বাংলা সাহিত্যে নারীর অবস্থান একটি লৈখিক বিবর্তনমাত্র নয়, এটি অবদমন থেকে আত্মপ্রকাশের এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। প্রচীনযুগের চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজকের উত্তর-আধুনিককাল পর্যন্ত নারীর কলম কখনো শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে, কখনো হৃদয়ের নিভৃত কোণের হাহাকারকে দিয়েছে শব্দরূপ। চর্যাপদের কয়েকজন পদকর্তার নারী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মধ্যযুগের ‘চন্দ্রাবতী’কে বলা হয় প্রথম সার্থক বাঙালি নারী কবি। দ্বিজবংশী দাসের কন্যা চন্দ্রাবতী রামায়ণের যে পাঠ রচনা করেছিলেন, সেখানে রামের বীরত্বের চেয়ে সীতার বেদনা ও সংগ্রাম প্রাধান্য পেয়েছিল। প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক বয়ানকে পাশ কাটিয়ে নারীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে সাহিত্য রচনার প্রথম সার্থক প্রয়াস। তবে সে সময় নারীর লেখালেখি ছিল মূলত ধর্মীয় বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং সামাজিক স্বীকৃতির অভাব ছিল প্রকট। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন বাংলায় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ শুরু হয়, তখন নারীর অবরুদ্ধ জীবনের জানালাগুলো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করে।
রাজা রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের ফলে নারী শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হলেও লেখালেখির পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। এই সময়ে রাসসুন্দরী দাসীর আমার জীবন (১৮৭৬) ছিল এক অভাবনীয় বিপ্লব। কোনো প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই কেবল মনের জোরে রান্নাঘরে লুকিয়ে বর্ণ চিনে তিনি লিখেছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম আত্মজীবনী। এটা ছিল কয়েক শতাব্দীর অন্ধকূপ থেকে নারীর বেরিয়ে আসার প্রথম জোরালো পদক্ষেপ। ধীরে ধীরে কলম হয়ে উঠতে শুরু করে তলোয়ার। বিশ শতকের শুরুতে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাংলা সাহিত্যে নারীর অবস্থানকে আমূল বদলে দেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত স্বাধীনতা ছাড়া নারীর মুক্তি অসম্ভব। তার সুলতানার স্বপ্ন বা অবরোধবাসিনী গ্রন্থে তিনি ব্যঙ্গ ও যুক্তির মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অসারতা প্রমাণ করেন। রোকেয়া সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি নারী সমাজের জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তার লেখালেখি ছিল সরাসরি প্রতিবাদের ভাষা, যা তৎকালীন সমাজব্যবস্থার মূলে আঘাত করেছিল। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে স্বর্ণকুমারী দেবী, গিরিবালা দেবী এবং নিরুপমা দেবীদের হাত ধরে নারী সাহিত্যিকদের এক শক্তিশালী ধারা তৈরি হয়। তবে আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যে আশাপূর্ণা দেবীর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার ত্রয়ী উপন্যাস—প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা, বকুল কথা বাঙালির অন্দরমহলে নারীর যে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম, তার সামূহিক সত্য উন্মোচন করেছে। আশাপূর্ণা দেখিয়েছিলেন, কীভাবে ঘরোয়া পরিবেশে থেকেও একজন নারী তার স্বাধীন সত্তার জন্ম দিতে পারে। এ সময়ে নারী লেখকরা আর আবেগ বা ধর্মের গ-িতে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনের জটিল মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখতে শুরু করেন।
১৯৪৭-এর দেশভাগ পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গের লেখার যে ধারা তৈরি হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সে ধারাকে আরও পরিণত করে। নারী লেখকদের ভাবনার পরিধিতেও সেই পরিণত বোধ দৃশ্যমান হয়। ফলে নারী লেখকের লেখায়ও কেবল নারী প্রসঙ্গ ছাড়াও দেশকাল পরিপ্রেক্ষিতের সর্বাঙ্গীণ বিষয়াশয় ফুটে ওঠে অবলীলায়। সুফিয়া কামাল, সেলিনা হোসেন, রাবেয়া খাতুন, নীলিমা ইব্রাহিমের লেখায় পাওয়া যায় ভিটেমাটি হারানোর বেদনা এবং রাজনৈতিক চেতনার প্রতিফলন। সুফিয়া কামালের কবিতায় নারী কেবল কোমলমতী নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবেও মূর্ত হয়। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং বীরাঙ্গনাদের করুণ ইতিহাস নিয়ে তিনি আমি বীরাঙ্গনা বলছি গ্রন্থটি দিয়ে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ও সাহসী অধ্যায়ের সূচনা করেন। নারীর লেখালেখির পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব এবং পারিবারিক অসহযোগিতা। একসময় নারী শিক্ষার অর্থ মনে করা হতো অমঙ্গল। এমনকি বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও নারীর লেখা প্রকাশিত হওয়া ছিল সামাজিকভাবে নিন্দনীয়। ছদ্মনামের আড়ালে অনেক নারী তাদের প্রতিভা লুকিয়ে রাখতেন। ঘরের কাজ শেষে রাতে প্রদীপের অস্পষ্ট আলোয় চুরি করে লেখার যে সংগ্রাম, তা পুরুষ লেখকদের অভিজ্ঞতায় ছিল অনুপস্থিত। এই ঘরোয়া রাজনীতি ও সময়হীনতা ছিল সৃজনশীলতার পথে সবচেয়ে বড় দেয়াল। নারীর সাহিত্যকে দীর্ঘকাল ধরে ‘রান্নাঘরের সাহিত্য’ বা ‘ঘরোয়া সাহিত্য’ বলে অবজ্ঞা করা হয়েছে। সমালোচকদের বড় একটা অংশ মনে করতেন নারীর লেখায় বিশ্বজনীনতা বা গাম্ভীর্য কম। এই লিঙ্গভিত্তিক তকমা বা ‘জেন্ডার বায়াস’ নারী লেখকদের জন্য ছিল বড় এক মানসিক বাধা। পুরুষতান্ত্রিক সমালোচনার মানদ-ে নারীর অনুভূতিকে প্রায়ই ‘আতিশয্য’ বলে ছোট করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে এসে এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করলেও, আজও একজন নারীকে ‘লেখিকা’র চেয়ে ‘লেখক’ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি পেতে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়।
বর্তমান সময়ে তসলিমা নাসরিন, নাসরীন জাহান, শাহীন আখতার কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মহাশে^তা দেবী ও বাণী বসুর মতো লেখকরা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে নিয়ে গেছেন। মহাশে^তা দেবীর লেখায় প্রান্তিক মানুষের হাহাকার আর তসলিমা নাসরিনের লেখায় শরীর ও ধর্মের রাজনীতি এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমকালীন নারী লেখকরা এখন আর কেবল প্রেমের গল্প লেখেন না; তাদের লেখায় উঠে আসে সাইবার ক্রাইম, করপোরেট জটিলতা, পরিবেশবাদ এবং এলজিবিটিকিউ ইস্যু। নারীর কলম এখন অনেক বেশি সরাসরি, সাহসী এবং নিরীক্ষাধর্মী। একুশ শতকে ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের ফলে নারী লেখকদের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে গেছে। আগে যেখানে সম্পাদকের মর্জির ওপর লেখা প্রকাশ নির্ভর করত, এখন ব্লগে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীরা সরাসরি তাদের পাঠকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। মুদ্রণ মাধ্যমের প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় নতুন প্রজন্মের মেয়েরা আরও বেশি অকপট হতে পারছেন। নারীবাদী চিন্তাধারা এখন শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, তা একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকে সমৃদ্ধ করছে। ফলত বাংলা সাহিত্যে নারীর অবস্থান আজ কোনো দয়ার দান নয়, বরং তা হাজার বছরের অর্জিত অধিকারে রূপ নিয়েছে। অন্ধকার অন্দরমহল থেকে শুরু হওয়া এক যাত্রা আজ মহাকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। যদিও প্রতিবন্ধকতাগুলো এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি—গৃহস্থালির শ্রম বিভাজন এবং সামাজিক রক্ষণশীলতা আজও নারীর সৃজনশীল সময় কেড়ে নেয়—তবুও বাঙালি নারী তার মেধা ও মনন দিয়ে প্রমাণ করেছে, সাহিত্যের কোনো লিঙ্গ হয় না। আগামী দিনের বাংলা সাহিত্য হবে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে নারী-পুরুষের বিভেদরেখা মুছে গিয়ে কেবল সৃজনের উৎকর্ষই প্রাধান্য পাবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক