জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে শিরোনামটি খুবই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু কোনো ‘স্ন্যাপ শট’ থেকে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়, পুরো ‘মুভিটা’ দেখতে হবে। ১৮৬০ সালের পুলিশ রিফর্ম কমিশন রিপোর্টের সুপারিশের আলোকে পরের বছর অর্থাৎ, ১৮৬১ সালে যে পুলিশ বাহিনী গঠিত হয় তারই উত্তরাধিকার আমাদের বর্তমান পুলিশ বাহিনী। এর অন্তর্নিহিত চরিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে কমিশনের উদ্দেশ্য এবং দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে বোঝাটা জরুরি। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলক। যদিও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার জন্য বা উপনিবেশিক শাসনকার্যের স্বার্থে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাসহ প্রধান আইন সংস্কারের কাজটি আরও অনেক আগে থেকেই চলছিল, যা পরে লর্ড ম্যাকলের নেতৃত্বে ১৮৩৫ সালে গঠিত আইন কমিশনের হাতে পরিপক্বতা লাভ করে থাকে যাকে ব্রিটিশরা ‘স্টিল ফ্রেইম স্ট্রাকচার’ বলে আখ্যায়িত করে এখনো গর্ববোধ করে। আমরা এসবের প্রায় সবই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়ে এখনো টিকিয়ে রেখেছি।
১৮৬১ সালের পুলিশ আইন বলে গঠিত পুলিশ বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্য ছিল ‘মিলিটারি পুলিশ’কে প্রতিস্থাপন করে একটি ‘সিভিলিয়ান পুলিশ’ গঠন। কারণ উপনিবেশিক শাসকরা এই আশঙ্কা করেছিল যে, মিলিটারি পুলিশ দিয়ে দাঙ্গা দমনের মতো দায়িত্ব পালনে বড় ধরনের ভুল হতে পারে। অবশ্য এর নমুনা স্বরূপ পরবর্তী সময়ে কুখ্যাত জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যাকা-ে (১৯১৯) প্রকাশ পায়। কিন্তু তখন পর্যন্ত মিলিটারি পুলিশ যেসব দায়িত্ব পালন করছিল তা ছিল সরকারি গুদাম ঘর, গুরুত্বপূর্ণ ভবন, স্থাপনা এসব পাহারা দেওয়া এবং দাঙ্গা দমনমূলক তথা শান্তিশৃঙ্খলা বিঘœকারী বড় ধরনের ঘটনাবলিতে হস্তক্ষেপ করা। সিভিলিয়ান পুলিশকে দিয়ে এসব দায়িত্ব পালনে সক্ষমতার বিষয়ে উত্থাপিত সন্দেহের জবাবে কমিশন যুক্তি তুলে ধরে যে শারীরিক উপযুক্ততা অর্জন এবং অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মিলিটারি পুলিশের অনুরূপ সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। ফলে সংগত কারণেই মিলিটারি পুলিশের সমতুল্য শারীরিক উপযুক্ততা অর্জন এবং অস্ত্র প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এভাবে পুলিশের প্রশিক্ষণ ঐতিহাসিকভাবে সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণের দিকে হেলে পড়ে যা এখনো অব্যাহত আছে। সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ‘ট্রিগার হ্যাপিনেস’ বা ‘সামরিক বাহিনীর’ ব্যবহৃত ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের অস্ত্র যা ‘লিথাল’ বা মারণাস্ত্র ব্যবহারের প্রসঙ্গে জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনায় আসে। প্রকৃতপক্ষে বহু বছর আগে থেকেই পুলিশকে মারাত্মক মারণাস্ত্র দেওয়া হয়েছিল; তন্মধ্যে বহুল পরিচিত ‘থ্রি নট থ্রি’ রাইফেলও একটি মারণাস্ত্র যা পুলিশ ব্রিটিশ আমল থেকে বহন এবং ব্যবহার করে আসছে। এছাড়াও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে আরও অধিক ক্যালিবারের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র রয়েছে। অবশ্য এর যৌক্তিক কারণও আছে, যেমন সশস্ত্র ‘ইনসারজেন্সি’ বা সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা মোকাবিলা করা ইত্যাদি। এসব নিয়ে কখনোই তেমন কোনো আলোচনা হয়নি, কারণ পুলিশের হাতে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মতো এত বড় হত্যাকা- এর আগে কখনো ঘটেনি। উল্লেখ্য, সামরিক প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে শত্রু সৈন্য হত্যাসহ শত্রুপক্ষের সামর্থ্য ধ্বংস করা। কিন্তু পুলিশের বলপ্রয়োগের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে নিজের এবং অন্যের জানমালের নিরাপত্তামূলক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে আত্মরক্ষামূলক বলপ্রয়োগ করা এবং তা হতে হবে প্রতিরোধের আনুপাতিক। প্রতিরোধকারীর বলপ্রয়োগ থেমে গেলে আত্মরক্ষামূলক বল প্রয়োগও বন্ধ করতে হবে। অন্যের মৃত্যু ঘটানোর মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্ত, আইনে উল্লিখিত বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রধানত আত্মরক্ষামূলক এবং তা কর্তব্যরত পুলিশের জীবনের ওপর তাৎক্ষণিক ঝুঁকির উপস্থিতি সাপেক্ষ, যা যৌক্তিকতার মানদ-ে বিচার্য বিষয়। পুলিশের পেশাগত আদর্শে শত্রু, মিত্র বা প্রতিপক্ষের কোনো ধারণাগত অস্তিত্ব নেই। পুলিশের কাজের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা, এমনকি বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব জনগণের অধিকার এবং আত্মমর্যাদাবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। পুলিশ হেফাজতে বলপ্রয়োগ এবং তথাকথিত এনকাউন্টার বা ‘ক্রসফায়ার’ সম্পূর্ণরূপে বেআইনি।
তাহলে প্রশ্ন আসে, ৫ আগস্ট ২০২৪ পূর্ববর্তী প্রায় দেড় দশক সময়কালে পুলিশের এতটা ‘ট্রিগার হ্যাপিনেসে’র কী কারণ ছিল। বস্তুত, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পুলিশের নেতৃত্ব এবং উপনিবেশিক ‘কারিকুলামে’ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ এ ত্রয়ীর ‘কেমিস্ট্রি’ই এর জন্য প্রধানত দায়ী, যদিও ২০০৮-এর দিকে এএসপি এবং সাব-ইন্সপেক্টর পদের মৌলিক প্রশিক্ষণ কারিকুলামের ‘একাডেমিক’ অংশে কিছুটা পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, কিন্তু কনস্টেবল থেকে এএসআই, যারা প্রায় ২,০৮,০০০ সদস্যের বাহিনীর ৮২ শতাংশের অধিক, তাদের প্রশিক্ষণ কারিকুলামে কোনো ধর্তব্য সংস্কার করা হয়নি। ১৯৭৬ সালে গঠিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বা এবিপিএন-এর সম্পূর্ণ প্রশিক্ষণই সামরিক বাহিনী প্রদান করে। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে হয়তো যৌক্তিক কারণেই তা করা হয়েছিল। শুধু কারিকুলাম সংশোধনেই বিষয়টি সীমিত নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে প্রাপ্ত আমাদের পুলিশকে আদর্শগতভাবে ‘সিভিলিয়ান পুলিশ’ হিসেবে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আদর্শ, দর্শন, নীতি, কার্যপদ্ধতি, কৌশল ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষিত হওয়া বা দীক্ষা নেওয়া। এসব বিবেচনায় পুলিশের অন্তর্গত চরিত্র বদলের জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপযোগী পুলিশ আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন; যার মূলে থাকবে যথার্থ সিভিলিয়ান পুলিশের নীতি আদর্শ। এ লক্ষ্যে ১৮৬১ সালের আইনেরও সংস্কার প্রয়োজন, কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলের পূর্বশর্ত হচ্ছে এর নীতি, আদর্শ এবং দর্শন বদলানো। প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশিক কাঠামো এবং উদ্দেশ্যের বিপরীতে অধিকার সচেতন একটি স্বাধীন জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষার মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের বৈপরীত্ব তথা বিদ্যমান পুলিশি দৃষ্টিভঙ্গি এবং সিভিলিয়ান পুলিশের নীতি আদর্শের দূরত্বের মধ্যে খুঁজতে হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকার কারণ। সেই সঙ্গে এ উপলব্ধিটাও প্রাসঙ্গিক যে পুলিশের কাজ যতটা না শারীরিক তার চেয়ে বেশি মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক।
এ যাবৎ বিভিন্ন পুলিশ সংস্কার কমিশন, স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরে, পুলিশের উপরি কাঠামোর কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার সুপারিশ করেছে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বা কাঠামোগত দুর্বলতায় কখনো তেমন জোরালোভাবে হাত দেয়নি। অন্তর্নিহিত সমস্যাবলির অন্যতম হচ্ছে, স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও সব পদের সদস্যদের জন্য কোনো ক্যারিয়ার প্ল্যান না থাকা। যদিও প্রায় সব সরকারি সংস্থায়ই সমস্যাটি কমবেশি বিদ্যমান। উদাহরণ হিসেবে কনস্টেবল বা সাব-ইন্সপেক্টর/সার্জেন্ট পদে যারা যোগদান করেন তাদের পদোন্নতির ব্যাপারগুলো নিয়ে ‘সিরিয়াস’ ভাবনা না থাকার পরিণতি হচ্ছে অধিকাংশ সদস্য দশ-পনেরো বছরে একটিও পদোন্নতি পাননি বা ২০-২৫ বছরে একটি মাত্র পদোন্নতি পেয়েছেন। ফলে তাদের মনোবল বা প্রেষণা খুবই নিচু স্তরে অবস্থান করে এবং তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন। নতুন পদগুলো সাধারণত তৈরি করা হয় অদূরদর্শিতা, তাড়াহুড়া বা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করে যা সম্ভাব্য নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতি রাষ্ট্রের অবিবেচনাপ্রসূত, এমনটি অন্যায্য আচরণও বটে। এভাবে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণের জীবন অনেক কম প্রাপ্তির মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। পুলিশের সব স্তরের সদস্যদের জন্য যৌক্তিক এবং বিজ্ঞানসম্মত ‘ক্যারিয়ার প্ল্যান’ করা হলে তারা পদোন্নতির আকাক্সক্ষা থেকে একদিকে যেমন ‘ক্লিন’ থাকার চেষ্টা করবে এবং পেশাগত ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়াবেন, অপরদিকে এর ফলে সার্বিক কাজের পরিমাণ এবং গুণগত মান উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।
অপরাধপ্রবণতা ও দমনের প্রতি উদাসীন, পথভ্রষ্ট নগরায়ণ এবং দিশাহীন নগর পুলিশের ভূমিকার ওপর কিছুটা আলোকপাত করা যাক। সচেতন, সচ্ছল বা রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ অধিকাংশই কর্মসূত্রে, নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রয়োজনে নগরে বসবাস করেন। এ কারণে নগরে সম্পদ তথা অপরাধ সংঘটনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘টার্গেট বা লক্ষ্যবস্তু’ও সহজলভ্য।
সামাজিক কাঠামোগত কারণেই নগর পুলিশিং এবং গ্রাম পুলিশিং প্রকৃতিগতভাবেই ভিন্ন। নগরে শুধু অপরাধের লক্ষ্যবস্তুই নয় আত্মগোপন করার সুযোগও বেশি। ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এবং শ্রেণিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে অপরাধ প্রতিরোধ বা উদঘাটনে নগরবাসী স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা উদাসীন হয়ে থাকেন। এ ছাড়াও অপরিকল্পিত নগরায়ণ বা সরু রাস্তার দরুন পুলিশের দ্রুত গমনাগমনের ক্ষেত্রে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার কারণে দুর্গম এলাকাগুলো অপরাধীদের আখড়া বা অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে কাঠামোগতভাবে অপরাধ-বিমুখ ((Non-criminogenic) নগর গড়ার ক্ষেত্রে Crime Prevention Through Environmental Designing (CPTED) উন্নত সমাজে একটি জনপ্রিয় ধারণা। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোনো একটি এলাকায় ভালো মানুষের সংখ্যাধিক্য বা সংখ্যা বৃদ্ধি খারাপদের সে এলাকায় থাকতে নিরুৎসাহিত করে। একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি খোলাসা হবে। ঢাকার রমনা পার্কে ‘ভালো’ ব্যবহারকারীদের আধিক্যের কারণে ‘অপব্যবহারকারীরা’ এটি এড়িয়ে চলেন। পক্ষান্তরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘অপব্যবহারকারীদের’ আধিক্যের কারণে ‘ভালো ব্যবহারকারীরা’ সেখানে খুব একটা যেতে চান না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এ চিত্রায়ণের মধ্যেই এর সমাধান লুক্কায়িত আছে, তা হচ্ছে ‘ভালো’র সংখ্যা বাড়ানো। একইভাবে যেকোনো অপরাধপ্রবণ পাড়া বা মহল্লায় ‘ভালো’-র সংখ্যা বাড়িয়ে অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব বা সমাজের সর্বত্র ‘ভালো’-র সংখ্যা বাড়িয়ে ভালো সমাজ তথা দেশ বিনির্মাণ করা সম্ভ¢ব। হংকংসহ অনেক নগরে কোনো কোনো এলাকায় অপরাধ প্রতিরোধ দুরূহ বা অপরাধ-বান্ধব হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সেসব এলাকা ভেঙে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি নগর কাঠামোগতভাবে অপরাধ-বিমুখ হওয়াটা প্রত্যাশিত, তাতে নগরে বসবাসযোগ্যাতা বৃদ্ধি পায়। আশা করি নগর পরিকল্পনাবিদরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
একইভাবে গ্রামীণ পুলিশি ব্যবস্থাও গ্রামীণ জনপদের বিন্যাস, গ্রামীণ মানুষের প্রকৃতি, অর্থনীতি ইত্যাদি কারণে প্রাচীনকাল থেকেই ভিন্ন। এ বিষয়ে ১৮৬০ সালের পুলিশ কমিশন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘no police system can be really effective in India which is not closely connected with the village system’ এবং গ্রাম পুলিশকে ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুলিশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাখার সুপারিশ করে। সময়ের পরিক্রমায় এবং ‘অনর্থক’ সব কারণে গ্রাম পুলিশ ব্যবস্থাটি এখন নামসর্বস্ব হয়ে পড়েছে। যুগপৎভাবে গ্রামাঞ্চলে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দুর্নীতি তথা নীতিহীনতার কারণে সালিশ ব্যবস্থাটি দেশের অধিকাংশ গ্রামে ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে পশ্চাৎপদ পুলিশি ব্যবস্থা এবং জনপ্রশাসনের ব্যর্থতা সব ধরনের মামলার সংখ্যা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। এসবের ফল আদালতে বর্তমানে ৪০ লাখের অধিক বিচারাধীন মামলা। গ্রামের মানুষের জীবন এবং সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষাকল্পে গ্রাম পুলিশকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। উপনিবেশক শাসকরা গ্রাম পুলিশি ব্যবস্থাকে যতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখত তা এই সময়ে আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি।
নগরে অপরাধ দমন তথা পুলিশিংয়ের কথায় খানিকটা আবার আসা যাক। অপরাধ-বিমুখ, বা ভেতর থেকে অপরাধ প্রতিরোধী নগর গড়ার ক্ষেত্রে, জাপানের ‘কোবান’ ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। সিঙ্গাপুরও কোবান ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে। এ ব্যবস্থার মূলে রয়েছে প্রতিবেশীদের মধ্যে সুপ্রতিবেশিত্ব সম্পর্ক গড়ে তুলে পরস্পরের নিরাপত্তার প্রতি নজর রাখা, যা Neighbourhood Watch নামে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকা মহানগরীর কিছু এলাকায় ‘প্রতিবেশী নিরাপত্তা কমিটি’ নামে অনুরূপ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল, যদিও পরে তা সঠিক লক্ষ্যহীনতা, দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বেশি দূর এগোয়নি। এর আরেকটি শক্তিশালী দিক হচ্ছে প্রতিটি পাড়া-মহল্লার দায়িত্বে একটি পুলিশ বক্স বা পুলিশ বিট থাকে যেখানে দায়িত্বরতরা বাসিন্দাদের হালনাগাদ তথ্য রাখেন; ফলে তথ্যহীনতা দূরীভূত হয়, যা নিরাপত্তা ঝুঁকির অন্যতম উৎস। বাংলাদেশ পুলিশের অনেক কর্মকর্তা জাপান এবং সিঙ্গাপুরে কোবান ব্যবস্থার ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। একটি পাইলট প্রজেক্টের অধীনে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
অপরাধ প্রতিরোধে ‘ডেভেলপমেন্টাল এপ্রোচ’ বা শিশুদের ক্ষেত্রে গঠনমূলক বিকাশের ধারণা অপরাধ বিজ্ঞানে সুপরিচিত। এটি এমন একটি ধারণা যা সুনাগরিকত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে অপরাধ-বিমুখ জাতি গঠনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। মূলত উচ্চ মাত্রার ‘রেসিডিভিজম’ (Rescidivism) এ ধারণার বিকাশে রসদ জুগিয়েছে; এর অর্থ হচ্ছে একজন অপরাধী কর্তৃক জেলবাস শেষে মুক্তিলাভের পর পুনরায় অপরাধ কর্মে লিপ্ত হওয়া। বাংলাদেশে অপরাধ ভেদে এ হার ৭০-৮০ শতাংশ। অর্থাৎ জেলখানা বা সংশোধনাগার অপরাধ-বিমুখতা সৃষ্টিতে কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিটি শিশুর জন্য একটি স্ন্দুর শৈশব এবং কৈশোর নিশ্চিত করা গেলে ১৫-১৬ বছরের চেষ্টায় অপরাধ-বিমুখ তথা সুনাগরিকত্বের গুণাগুণ সম্পন্ন একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব যাদের প্রভাবে জ্যেষ্ঠরাও প্রভাবিত হবে।
চরম দারিদ্র্য, নৈতিকতার অধঃপতন এবং সেই সঙ্গে অপরাধের সুযোগ অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। নব্য উপনিবেশিক প্রভুদের সীমাহীন শোষণের কারণে ১১৭৬ বঙ্গাব্দে (১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ) ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে, যা ছিয়াত্তরের মন¦ন্তর নামে পরিচিত, বাংলা-বিহারে সত্তর লাখ থেকে এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়, যা ছিল জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। দুর্ভিক্ষে অভুক্ত মানুষের একাংশ চুরি-ডাকাতিতে ব্যাপকভাবে প্রবৃত্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক এ চরম বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দ্বিধাহীন ভাষায় বলা যায়, মানুয়ের আয় করার সামর্থ্য বৃদ্ধি করা গেলে এবং কঠোর হাতে আইন প্রয়োগ করা হলে অপরাধপ্রবণতায়ও ‘ধস’ নামানো সম্ভব। ব্রিটিশ শাসকদের ‘স্টিল ফ্রেম’ খ্যাত জনপ্রশাসন এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, বিচারব্যবস্থা—কোনো ক্ষেত্রেই ‘ম্যাজিক’ দেখাতে সক্ষম হয়নি। উপনিবেশিক শিক্ষা-দীক্ষার কারণে আমরা এমনকি সংস্কারেও বিমুখ। ১৯৪৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশ, একই আর্থ-সামাজিক স্তরে অবস্থান করছিল; বরং পূর্ব-পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় দশ ডলার বেশি ছিল, ৯০ মার্কিন ডলার, আর দক্ষিণ কোরিয়ার ৮০ মার্কিন ডলার। আর এখন আমাদের কমবেশি ২,৮০০ মার্কিন ডলার (২০২৫) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৭,০০০ মার্কিন ডলার।
পরিশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। দীর্ঘদিন থেকে পুলিশ বলে আসছে আমাদের সাক্ষ্য আইনের আসামির দোষ স্বীকারোক্তি সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহ সংস্কারের জন্য। বর্তমানে কোনো পুলিশ অফিসারের কাছে আসামির দোষ স্বীকারোক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে বস্তুগত আলামত উদ্ধারের জন্য পুলিশ আসামির ওপর বেআইনিভাবে বলপ্রয়োগ বা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে থাকে বলে বিস্তর অভিযোগ আছে, যা হয়তো অনেকাংশে সত্য। কোনো অপরাধী স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে না বা খুনের কাজে ব্যবহৃত অস্ত্রটি পুলিশের হাতে তুলে দেয় না। এ রকম একটি উভয় সংকটজনক বা দ্বান্দ্বিক অবস্থা থেকে পুলিশকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে, নতুবা পুলিশ কখনোই জনবান্ধব হবে না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন বা অধিকারভিত্তিক পুলিশিব্যবস্থা কায়েম করার স্বার্থে ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক ধারাসমূহের সংশোধন প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেকারত্ব, দারিদ্র্য তথা ক্ষুধা জিইয়ে রেখে অপরাধপ্রবণতা দূর করা সম্ভব নয়। দারিদ্র্য এককভাবে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ। দারিদ্র্য মুক্তির চেষ্টা বা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে অপরাধপ্রবণতা হ্রাস এবং সুনাগরিকত্ব সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে একাত্ম করে দেখার বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবশ্যক। অন্যথায় অপরাধ প্রবণতা টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
লেখক : সাবেক ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ এবং সিইও, জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সেল