ভোজ্যতেলের দাম

টিসিবিকে ভর্তুকি দিন

নিত্যপণ্যের বাড়তি মূল্য থেকে সীমিত আয়ের মানুষকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি ট্রাকে কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্য রাজধানীসহ জেলাসদরে বিক্রি করে। পণ্যগুলোর একটি ভোজ্যতেল। এই পণ্যটির দাম আকস্মিকভাবে লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে টিসিবি। গতকাল থেকেই এই বাড়তি দাম কার্যকর হয়েছে। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৩০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। ঈদুল আজহা সামনে রেখে নিজেদের ভর্তুকি কমাতে এই পথে গেল টিসিবি। চাল-ডাল, নুন-মরিচ, শাকসবজি, মাছ-মাংসসহ জিনিসপত্রের চড়া দাম সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে কারা উপায়ান্তর না দেখে রোদ, ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে সারিতে দাঁড়িয়ে ওএমএস পণ্য কেনেন? অধিকাংশই দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, গৃহসহায়ক, ঠেলাওয়ালাসহ স্বল্প আয়ের মানুষ; ‘দিন এনে দিন খাওয়া’ অবস্থায় যাদের জীবন চলে, তারা সংখ্যাও কম নয়।

টিসিবি ঢাকা মহানগরে ৫০টি, চট্টগ্রাম মহানগরে ২০টি, অন্য ছয়টি বিভাগীয় শহর ও সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিটিতে ১৫টি এবং অবশিষ্ট ৫৬টি জেলায় ১০টি করে ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছে। আগামী ২১ মে পর্যন্ত চলবে এই বিক্রি। সব মিলিয়ে টিসিবি প্রতিদিন সারা দেশে ৭২০টি ট্রাকে পণ্য সরবরাহ করে। প্রতিটি ট্রাক থেকে প্রায় ৪০০ ব্যক্তি পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। সেই হিসাবে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার ব্যক্তি টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য নেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রত্যেকে একেকটি সীমিত আয়ের পরিবারের হয়ে জিনিস কেনেন। তাদের জন্য যেকোনো মূল্যবৃদ্ধি বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো চাপ সৃষ্টি করবে। এই যখন সার্বিক অবস্থা, তখন সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত সংস্থা টিসিবি কেন তেলের দাম বাড়াল? কোরবানির ঈদের চাপ সামনে রেখে ভোজ্যতেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রতি লিটারে ৪ টাকা দাম বাড়িয়েছে। তাদের পথ অনুসরণ করেই কি টিসিবি লিটারে ১৫ টাকা বাড়াল? এটা মনে রাখা জরুরি ব্যবসায়ীরা মুনাফা ঠিক রাখতে বা বাড়াতে যা করতে পারেন, মানুষকে স্বস্তি দিতে তৈরি করা টিসিবি তা করতে পারে না। তাহলে কি টিসিবির লোকসান ও ভর্তুকি কমাতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? বাড়তি দামের চাপ যে গরিবের ঘাড়ে গিয়ে পড়ল এবং তারা তা সহ্য করতে পারবেন কি না, সেটা কি কর্র্তৃপক্ষ বিবেচনায় নেয়নি?

ওএমএস থেকে গরিব মানুষ শুধু যে ভোজ্যতেল কেনে, তা নয়। চাল, মসুরির ডাল ও চিনি এবং আরও কিছু পণ্য কেনে। এ থেকে যে স্বস্তি পাওয়ার কথা, তা অন্য পণ্যের, বিশেষ করে তেলের দাম বাড়িয়ে কেড়ে নেওয়ার মানসিকতা কী করে হলো! টিসিবি যেকোনো পণ্যে দাম ঘোষণার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেয়। মন্ত্রণালয়ের কি এক্ষেত্রে দায় নেই? নিশ্চয়ই আছে। কেন আটকালো না তারা টিসিবিকে? আমাদের বক্তব্য হলো সরকার যখন জনগণকে সেবা দেওয়ার কথা বলছে, তখন হতদরিদ্র মানুষকে বাঁচাতে সাহায্য করতে কুণ্ঠা কেন? জনগণের সেবা দিতে গিয়ে এটা মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষের প্রতি বিশেষ করে সীমিত ও অতি সীমিত আয়ের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব অনেক। ঊর্ধ্বগতির পণ্যবাজারে দাম বাড়ানোতে পাল্লা না দিয়ে হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো দরকার টিসিবি তথা সরকারের। সেবা হবে সেটাই, যদি প্রতিটি মানুষ উপকারভোগী হতে পারে। তাই জেলা শহর ছাড়িয়ে উপজেলাসহ দরিদ্র জনবসতিতে মানুষের কাছে টিসিবি ট্রাক-সেল করতে পারলে, সত্যিকার অর্থে পণ্য-সেবা আরও বেশি দিতে পারত সরকার। দাম না বাড়িয়ে সরকার চাইলে টিসিবিকে ভর্তুকি বাড়িয়ে দিতে পারত। জনগণের অর্থ এভাবেও জনগণের সেবায় পরিণত করতে পারত। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াতে টিসিবিকে দেওয়া ভর্তুকি বাড়াতে হবে।