ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে রাজনৈতিক গতিধারা নতুন মোড় নেয়। সেই মুহূর্তগুলো কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ হয়ে থাকে না। ইতিহাসের প্রতিটি বড় গণআন্দোলন, গণজাগরণ কিংবা রাষ্ট্র রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় দেখা গিয়েছে, দেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থান করেও প্রবাসীরা নানাভাবে সেই পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তেমনই একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যা দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনোজগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। জন্মমাটি ও মানুষ, শৈশবের স্মৃতি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ও ইতিহাসের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা স্বদেশ থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি তাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের চিন্তাচেতনা, আবেগ-অনুভূতি, ইচ্ছে-আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় একটি অংশজুড়েই থাকে প্রিয় স্বদেশ। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এই উদ্বেগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং অনিশ্চয়তার খবর তাদের উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ওই স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল যখন স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট কেবল একটি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা উপযোগিতা নয়; এটি প্রবাসী মানুষের জন্য স্বদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন। প্রতিদিনের ফোনকল, ভিডিও আলাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা কিংবা সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ প্রভৃতি সবকিছু মিলিয়েই নানা মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের দেশকে কাছে অনুভব করেন। সেই সেতুবন্ধন যখন হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তখন দূরত্বের বাস্তবতা নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, নিজেদের ভাবতে হয় ভিন গ্রহের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই ২০১৪-এর সেই যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে অসংখ্য প্রবাসীর কাছে মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আড়াল হয়ে গেছে। অনেকের চেতনায় বাংলাদেশ যেন এ দুনিয়া হতে হারিয়ে গিয়েছিল। সময় কাটাতে হয়েছিল দুর্যোগকালীন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে। রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের কল্পনা ও আশঙ্কা বাস্তবতার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তথ্যের অভাব প্রায়ই মানুষের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রবাসীরা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন, দূরে থাকলেও তাদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খণ্ডিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারে অনেক প্রবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে দেশের ভেতরের আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ-সেতু তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, অনুবাদ, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দেশের অভ্যন্তরে যে কণ্ঠস্বর কখনো কখনো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, তা প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। প্রবাসীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেছিল যে, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি ঐক্য ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের ভূমিকার একটি বিশেষ দিক ছিল তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘নাগরিক কূটনীতি’ (সিটিজেন ডিপ্লোমেসি) বলা হয়, যেখানে সাধারণ নাগরিকরাই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করেছিলেন। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, আলোচনা সভা এবং সংহতি কর্মসূচির আয়োজন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, বার্লিন, প্যারিস, রোম, স্টকহোমসহ বিশ্বের নানা শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায়ক হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচিতে শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, বরং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ একটি জাতীয় ইস্যুর গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের সম্পৃক্ততা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। বরং তা ছিল স্বদেশপ্রেম, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। আগামী প্রজন্ম চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস পাঠ করবে, তখন তারা রাজপথের সংগ্রামের পাশাপাশি হয়তো এই নীরব অধ্যায়ের কথাও জানবে। শুনবে সেসব প্রবাসী মানুষের কথা, যারা দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গেই ছিলেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে প্রবাসীদের অবদান কেবল একটি পরিশিষ্ট নয়; বরং এটি সেই বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের কাহিনিরই অংশ, যেখানে দেশের ভেতর ও বাইরের বাংলাদেশিরা মিলিতভাবে অন্যায়, বৈষম্য ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
