স্মৃতি, সংকট ও নির্মাণের গল্প

দৃশ্য-এক

ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। পূব আকাশে সূর্য উঁকি দিতেই দিগন্ত যেন সোনালি আভায় ভেসে ওঠে। দূর থেকে ভেসে আসে পাখির কলতান। বিশাল জলরাশি—খাল আর বিল মিলেমিশে একাকার—স্থির, অথচ স্পন্দিত এক দৃশ্য। সেই পানির ভেতর দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ় জেলে, খরা জাল টেনে তুলছেন ধীরে ধীরে। জালের খুঁটিতে ওঁৎ পেতে বসে আছে মাছরাঙা; কাছেই দু-একটা বক ভেসে বেড়ায়।

দৃশ্য-দুই

সকালের বৃষ্টিতে ধানক্ষেতে জমে আছে পানি। তার মাঝেই হঠাৎ উঠে আসা রোদ—চোখ ধাঁধানো, তবু মোলায়েম। মাঠে নেমেছেন এক কৃষক। দুই বলদের জোয়াল কাঁধে নিয়ে তিনি হাল ধরেছেন—মাটির গায়ে লাঙলের ফলায় দাগ কেটে যাচ্ছে। ভেজা মাটি নরম হয়ে খুলে যাচ্ছে স্তরে স্তরে। সেই মাটি থেকে উঠে আসা পোকামাকড় ধরতে ব্যস্ত শালিক, দোয়েল। কৃষকের শরীর বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে—মনে হয় যেন এসএম সুলতানের ক্যানভাস থেকে উঠে এসে তিনি সোনালি ফসলের স্বপ্ন বুনছেন।

দৃশ্য-তিন

কেউ বলে দেড়শ বছর, কেউ বলে আরও বেশি। বিশাল এক বটগাছ, শিকড়ে-শিকড়ে ছড়িয়ে পড়া, যেন পুরো জনপদটাকেই আপন করে রেখেছে। ঘন সবুজ পাতার আড়ালে আলো-ছায়ার খেলা। নেমে আসা ঠেসমূল জায়গাটাকে করে তুলেছে এক ধরনের নীরব, মায়াবী আশ্রয়। সেই ছায়ায় বসে এক গৃহবধূ নকশিকাঁথায় সুই-সুতার কাজ করছেন। সবুজ কাপড়ে লাল সুতোয় ফুটে উঠছে নকশা-ধীর, যত্নশীল, প্রায় ধ্যানমগ্ন এক সৃষ্টির ভেতর তিনি ডুবে আছেন।

দেয়ালের শোভা বনাম বাস্তবতা

ওপরে বর্ণনা করা তিনটি দৃশ্য আমাদের চিরপরিচিত। এসব দেখেই আমাদের বেড়ে ওঠা। নিজেরাও শখ করে হাতে লাঙল নিয়েছি, জাল ফেলেছি পানিতে। আমাদের ঘরের নারীরা নকশিকাঁথায় সুই এফোঁড়-ওফোঁড় করেছেন—কখনো আহ্লাদে, কখনো ছবি তোলার ছুতোয়।

তারপরই একটি প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে—এই ছবির বাংলাদেশ কি এখনো বাস্তব? যা অবশিষ্ট আছে, সেটিই কি আমাদের কাম্য বাস্তবতা? যারা এখনো এমন জীবনে আটকে আছেন, তারা কি সত্যিই এই জীবন বেছে নিয়েছেন? নাকি তারা কেবল পিছিয়ে পড়ার ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছেন—এক অনিচ্ছাকৃত বাস্তবতায় নিজেদের মানিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন?

আমরা অতীতকে ভালোবাসি—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভালোবাসা অনেক সময় আমাদের অন্ধ করে রাখে। কষ্টকে আমরা সৌন্দর্য বানিয়ে ফেলি, দারিদ্র্যকে ‘সরল জীবন’ বলে সাজিয়ে তুলি। অথচ এই সরলতার আড়ালে থাকে বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা, আর সীমিত সম্ভাবনা।

আমরা যে ছবিতে মুগ্ধ হই, সেই ছবির মানুষটি হয়তো সেই জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। হয়তো সে আর এই ‘ছবির মতো সুন্দর’ বাস্তবতার ভার বইতে চায় না। বাস্তবতা হলো—সেই চেনা বাংলাদেশ আমাদের চোখের সামনে থেকেই সরে যাচ্ছে। জেলে, কৃষক, বটতলার নারী—তারা কেউই আর সেই পুরনো জীবনে আটকে থাকতে চায় না। আমরাও কি সেই চক্রের পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই?

এখানেই সমস্যার শুরু। যে জায়গাটা বদলে যাচ্ছে, সেটি সবসময় উন্নত কোনো বাস্তবতা দিয়ে পূরণ হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেখানে জায়গা নিচ্ছে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক—এমনকি রাজনৈতিক বাস্তবতাও যেন সেই অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। খেলাধুলার মাঠ কমে গেছে, পড়াশোনার পরিসর সংকুচিত, উৎসব-আনন্দের জায়গাগুলোও অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পেশার পরিবর্তনও তৈরি করছে নতুন বাস্তবতা। এই পরিবর্তন এক ধরনের নীরব যুদ্ধ—যেখানে প্রতিদিন টিকে থাকাই লড়াই, আর সেই লড়াইয়ের ময়দান অনেক ক্ষেত্রেই আর ‘ছবির মতো’ থাকে না।

এই যে বাস্তবতা বদলাচ্ছে—সেই বদলের ভেতরে আমাদের চেহারাটাও কি স্পষ্ট হচ্ছে? নাকি আমরা এক অনির্ধারিত রূপান্তরের মধ্যে আটকে আছি—যেখানে পুরনো ছবিও নেই, নতুন পরিচয়ও গড়ে ওঠেনি?

বিশ্বায়নের যুগে নিজের মুখ

বাংলাদেশ বদলাচ্ছে—এটা অনস্বীকার্য। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, শিল্পায়ন ধীরগতিতে হলেও এগোচ্ছে। নানা পেশায় নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান, নতুন প্রজন্ম বিশে^র সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে। প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতিকে শক্তি জোগাচ্ছে, ছোট ছোট উদ্যোগ তৈরি করছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

তবু এই পরিবর্তন সমানভাবে ঘটছে না। শিক্ষার সঙ্গে পেশার ফারাক বাড়ছে, দক্ষতার ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত গতি পাচ্ছে না। একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে দিকহীনতা—এই দুইয়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশ। ফলে হৃদয়ে বাংলার যে স্থিরচিত্র আমরা আঁকি—সেটিও আর স্থির থাকছে না।

বিশ্ব আমাদের কীভাবে দেখে?

অনেকের চোখে বাংলাদেশ এখনো একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ—ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলবায়ু ঝুঁকি। এর সঙ্গে জুড়ে থাকে নিম্নআয়ের তকমা, রাজনৈতিক অস্থিরতার খবর। আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের উপস্থিতি প্রায়ই সংকটের মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হয়। কিন্তু একটি দেশ কি কেবল তার সংকট দিয়েই পরিচিত হবে? নাকি তার সম্ভাবনা, সৃজনশীলতা এবং মানুষের অর্জন দিয়েও? আমরা যদি নিজেরাই নিজেদের একটি আত্মবিশ্বাসী, উন্নত পরিচয় গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে বিশ্বও আমাদের সেই চোখেই দেখবে, যেভাবে আমরা নিজেদের তুলে ধরি।

দেশপ্রেম তখনই প্রকৃত অর্থে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং দেশের একটি মর্যাদাপূর্ণ, সম্ভাবনাময় চিত্রকে ধারণ করার আকাক্সক্ষায় রূপ নেয়। এই আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি কেবল রাষ্ট্র বা নীতিনির্ধারকদের নয়, এ আমাদেরই প্রতিদিনের জীবন, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শহর ও জনপদের ভেতরেও প্রতিফলিত হয়। আমরা কি জানি, এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা কীভাবে আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে? সেই অংশগ্রহণকে আরও কার্যকর করার রূপরেখা বা কী?

এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর এখনো আমাদের হাতে নেই। ফলে আত্মপরিচয় গড়ে তোলার যে শক্তি আমাদের ভেতরে আছে, তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এই প্রসঙ্গেই ফিরে দেখা যাক আমাদের নিজেদের ভেতরের চিত্রটিকে—আমাদের আইডল কারা? কাদের অনুসরণে আমরা এগোতে চাই? নিজেদের গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশকে গড়ে তোলার ভাবনাটা কোথায় দাঁড়িয়ে? ধরা যাক, কেউ কুমিল্লা, দিনাজপুর, খুলনা বা হবিগঞ্জে গেল—কীভাবে বোঝা যাবে, সে কোথায় আছে? কোথায় সেই স্বাতন্ত্র্য, সেই দৃশ্যমান পরিচয়, যা একটি জায়গাকে আলাদা করে চেনায়?

অনেক কিছুই যেন মুছে যাচ্ছে, অথবা আড়ালে চলে যাচ্ছে—কখনো অযথা সংকোচে, কখনো ভুল ব্যাখ্যার ভয়ে। একটি দেশের পরিচয় শুধু জাতীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠে না; তা তৈরি হয় তার প্রতিটি শহর, প্রতিটি অঞ্চলের স্বতন্ত্রতায়। সেই স্বাতন্ত্র্য যদি হারিয়ে যায়, তাহলে জাতীয় পরিচয়ও ক্রমে ফিকে হয়ে পড়ে। এই জায়গাতেই দায়িত্ব এসে পড়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর।

আমাদের কাজ কি শুধু নস্টালজিক ছবিগুলো তুলে—যেগুলো দেখে আমরা আবেগপ্রবণ হই? নাকি সেই বাস্তবতার জটিলতাও সামনে আনা, যা কখনো অস্বস্তিকর, কিন্তু সত্য? একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্র কেবল অতীতের সৌন্দর্য নয়, বর্তমানের সংকট এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও তুলে ধরে। কারণ হৃদয়ে বাংলাদেশ কোনো স্থির ছবি নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

তাহলে বাংলাদেশ চলছে কীভাবে?

বাংলাদেশ পথ হারায়নি। এই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে—নীরবে, অদৃশ্য এক শক্তিতে। কারখানার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী শ্রমিক, দূর দেশের মাটিতে ঘাম ঝরানো এক প্রবাসী, রাত জেগে কাজ করা এক তরুণ—তাদের প্রতিদিনের শ্রমেই গড়ে উঠছে এই দেশের নতুন মুখ। বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন আর প্রান্তিক কোনো নাম নয়। সেবা খাত, কৃষি, শিল্প—সবখানেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে সক্ষমতার ভিত। এই অগ্রযাত্রা নিখুঁত নয়, অসম্পূর্ণ—তবু বাস্তব। উন্নয়ন কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, মানুষের সম্ভাবনা প্রসারের গল্প—যেখানে একজন মানুষ তার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

এই নতুন বাংলাদেশ হাজারো সাফল্যের গল্পে নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে নির্মাণ করছে। তাহলে হৃদয়ে বাংলার মুখের আদল কেমন হবে? শুধু স্মৃতির স্থির ছবিতে আটকে থাকা, নাকি এই চলমান সংগ্রাম, শ্রম আর সম্ভাবনার ভেতর গড়ে ওঠা? হয়তো সময় এসেছে—আমাদের হৃদয়ে সেই বাংলাদেশকেই স্থান দেওয়ার, যে বাংলাদেশ থেমে থাকে না, যে বাংলাদেশ লড়াই করে, হোঁচট খায়, আবার উঠে দ—প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে নতুনভাবে গড়ে তোলে।

লেখক : সংবাদকর্মী ও প্রাবন্ধিক