স্বস্তি আসুক বাজেটে

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হয়েছে। ১৭ বছর পর তারেক রহমান দেশে ফেরেন ২০২৪ জুলাই বিপ্লবের পর। ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের পর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে, শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছেন। একটি মামলার রায়ও হয়েছে। ভারত সরকার তাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফেরত দিচ্ছে না। সরকার আবেদন করেছে। ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমান তার প্রথম ভাষণে জাতিকে জানিয়েছেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। সেই পরিকল্পনায় বেশ কিছু অংশ নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করা হয়েছে। দেশের দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করেছেন। যেমন ফ্যামিলি কার্ড, খাল কাটা কর্মসূচি, আলেম-পাদ্রিদের ভাতা প্রদান, স্কুল শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ, জুতা প্রদান ইত্যাদি। এই সব ইতিবাচক পদক্ষেপে মানুষ খুশি। সময়ের প্রতি দৃষ্টিপাত, ঠিক ৯টায় অফিসে হাজির হয়ে প্রধানমন্ত্রী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। এই সবই সরকারপ্রধান তারেক রহমানের ‘প্ল্যান-এ’র অংশ। বিশ্ব বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক কিছুতে পরিবর্তন এসেছে। জুলাই বিপ্লব মনোজগতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আমাদের চাওয়া-পাওয়ার আশা অনেক বড় হয়েছে, চিন্তার জগতে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ করছি না। ২০ বছর আগেকার ধ্যান-ধারণা দিয়ে মন্ত্রী এমপিরা যেন, এগিয়ে চলার চেষ্টা করছেন।

সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর বিশ্বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ইরান-মার্কিন যুদ্ধ বিশ^কে কোথায় নিয়ে যাবে, এখন বলা বড় মুশকিল। নতুন করে ভাবতে হবে, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বের জ্বালানি তেলের যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, যার ফলে বিভিন্ন দেশ তাদের অর্থনৈতিক বিষয় নতুন করে ভাবা শুরু করেছে। কেউবা নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বঅর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়। বিশ্বঅর্থনীতির কৌশলের সঙ্গে আমাদের চলতে হবে। ইরান যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নশীল দেশ তথা বাংলাদেশ। তারেক রহমানের সরকারকে নতুন করে নতুন প্ল্যান নিয়ে ভাবতে হবে। তিনি সেটি ‘বি প্ল্যান’ নাম দিয়ে শুরু করবেন। যেহেতু এ প্লানের কার্যকারিতা আপাতত কার্যকর করা কঠিন বা প্রয়োজন হচ্ছে না। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বার্ষিক সভায় যোগ দিয়ে অনেকটা খালি হাতে দেশে ফিরে এসেছেন। ১৪ এপ্রিল আইএমএফ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বঅর্থনীতিতে তিন ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাবে। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকবে। উদ্যোক্তরা নিজেদের ব্যয় কমাতে চেষ্টা করবেন। শ্রমিকরা নিজেদের বেতন বৃদ্ধি দাবি করতে থাকবেন, ফলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাবে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, শেয়ারবাজার ভালো অবস্থানে থাকবে না, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি পাবে, টাকা পাচার বেড়ে যেতে পারে, বিনিয়োগ হ্রাস পাবে সর্বোপরি দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। তবে আইএমএফ বলছে, এই তিন অবস্থা সব দেশে এক রকম হবে না।

উন্নত দেশের চিত্র ভিন্ন হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি দেশসমূহে এই সমস্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিম্ন আয় ও স্বল্পোন্নত দেশে এই ধাক্কা বেশি লাগবে। এসব দেশের অর্থনীতি দুর্বল। বড় ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা এসব দুর্বল দেশের নেই। বিশেষ করে, এসব দেশের অতিরিক্ত অর্থ জমা নেই। অন্যদিকে নীতি সহায়তা দেওয়ারও সক্ষমতা কম। আমাদের মতো দেশ যারা রেমিট্যান্স-নির্ভর, তাদের সমস্যা বেশি হবে। বিদেশে শ্রমিক পাঠানো কমে যাবে। অন্যান্য দেশে তেল উৎপাদন কমে যাবে, তাদের রপ্তানি অনেক কমে যাবে। এই কঠিন অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য সরকার জ্বালানি তেলে মূল্যবৃদ্ধি করেছে। যখন তারেক রহমান দেশে আসেন তখন বিশ্বপরিস্থিতি এই অবস্থায় ছিল না। দেশ ও দেশের রাজনীতি অনেকটা স্থিতিশীল ছিল। এখন যুদ্ধের কারণে বিশ্বঅর্থনীতি টালমাটাল। নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন প্ল্যান গ্রহণ করতে হবে। আর এই নতুন প্ল্যান হবে তারেক রহমানের নতুন নবায়ন প্ল্যান। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। নতুন চিন্তা নিজ মনে নিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মের চিন্তার সঙ্গে মিল রেখে  বিশ্ব যুদ্ধ পরিস্থিতির আলোকে নতুন নিয়ম নতুন প্ল্যান নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সব মন্ত্রী এমপি ও নেতাদের নতুন এই সংগ্রামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক হতে হবে। পুরনো ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করতে হবে। আধুনিক এআই-কে সামনে রেখে নতুনের জয়গানে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান অর্থবছর ২০২৫-২০২৬ শেষ হতে বাকি আছে দুই মাসের কিছু বেশি। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিগত আট মাসে রপ্তানি আয় আছে কিন্তু নেই প্রবৃদ্ধি। কৃষি উপকরণ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষি উৎপাদন কমবে। খাদ্য আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বিনিয়োগ কমে যাবে। বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নেই। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিদেশি রিজার্ভ কমতে থাকবে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিদেশি আয় কমতে থাকবে। অন্যান্য মুসলিম দেশে আমাদের দেশে থেকে শ্রমশক্তি যাচ্ছে কম। দেশে ফিরে আসছে বেশি। বিদেশি আয় কম আসার ফলে, দেশে ব্যাংকগুলো থেকে টাকা উত্তোলন বেড়ে গেছে। সামনে আরও বেশি হবে। বিএনপি সরকার নির্বাচনের আগে একটি চমৎকার ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। নির্বাচন হওয়ার পর পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার কাজ শুরু করেছে। সরকার শুরু করেছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-পাদ্রি, পুরোহিতদের ভাতা প্রদান, খালকাটা কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কিন্তু আসন্ন বাজেট তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী বাজেটে এসব নির্বাচনী ওয়াদা বাস্তবায়ন করবে সরকার। সরকারের আয় কমেছে। সরকার বিগত কয়েক মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে। সরকারের ঋণ বৃদ্ধির ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমেছে। এখন সরকারকে বিকল্প প্ল্যান তৈরি করতে হবে।

দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে হলে, কাতারসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে আমদানি করতে হবে। কাতার ইরান যুদ্ধের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের এলএনজি বড় আমদানি হয়েছে কাতার থেকে। এখন কাতার থেকে আমদানি সংকটের কারণে সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি করতে হবে। এর ফলে মূল্যবৃদ্ধি পাবে। তাই সরকারকে বিশেষ বিবেচনায় বাজেটে নতুন চিন্তা করতে হবে। করতে হবে সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা। সৎভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে মানুষ খুশি হবে। মানুষের জীবন-মান বৃদ্ধি পাবে। দেশে শান্তির শীতল প্রবাহ প্রবহমান থাকবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূস সরকারের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি বেশ আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনতে হবে। ভারতের সঙ্গে চুক্তিগুলোকে আবারও নতুন বিবেচনায় আনতে হবে। জুলাই সনদ নিয়ে সংসদ ও সংসদের ভেতরে-বাইরে বেশ আলোচনা চলছে। সরকার বলেছে, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। কিন্তু বিরোধী দলের সমালোচনা অনেকটা অতিরিক্ত বলে মনে হয়। এখনো সময় আসেনি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনে যাওয়ার। বিরোধী দল একটু অপেক্ষা করুন। দেখুন সরকার কী করে। অবশিষ্ট অধ্যাদেশসমূহ নিয়ে সরকারের ভূমিকা দেখার জন্য একটু অপেক্ষা করুন। সময় দিন। ভালো দিনের আশায় কিছুদিন অপেক্ষা করলে দেশ ও জাতির বড় কোনো ক্ষতি হবে না। দেশটা নতুন করে সাজাতে হবে। নতুন প্রজন্মের চিন্তা-চেতনা ভাবনা ও পরিকল্পনাকে নিয়ে ‘বি’ প্ল্যান তৈরি এখন সময়ের দাবি। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিয়ে এপ্রিল ২০২৬ যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাক, সেই প্রতিবেদনে কী রয়েছে। ১. বিশ্বব্যাংক বলেছে চলতি হিসাবে ঘাটতি জিডিপি ১ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। ২. মূল্যস্ফীতি দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ৩.  শিল্পে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে, রপ্তানি কমবে, বাণিজ্যে ভারসাম্য থাকবে না। ৪. প্রবাসী আয় কমতে পারে, ২০২৬-২৭ প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে ও ৫. বাড়তে পারে সরকারের ব্যয় জিডিপি প্রায় দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে সরকারের ব্যয় ৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকারি ঋণ জিডিপি ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব শেষে বিশ্বব্যাংক বলেছে আগের দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও দুর্বল হতে পারে। যার ফলে কর্মসংস্থান কমে যাবে, যেহেতু বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাবে, দেশ অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।

বিগত ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দুর্র্নীতি অর্থপাচারের ফলে দেশটি ভঙ্গুর অর্থনীতির ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। এরই মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ’২৬ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মন্দা, যুদ্ধ ও বৈরী প্রবাহ। তবে আইএমএফ বারবার বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এবারের যুদ্ধের ঝুঁকি বেশি। তবে সঠিক নীতি ও সিদ্ধান্ত সময়মতো নিতে পারলে বড় ক্ষতির হাত থেকে দেশ রক্ষা পাবে। নির্বাচনের আগে বিএনপি ‘এ’ প্ল্যান নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। কিন্তু যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে এখন ‘এ’ প্ল্যান পুরোপুরি কাজ করে না। নতুন সরকারকে দ্বিতীয়বারের মতো ‘নতুন প্ল্যান’ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। যার মধ্যে থাকতে হবে দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত আইন ও সুশাসনে নতুন চেতনার বিকাশ। একইসঙ্গে জুলাই-২৪’র চেতনার নতুন প্রজন্মের মনের চিন্তাকে কাজে লাগাতে হবে। সুন্দর দিনের অপেক্ষায় জাতি আশার আলো দেখতে চায়। নতুন বাজেটে সেই দিকনির্দেশনা থাকবে আশা করি।  

লেখক: চেয়ারম্যান, ইয়ুথ গ্রুপ আহ্বায়ক, মুক্তচিন্তা বাংলাদেশ  

aqhaider@youthgroupbd.com