বাণিজ্য কৌশল ও সমুদ্রপথের গুরুত্ব

দ্রুততার সঙ্গে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য পৌঁছায়, জ্বালানি আসে নিরবচ্ছিন্নভাবে, অনবরত ঘোরে শিল্পের চাকা। কিন্তু অবিরাম গতির পেছনে যে অবকাঠামো কাজ করে, তা আশ্চর্যজনকভাবে ভঙ্গুর। বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে কয়েকটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ওপর, যেগুলোকে বলা হয় ‘চোকপয়েন্ট’। এগুলো এমন কিছু পথ, যেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বঅর্থনীতির গতি হঠাৎ থেমে যেতে পারে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগরে সংযোগকারী, এই সরু জলপথটি বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন প্রায় ১৭ থেকে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। অর্থমূল্যে হিসাব করলে, বছরে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি জ্বালানি বাণিজ্য এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। শুধু তেল নয়, তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বিশাল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য উত্তেজনা মানেই বৈশ্বিক জ¦ালানি বাজারে মূল্য অস্থিরতা। তবে হরমুজ একা নয়। বিশ্বের বাণিজ্যিক গতিপথ নির্ধারণে আরও চারটি গুরুত্বপূর্ণ পথ রয়েছে মালাক্কা প্রণালি, সুয়েজ খাল, বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং পানামা খাল। এই পাঁচটি পথ মিলিয়ে বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য ও জ্বালানি পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিশাল অংশ।

মালাক্কা প্রণালি এশিয়ার অর্থনীতির জন্য জীবনরেখা। ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগরে যাওয়ার এই পথ দিয়ে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবাহিত হয়। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শিল্পশক্তিগুলোর জ্বালানি ও কাঁচামাল সরবরাহের প্রধান রুট এটি। বছরে প্রায় ৮০ হাজার জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে। কিন্তু এর সরুত্ব, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং জলদস্যুতার আশঙ্কা সবসময় একে অনিশ্চিত অবস্থায় রাখে। ফলে এই পথের ওপর নির্ভরতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুয়েজ খাল অপরিহার্য শর্টকাট। এই খাল দিয়ে বছরে প্রায় ১ থেকে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবাহিত হচ্ছে। ২০২১ সালে একটি কনটেইনার জাহাজ আটকে গিয়ে খালটি কয়েক দিনের জন্য অচল হয়ে পড়লে, বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। মাত্র ছয় দিনে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা এই সংকীর্ণ পথের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকিকে স্পষ্ট করে। সুয়েজ রুটের প্রবেশদ্বার হলো বাব এল-মান্দেব প্রণালি। বছরে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য এই পথ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন এই প্রণালিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু ইয়েমেনসহ আশপাশের অঞ্চলের সংঘাত, জলদস্যুতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি এই পথকে বারবার অস্থির করে তোলে। ফলে জাহাজগুলোকে অনেক সময় বিকল্প দীর্ঘ রুট বেছে নিতে হয়, যা সময় ও খরচ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এবং বছরে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবহনে ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা ও পানির সংকট খালের কার্যক্ষমতা সীমিত করে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পাঁচটি প্রণালির একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো সংকীর্ণ, বিকল্প সীমিত এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে, এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সুয়েজ খাল বা বাব এল-মান্দেব অচল হলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হয়, যা সময় বাড়ায় ১০ থেকে ১৫ দিন এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।  বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এই বাস্তবতা আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। আমাদের জ্বালানি, খাদ্যশস্য, শিল্প কাঁচামাল এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি, সবকিছুই এই বৈশ্বিক নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব প্রণালিতে কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের অর্থনীতিতে, বাড়ে আমদানি ব্যয়, ব্যাহত হয় রপ্তানি এবং চাপ সৃষ্টি হয় সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়। তবে এই চ্যালেঞ্জের বিপরীতে কৌশলগত প্রস্তুতি নিলে ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব।

প্রথমত, সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একটি নির্দিষ্ট রুট বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বিকল্প উৎস ও পথ খুঁজতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে, যাতে কোনো সংকট দেখা দিলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।  তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়িয়ে বাংলাদেশ নিজেকে একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিক হাবে পরিণত করতে পারে। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে যদি আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় তবে শুধু দেশের অর্থনীতি নয়, পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য প্রবাহকে শক্তিশালী করবে। চতুর্থত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এলএনজি, তেল ও বিকল্প জ্বালানির ক্ষেত্রে বহুমুখী উৎস তৈরি করা গেলে হরমুজ বা মালাক্কার মতো চোকপয়েন্টে অস্থিরতার প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

একইসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা, বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিপিং খাতে নীতিগত সংস্কার আনা সময়ের দাবি। বিশ্ববাণিজ্যের এই সংকীর্ণ পথগুলো যতটা সুযোগ সৃষ্টি করে, ঠিক ততটাই ঝুঁকি  তৈরি করে। তাই প্রয়োজন সুসমন্বিত পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। এই সংকীর্ণ জলপথগুলো কেবল ভৌগোলিক রুট নয়, এগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ। এখানে প্রতিদিন যে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রবাহ ঘটে, তা শুধু বাণিজ্যের পরিসংখ্যান নয়, এটাই বিশ্বঅর্থনীতির স্পন্দন। পাঁচটি সরু পথ, কিন্তু তাদের প্রভাব বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। এই পথগুলো সচল থাকাই আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।

লেখক : সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন

mta.suzan@gmail.com