পুলিশে নিরপেক্ষতার দায়

পুলিশে শৃঙ্খলা ফিরেছে বলে মনে করছে সরকার। এই মনে করা থেকে, মাঠ থেকে ধাপে ধাপে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ভাবনা। দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে এক নম্বর বাহিনী পুলিশ। এটাই পুলিশের মূল কাজ, সেনাবাহিনীর নয়। তাদের কাজ জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা। তাদের অনিবার্য প্রয়োজনে পুলিশিং করতে হয়েছে অনেক দিন ধরে। এখন পুলিশ বাহিনীকে সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে উপলব্ধিতে, তাদের নিজস্ব কাজে ফিরিয়ে আনা। এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের ভাবনাকে জনগণের ভাবনা বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর অভিমত পুলিশকে জনআস্থায় আসতে হবে। হতে হবে মানবিক। আর যেন কখনো তাদের ফ্যাসিস্ট তৈরিতে ব্যবহার হতে না হয়। মোটকথা পুলিশকে ফেরেশতা নয়, মানুষের কাতারভুক্ত হতে হবে। কিন্তু, মানুষ হওয়ার চেয়ে পুলিশের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের হওয়ার প্রবণতা মারাত্মক পর্যায়ে। আওয়ামী পুলিশ থেকে বিএনপির পুলিশ হতে গিয়ে বাহিনীটির কারও কারও মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা। টপ টু বটম যে যেদিক দিয়ে সম্ভব এ অভিযাত্রায় কোমর বেঁধে নেমেছেন। যে কারণে পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক প্রভাব বা ‘দলবাজি’ আবার নতুন করে আলোচিত-সমালোচিত। সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে পুলিশের ‘মানবিক’ হওয়া এবং জনগণের বন্ধু হয়ে ওঠার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায়। নির্দ্বিধায় বলা যায়, সামনে পুলিশের জন্য আরেকটি কঠিন সময় আসছে।

বিতাড়িত শক্তি মাঠে ঢুঁ মারছে। ঝটিকা কাণ্ডকীর্তি করছে তারা। শুধু সেনাবাহিনী মাঠ থেকে সরে যাওয়ার অপেক্ষায়। পেশাদার সন্ত্রাসীরাও মাঠে তৎপর। রাজনৈতিক অঘটনও ঘটছে। সামনের দিনগুলোতে পুলিশকেই সামলাতে হবে সব। এ রকম সময়ে পুলিশের ভরসা জনগণ। পুলিশ সংশোধন হয়েছে, এ বার্তা জনগণের কাছে থাকতে হবে। আর সেটা মুখের কথায় নয়, কাজে। নিজেদের সেই জায়গায় কতটা নিতে পেরেছে পুলিশ, তা প্রশ্ন হয়েই থাকছে। পুলিশ, প্রশাসনসহ প্রাতিষ্ঠানিক বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার বিষয়ে একটি ঐক্য ও আকাক্সক্ষা জনগণের মধ্যে অনেক দিনের। সেই সঙ্গে তাদের মধ্যে আর চুপ না থেকে, মুখ খুলে কথা বলার চর্চা শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার আধুনিক সংজ্ঞায়, ক্ষুদ্ররাষ্ট্র বলতে কিছু নেই। প্রবল জনঐক্য, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই আসল কথা। জরুরি প্রয়োজন এখন সামরিক এবং বেসামরিক শক্তির সেতুবন্ধন অটুট রাখা। ইতিহাসের কথা এখানে স্মরণ করতে হয়। ‘বাংলাদেশ রক্ষা করতে হলে বেসামরিক এবং সামরিক শক্তি এক সঙ্গে কাজ করতে হবে’- মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কথাগুলো বলেছিলেন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লবের অব্যবহিত পরে জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জননেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে উদ্দেশ্য করে। ২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট মাসে এসে তার একটা শো-আপ হয়। পুলিশ সরাসরি ভূমিকা নেয় সরকারকে রক্ষার। প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট টেকানোর কাজে নেমে জনতার বিপক্ষে চলে যায়। সেনারা মিশে যায় জনতার শক্তির সঙ্গে। পাল্টে যায় দৃশ্যপট। পুলিশ হয় গণশত্রু। পুলিশের সেখান থেকে উতরানো অবশ্যই সময়সাপেক্ষ।

বিদায় নেওয়া ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে পুলিশে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার নিয়োগ হয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ে। ব্যক্তিগত বা ইনডোরে নয়, সংবাদ সম্মেলনেই এ তথ্য দিয়েছেন তিনি। সাজ্জাত তথ্য দিন বা না দিন, বাস্তবতা ছিল- নিয়োগের আগে প্রার্থীর এবং তার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হতো গুরুত্বের সঙ্গে। যে কারণে ৫ আগস্টের পর পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে থানা পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপক রদবদল। অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে অথবা সংযুক্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বারবার জানানো হয়েছে, পুলিশকে একটি নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। নিয়োগ ও বদলিতে তদবির খাটবে না। কিন্তু, বাস্তব বড় করুণ। দীর্ঘদিনের চর্চায় পুলিশের মধ্যে মানুষ হওয়ার চেয়ে, পুলিশ হয়ে থাকার চেষ্টা অবিরাম। তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে, কনস্টেবল পর্যন্ত। সেখানে ‘ম্যানেজ’ করে চলার বাতিক অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক। এ ম্যানেজ করার কৌশল চর্চায় পরিচ্ছন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত পুলিশি সেবা পাওয়া এখনো সম্ভব হচ্ছে না। নিজের পদ-পদবি, পোস্টিং, বাড়তি কামাই সবখানেই ম্যানেজতন্ত্র। পেশাগত অংশ মামলা রেকর্ড হওয়ার পর থেকে অপরাধী গ্রেপ্তারে অপারেশন পরিচালনা এবং মামলার তদন্ত পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ম্যানেজতন্ত্র। একজন পুলিশ সদস্য প্রশিক্ষণ শেষ করে, কর্মজীবনের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই এই ‘ম্যানেজ কৌশল’ রপ্ত করেন। এর পেছনে বড় ভূমিকা তার ঊর্ধ্বতনের। অনেক সময় দেখা গেছে, অফিসের প্রয়োজনে বের হওয়ার সময় ফান্ড পাচ্ছেন না। তার সিনিয়র বিষয়টি ম্যানেজ করে নিতে বলছেন। মন খারাপ হলেও, একপর্যায় গিয়ে ওই নবীন পুলিশ কর্মকর্তা ম্যানেজ করার কৌশল শিখে যাচ্ছেন। এভাবে কমিশনার ডিসিকে, ডিসি ওসিকে আর ওসি তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিচ্ছেন। সিনিয়রের নির্দেশে পকেটের টাকা খরচ করে আর টাকা পাননি তদন্ত কর্মকর্তারা, এমন হাজারো উদাহরণ পুলিশে আছে। দুর্নীতিমুক্ত পুলিশিংয়ে বড় বাধা এ ম্যানেজ কৌশল। যা পুলিশকে মানুষ হতে দেয় না। দুর্নীতির ম্যানেজার বানায়। মানুষ হওয়ার চেয়ে, পুলিশ হয়ে থাকাকে অনিবার্য করে। আর  পুলিশের পেশাদারিত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ বড় হয়ে যাওয়ার পরিণামে, সাধারণ মানুষের আস্থা সংকটের সৃষ্টি। পুলিশও প্রকৃত অর্থে, জনবান্ধব ও মানবিক হয় না। তাদের কেউ তা করেও দেয় না। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে রবিবার রাজারবাগে পুলিশ অডিটোরিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার উপলব্ধিতে যথার্থই বলেছেন, জনগণের বিশ্বাস অর্জন পুলিশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশকে দলীয় আনুগত্য নয়, আইন অনুযায়ী চলার তাগিদও দিয়েছেন।

ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের হীনস্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সেই অন্ধকার সময় পেরিয়ে এখন সময় এসেছে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার। প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন একটি আধুনিক, মানবিক ও সুদক্ষ পুলিশ বাহিনী ছাড়া জনগণের কাক্সিক্ষত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশের যৌক্তিক চাওয়া-পাওয়া ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। পুলিশের এ সময়ের  চাওয়া কী? অন্যতম চাওয়া সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং বিচার বিভাগের মতো স্বতন্ত্র পে-স্কেল। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে সেদিন রুদ্ধদ্বার কল্যাণ প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তারা আরও কিছু চাওয়ার ফর্দ জানান। মামলার তদন্ত বাবদ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বলা হয়, বর্তমানে প্রতিটি মামলা তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই খরচে তদন্ত শেষ করা যায় না। এ ছাড়া উপপরিদর্শকদের (এসআই) বিনা সুদে মোটরসাইকেল ঋণ দেওয়ার দাবি উঠেছে। সেটাও তারা করেন সেই ‘ম্যানেজ’ তরিকায়। দাবি-দাওয়া তুলে ধরার পর, প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের মোটরসাইকেল কিনতে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া ওভারটাইম (অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক) ও পুলিশ হাসপাতাল সংক্রান্ত দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেন। ধরা যাক, আশ্বাস নয় তাদের দাবিগুলো পূরণ হয়ে গেল। তাতে কি তারা মানবিক হবে? তা তাদের জনগণের বন্ধু করবে? আরও সোজা করে বললে, এসব দাবির সঙ্গে পুলিশের ইমেজ ফেরানো, তাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ কমানোর প্রসঙ্গ কদ্দুর? দলীয়পনা থামানোরই বা দাওয়াই কী? উল্লেখ করতেই হয়, পুলিশ সপ্তাহের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই এবার পদক প্রদান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

তালিকা নিয়ে আপত্তি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায়, শেষ মুহূর্তে পদক প্রদানের প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। প্রতি বছর সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম)’ এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য ‘বিপিএম-সেবা’ ও ‘পিপিএম-সেবা’ পদক দেওয়া হয়। প্রতি বছরের মতো এবারও ১১৫ জনকে পদক দেওয়ার তালিকা করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছয়জনকে ইতিপূর্বে পদক পরিয়ে দেওয়া হয়। তালিকায় নাম থাকা অন্যদের মধ্যে ১০৭ কর্মকর্তা পুলিশ সপ্তাহের মহড়ায়ও অংশ নেন। পরে অনুষ্ঠানের আগের দিন শনিবার রাতে পদক স্থগিত করা হয়। এর আগে, গত বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৬২ জনকে বিপিএম ও পিপিএম দেওয়া হয়। এর আগের বছর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৪০০ জনকে বিপিএম ও পিপিএম পদক দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে ১১৭ জনকে ও ২০২২ সালে ২৩০ জনকে পদক দেওয়া হয়েছিল। তাও দলীয়পনায় ভরপুর। এবারও ঘটে গিয়েছিল প্রায়। যেখানে নানা পথে ম্যানেজ করে নেওয়া হয় অনেককে। ফ্যাসিস্ট আমলে পদ-পদবিতে মোটাতাজা হওয়া, গুম-খুনে হাত পাকানো এ জীবদের মধ্যে মানুষ না হয়ে পুলিশ থাকার মানসিকতারই প্রকাশ। গণহত্যায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত, রক্তপিপাসুদের মানুষের কাতারে আনা সহজ কাজ নয়।  ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি বা ফাঁক থাকার সুযোগে তারা নতুন সরকারের লোক সাজছে। তারা পুলিশিংয়ে নেই। পদ্ধতিতে বড় ধরনের ত্রুটি থাকায় ভালো-মেধাবীরাও কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে যাচ্ছেন এ কাজে। কুকর্মের পদ্ধতি বহাল রেখে শুধু পুলিশকে দোষ দেওয়া একতরফা ও অন্যায্য হয়ে যায়।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

mostofa71@gmail.com