নকলায় ‘নামসর্বস্ব’ স্কুলের সাম্রাজ্য: কাগজে প্রতিষ্ঠান, বাস্তবে শূন্যতা

শেরপুরের নকলা উপজেলায় বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষা খাতে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। একই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাতটি ‘নামসর্বস্ব’ বিদ্যালয় প্রায় ১৬ বছরেও পাঠদান শুরু করতে পারেনি। নেই শিক্ষার্থী, নেই শিক্ষক উপস্থিতি—তবুও সরকারি নথিতে এসব প্রতিষ্ঠান সক্রিয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। নিয়মিত বই বরাদ্দসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধাও পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে রয়েছে চারটি ‘বঙ্গবন্ধু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে আরও তিনটি বিদ্যালয়। 

গত সাত দিনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ বিদ্যালয়ের কোনো কার্যকর অবকাঠামো নেই। কোথাও ভাঙাচোরা টিনশেড, কোথাও পরিত্যক্ত ঘর। নেই বেঞ্চ, টেবিল কিংবা শ্রেণিকক্ষের উপযোগী পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানে কখনো নিয়মিত পাঠদান হতে দেখা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক বলেন, ‘স্কুল আছে শুনি, কিন্তু কখনো পড়ালেখা হতে দেখিনি।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নকলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘বঙ্গবন্ধু’ নাম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত এসব বিদ্যালয়ের মালিকানা একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। এতে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে স্থানীয় শিক্ষা খাতের বড় একটি অংশ চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সচেতন মহলের দাবি, একই পরিবারের একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নীতিমালার পরিপন্থী এবং এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থী না থাকা এবং প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড পর্যন্ত না থাকলেও প্রতি বছর এসব বিদ্যালয়ের নামে সরকারি বই বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, বরাদ্দকৃত বই প্রকৃত শিক্ষার্থীদের কাছে না পৌঁছে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা বা বিক্রি করা হচ্ছে।

এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘যেখানে পড়ালেখাই হয় না, সেখানে বই যায় কীভাবে—এটাই বড় প্রশ্ন।’

বিদ্যালয়গুলোর প্রতিষ্ঠান কোড ও সরকারি ইএমআইএস কোড বহাল থাকায় তা ব্যবহার করে শিক্ষক নিয়োগের নামে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাস্তবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম না থাকলেও কাগজে সক্রিয় দেখিয়ে নানা সুবিধা নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কোড থাকলেই অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। একটি অসাধু বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক চক্র সেটিকেই কাজে লাগিয়েছে।’

শিক্ষানুরাগীদের মতে, ভবিষ্যতে জাতীয়করণের সুযোগ পাওয়ার আশায় এসব বিদ্যালয় কাগজে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বাস্তবে কার্যক্রম না থাকলেও সরকারি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাই মূল উদ্দেশ্য হতে পারে।

নকলা উপজেলায় ৮৮টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকায় থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও তালিকা থেকে বাদ না দিয়ে সক্রিয় দেখিয়ে সরকারি বই বিতরণসহ নানা সুবিধা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে উপজেলায় ১১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকার পরও প্রয়োজনীয়তা যাচাই-বাছাই ছাড়া বিপুল সংখ্যক বেসরকারি বিদ্যালয় অনুমোদনের বিষয়েও সমালোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এগুলো এখন ‘ভূতুড়ে’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে—কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়মিত সুবিধা আদান-প্রদান চলছে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে ছিল না। আপনারা জানিয়েছেন, আমরা তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। ইতোমধ্যে ৮৮টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সভাপতিদের শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে স্কুল কোড ও ইএমআইএস কোড বাতিলের এখতিয়ার আমার নেই।’

নকলার এ ঘটনা দেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও তদারকির অভাবকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত যাচাই-বাছাই, নিয়মিত মনিটরিং এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের ‘কাগুজে’ প্রতিষ্ঠানের বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব নয়।