স্বপ্ন সংকট সম্ভাবনার সোনার বাংলাদেশ

পৃথিবীর বৃহত্তম এবং জীবন্ত বদ্বীপ আমাদের এই বাংলাদেশ। গড়ে উঠেছে পানির প্রবাহ আর পলির সঞ্চয় দিয়ে। বছরে ছয় ঋতু কি আর আছে কোনো দেশে? বারো মাসে তেরো পার্বণ, হাজার ধরনের ধান, নানান জাতের মাছ আর নানা ধরনের গানে এই ভূখণ্ড আকর্ষণ করেছে পৃথিবীর নানা অঞ্চলের মানুষকে। কেউ এসেছে দখল করে শোষণ করতে, কেউ এসেছে থেকে যেতে, তাঁরা সবাই কিছু নিয়ে গেছে যেমন তেমনি রেখেও গেছে অনেক কিছু। তাঁর ফলেই এত বৈচিত্র্য। এই এতটুকু অঞ্চলে কত ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনধারা এমনকি ধর্মীয় বৈচিত্র্য গবেষকদের কৌতূহলী করে তুলেছে বারবার। কবির ভাষায়, স্বপ্ন দিয়ে তৈরি আর স্মৃতি দিয়ে ঘেরা এই দেশ। এই দেশ কি শুধু স্বপ্নের? বাস্তবতা কি নেই? খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা এবং প্রয়োজন, জনসংখ্যা কি সম্পদ না কি আপদ, আমরা কি জ¦ালানিনির্ভর অর্থনীতির ফাঁদে আটকে থাকব নাকি জ্বালানি সক্ষমতা অর্জন করব? আমাদের যা কিছু অর্জন সব কি ধ্বংস হয়ে যাবে দুর্নীতির থাবায়? একটি উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নগুলো আমাদেরকে তাড়িত করে।

দুর্নীতির ঘুণ খেয়ে ফেলছে আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ। এটা এখন আর শুধু ক্ষোভের কথা নয়, বাস্তব বেদনা। যেসব মানুষের হাতে ক্ষমতা আছে, অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বায়ত্তশাসিত-আধা স্বায়ত্তশাসিত করপোরেশন, এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ ক্ষমতাবান ব্যক্তি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। একইভাবে রাজনীতিবিদ, সমাজপতি, সমাজের উঁচুপর্যায়ের লোকজন, যাদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাদের ক্ষেত্রেও বেশির ভাগ লোক দুর্নীতিপরায়ণ। সাধারণ মানুষ দুর্নীতি করে না কিন্তু তাঁরা দুর্নীতিবাজদের চাপে পিষ্ট এমনকি দুর্নীতির সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত।

রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস ট্যাক্স। ট্যাক্স আহরণের অনুপাত হওয়া উচিত জিডিপির ১৫ শতাংশ। বর্তমানে আহরণ হয় ৭ শতাংশের কিছু বেশি। বাকি অর্থের কিছুটা যায় ট্যাক্স আহরণকারী কর্তৃপক্ষ, রেভিনিউ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে, কিছুটা যায় দালালদের পকেটে, আর এর সুফল নেয় তারাই, যারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, তাদের পকেটে। ট্যাক্স আহরণকারী কর্মকর্তা ও দালালেরা পায় এই ঘুষের টাকা। দুর্নীতির এই টাকা এরা পাচার করে বিদেশে আর ব্যয় করে স্থাবর সম্পত্তিতে।

এরা রিসোর্ট বানায়, বাগানবাড়ি তৈরি করে, বিদেশে ভ্রমণে যায়, বিদেশে চিকিৎসা করায়, এরা বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করে, তাদের ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়ায়, সেখানে সম্পদ জমায়। আবার ব্যবসায়ীরা যে কর ফাঁকি দেয় তা দিয়েও তাঁরা সম্পদ গড়ে দেশে ও বিদেশে। সাধারণ মেহনতি মানুষের সম্পদ এখন পুঞ্জীভূত হচ্ছে কয়েক লাখ ধনীর হাতে। বড় বড় শহরের আশপাশে শহরতলিতে হাজার হাজার রিসোর্ট তৈরি হয়েছে। এসবের মান দেখলে মনে হবে ইউরোপের কোনো উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে হাজার হাজার বিঘা জমি  কিনে বিলাসবহুল রিসোর্ট বানানোর ফলে যেসব জমিতে ২৫ বছর আগেও কৃষিপণ্য উৎপাদিত হতো, সেখানে এখন রিসোর্ট। এ রকম চলতে থাকলে কৃষিপ্রধান দেশ রিসোর্টপ্রধান দেশে পরিণত হবে।

বেশ কয়েক বছর ধরে এত উন্নয়নের গল্প শোনার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি যে টালমাটাল অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে সেটার জন্য দায়ী বিভিন্ন কৌশলে টাকা পাচার। এর নানা পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম হলো, আমদানি বাড়ানোর আড়ালে ওভার ইনভয়েসিং পদ্ধতিতে বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার,  রপ্তানিতে ব্যাপক আন্ডার ইনভয়েসিং পদ্ধতিতে পুঁজি পাচার,  রপ্তানি আয় দেশে ফেরত না এনে বিদেশে রেখে দিয়ে ওই অর্থ দিয়ে বিদেশে ঘরবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান  কেনা, দেশের ব্যাংক ঋণ নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীগুলো কর্তৃক হুন্ডিওয়ালাদের ঋণের টাকা প্রদানের মাধ্যমে এর সমপরিমাণ ডলার হুন্ডি প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার। একটা উদাহরণ থেকে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, অথচ একই সময়ে পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি বড়েছে ৫৮ শতাংশেরও বেশি। অতএব অতিরিক্ত আমদানির নামে ব্যাপক ওভার ইনভয়েসিং হয়েছে ধরে নেওয়াই যায়।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ দুর্নীতির ঘটনা ঘটে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে। রাজনীতি কেউ পছন্দ করুক না করুক রাজনীতি হচ্ছে সমাজের চালিকা শক্তি। ফলে রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। এর সাথে যখন প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে দুর্নীতি শেকড় গাড়ে তখন তার প্রভাব সমাজে হয় ভয়াবহ। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নৈতিকতার ধস নামে আর বিচারের প্রতি আস্থা ধ্বংস হয়। যার অবশ্যম্ভাবী ফল সামাজিক অস্থিরতা ও অসন্তোষ বৃদ্ধি  এবং লাগামহীন অপরাধ। পুলিশ ও বিচার বিভাগের দুর্নীতি অপরাধীদের মুক্তভাবে চলার সুযোগ করে দেয় আর নাগরিকদের আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখে। অর্থনৈতিক দুর্নীতির কারণে সরকার রাজস্ব হারায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। যার বোঝা বহন করতে হয় জনগণকেই।

আর একটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুদূরপ্রসারী কুফল ভোগ করে জনগণ। তা হলো শিক্ষা। বাংলাদেশের মতো দেশ, যে দেশে মাটির নিচে সম্পদ কম, মাটির ওপরে চাষাবাদযোগ্য জমি সীমিত; কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেই দেশে শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী ছাড়া উন্নতি আর অগ্রগতি সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধসে গিয়েছে দুর্নীতির কারণে। দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিপ্রবণ খাতগুলোর অন্যতম হলো শিক্ষা খাত। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষার ফলাফল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমে দুর্নীতি শিক্ষার মান ধসিয়ে দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা যখন দেখেন যে যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সাফল্য অর্জিত হয়, তখন নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ হয়ে দাঁড়ায় কথার কথা। তরুণ জনগোষ্ঠীর সুফল পাওয়ার পরিবর্তে তা হয়ে ওঠে দেশের বোঝা।

হামসহ সংক্রামক রোগে মৃত্যু স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির চিত্র এবং মানুষের অসহায়ত্ব তুলে ধরেছে। ওষুধ সরবরাহ, হাসপাতালের বেড বরাদ্দ, চিকিৎসাসেবায় অগ্রাধিকার ইত্যাদিতে দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা খাতে দুর্নীতি শুধু মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় না, চিকিৎসা ব্যয় সমাজে অসাম্য বাড়িয়ে তোলে। ফলে আমদানি, রপ্তানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যে দুর্নীতি যেমন দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, রাজনীতিতে দুর্নীতি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। নির্বাচনে টাকার খেলা, ভোট কেনাবেচা ইত্যাদি কারণে রাজনীতি হয়ে পড়ে দুর্বৃত্তদের ঠিকানা।

তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং জনগণের স্বপ্ন পূরণের পথ কী? কোনো জাদু মন্ত্রে নয়, জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। জনগণকে জানতে হবে কী হচ্ছে দেশে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলে তা  দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকার যদি সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও স্বাধীনতা প্রদান করে, দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশে উৎসাহিত করে তাহলে প্রতিরোধের পথ রচিত হতে পারে।

পৃথিবীর দেশে দেশে এর উদাহরণ আছে। নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের মতো প্রথম ৩০টি দেশই উচ্চ আয়ের দেশ এবং যদিও কাঠামোগত দুর্নীতি সেখানে প্রবল কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব থাকায় ওই দেশগুলোতে দৃশ্যমান দুর্নীতি খুবই কম। যেসব দেশে দুর্নীতির পরিমাণ যত কম, সে দেশগুলোর জাতীয় আয় এবং অর্থনীতি তত বেশি সমৃদ্ধ। সোমালিয়া, বুরুন্ডি, কঙ্গো, হাইতি ও জিম্বাবুয়ের মতো সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় সবচেয়ে কম। ফলে এটা পরিষ্কার যে, দুর্নীতি সর্বদা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কাজ করে। তাই বাংলাদেশের দুর্দশা কাটাতে দুর্নীতির উৎস এবং প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই।

সমাধান চাইলে লোক দেখানো লুণ্ঠনমূলক উন্নয়ন বন্ধ করার পথেও হাঁটতে হবে। বিভিন্ন প্রকল্পের নামে, বাড়তি বাজেট করে যে লুটপাট হয়েছে তা দেশের অর্থনীতিতে এনেছে চরম সংকট। কমে গেছে দেশের রিজার্ভ ফান্ডের পরিমাণও। পণ্য আমদানি করতে গিয়ে চাপ পড়ছে রিজার্ভে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কাটাতে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলো থেকে ঋণ নিয়ে শর্তের ফাঁদে পড়েছে দেশ। কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোকে দিতে হবে সর্বাধিক গুরুত্ব। ১৮ কোটি মানুষের দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনীতি সবসময় ঝুঁকিতে থাকবে। কিন্তু সম্প্রতি দেশে বীজ-ধান, জ্বালানি তেল এবং রাসায়নিক সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। কৃষকদের সহায়তার অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য, মৌসুমি ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং কৃষি গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত। আমাদের সম্পদ হচ্ছে খনিজ, বনজ, মৎস্য, ভূমি ও মানবসম্পদ। জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিতে হবে। অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দুর্বলতার কারণে ২০১০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ, যা বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর ফলে দেশীয় জ্বালানি তথা গ্যাসের পরিবর্তে বাড়ছে আমদানি করা অতি উচ্চমূল্যের এলএনজির ব্যবহার। প্রতি ইউনিট দেশীয় গ্যাসের মূল্য যেখানে দুই থেকে তিন ডলার, সেখানে প্রতি ইউনিট আমদানি করা গ্যাসের জন্য ব্যয় হয় ১২ ডলার থেকে ৩৫ ডলার পর্যন্ত। বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক জীবন অসম্ভব আর বিদ্যুতের জন্য বিদেশনির্ভরতা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। জ্বালানি নানা উৎস যেমন খুঁজতে হবে তেমনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে।

যে আধুনিক গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি তা কি অধরা বা বাস্তবায়ন অযোগ্য স্বপ্ন? না। দেশের কৃষির প্রতি নজর দিলে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে খাদ্য ঘাটতি থাকবে না। গবেষণা ও আহরণের উদ্যোগ নিলে গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এমনি করে স্বাস্থ্য খাত উন্নত ও দায়বদ্ধ করা সম্ভব। সব সম্ভবের পেছনে আছে আধুনিক শিক্ষার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, শ্রমিক কৃষকের উৎপাদন ও রপ্তানি সব রক্ষা করতে হবে দুর্নীতির চক্র থেকে। রাজনীতিতে আনতে হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জবাবদিহিতা। তাহলেই আমাদের দীর্ঘদিনের চাওয়া, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’ আর ‘আমার সোনার বাংলা’, মূর্ত হয়ে উঠবে। স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার বাংলাদেশ বাস্তবে দৃশ্যমান হবে। এই প্রত্যাশাই আমাদের পথ চলার শক্তি।

লেখক : সহ-সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)