃথিবীজুড়ে ভেজিটেবল ডাইয়ের চাহিদা ও প্রসার বাড়ছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই মাধ্যমের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। প্রয়াত রুবি গজনবী আপা দেশে এই শিল্পের পথিকৃৎ। তিনি অনেক কাজ করেছেন। বিদেশ থেকে শিখে এসে অনেক মানুষকে প্রশিক্ষিত করেছেন। এখন অনেকে কেমিক্যাল রঙ ব্যবহার করে বলছে ভেজিটেবল ডাই, শিরুরি ডাই বলে শাড়ি, পোশাক তৈরি করছেন। আসলে না জানা মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। ফয়েল প্রিন্ট হচ্ছে, হরহামেশা ডিজাইন কপি হচ্ছে। ফিউশনের নামে অনেক কিছু হচ্ছে।
সোজা কথায় বলতে গেলে আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এখন আর তার লক্ষ্যে নেই। সরকারেরও কোনো মাথাব্যথা নেই। ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। ড্রাফটসম্যানের কোনো দরকার হয় না। এ-সংক্রান্ত কোনো লাইব্রেরি নেই। ডিজাইন কপি করছে আর এন্টারপ্রেনার অনুমোদন দিয়ে প্রোডাক্ট বানিয়ে নিচ্ছে। মনে রাখতে হবে আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির বিস্তৃতি ঘটেছে কিন্তু মান তৈরি হয়নি। অনেক সময় আমরা নষ্ট করেছি। আমাদের নিয়মনীতি তৈরি করতে হবে। এর জন্য সবার আগে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক : ফ্যাশন অ্যান্ড ক্র্যাফট কনসালটেন্ট