সড়ক-মহাসড়কে এক আতঙ্কের নাম ছদ্মবেশী ডাকাতচক্র। এর অধিকাংশ সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য, আছে পেশাদার অপরাধীও। তাদের পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মতো জ্যাকেট, হ্যান্ডকাফ, পিস্তল, ওয়াকিটকিসহ সবই আছে। দেখলে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মনে হলেও বাস্তবে তারা ভয়ংকর ডাকাত। বাসা-বাড়িসংলগ্ন কিংবা সড়কে ওতপেতে থাকে টার্গেটের আশায়। নির্ধারিত টার্গেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো চালায় অভিযান, ছিনিয়ে নেয় সর্বস্ব।
জানা যায়, ছদ্মবেশী সংঘবদ্ধ ডাকাতদল এক ভয়ংকর অপরাধীচক্র। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন অনেক ছদ্মবেশী চক্র রয়েছে। তারা ছদ্মবেশ ধারণ করে মানুষের ভয় ও আস্থাকে কাজে লাগিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। চক্রটি বেশ কিছুদিন ধরে বাসা-বাড়ি বা সড়কের বিভিন্ন স্থানে রেকি করে। পরে লুট, ছিনতাই, ডাকাতির মতো অপরাধ কর্মকাণ্ড সংঘটিত করছে। তারা সাধারণত ভুয়া সিম ব্যবহার করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে ছোট ছোট গ্রুপে কাজ করে। বর্তমানে এ ছদ্মবেশী ডাকাতচক্র সমাজে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চক্রের সদস্যদের মধ্যে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য, আছে পেশাদার অপরাধীও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অপরাধ জগতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ছদ্মবেশী অপরাধীচক্র, কখনো র্যাব, কখনো পুলিশ আবার যৌথ বাহিনীর পরিচয়ে অভিযানের নামে ডাকাতির মাধ্যমে সড়ক ও নগরজীবনে ভয় ছড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষের ভয় ও আস্থাকে কাজে লাগিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে এসব অপরাধীচক্র। এ ধরনের অপরাধ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি সড়কে বা বাসা-বাড়িতে ডাকাতদের একটি চক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে অপহরণের পর সবকিছু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি চক্র পুলিশ, র্যাব বা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় দিয়ে ভুয়া ওয়ারেন্ট হাতে নিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়ি রেকি করে রাতের আঁধারে ডাকাতি করছে। এসব চক্রে নাম লেখাচ্ছেন বিভিন্ন বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত সদস্যরা। গ্রেপ্তার এড়াতে এসব চক্রের সদস্যরা ব্যবহার করছেন বস্তির নারী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় মানুষের নামে কেনা সিম।
ছদ্মবেশী ডাকাতদলের সদস্যরা সন্ধ্যার পর বিভিন্ন সড়ক, বাসা টার্গেট করে অপারেশনাল টিমের জন্য বিভিন্ন সংকেত এঁকে দিয়ে আসে। পরে সুবিধা মতো সময়ে আভিযানিক দল টার্গেট অনুযায়ী অভিযান চালায়। লুটের পর ভাগবাটোয়ারার ক্ষেত্রে যার নামে মামলা বেশি, তাকে বেশি ভাগ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকতা জানান, ভুয়া র্যাব বা পুলিশ লেখা জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ ও পিস্তল ব্যবহার করে ছদ্মবেশী ডাকাতদল মানুষকে জিম্মি করছে। চক্রগুলো মূলত ভোরের দিকে বা রাতের অন্ধকারে প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে বা বাসায় হানা দেয়। তারা ধনাঢ্য ব্যক্তির বাসা, প্রবাস-ফেরত ব্যক্তি, স্বর্ণালংকার পরিহিত নারী ও নগদ টাকা বহনকারী গাড়ি বেশি টার্গেট করে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র, হ্যান্ডকাফ ও অন্যান্য সরঞ্জাম এমন অপরাধ কর্মকা-ে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত ২ মে রাজধানীর ডেমরায় র্যাবের পোশাক পরে হ্যান্ডকাফ, ওয়াকিটকি ও পিস্তল দেখিয়ে দীর্ঘদিন ডাকাতি করে আসা একটি চক্রের হোতাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গ্রেপ্তাররা হলেন মো. আলামিন ওরফে মোটা আলামিন ও মো. রায়হান। র্যাব বলছে, ডাকাতির প্রস্তুতির সময় ডেমরার মেন্দিপুর এলাকা থেকে আলামিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যে একই এলাকা থেকে রায়হানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, চার রাউন্ড গুলি, একটি মাইক্রোবাস, দুটি ভুয়া নাম্বার প্লেট, ছয়টি র্যাবের জ্যাকেট, দুটি হ্যান্ডকাফ, একটি ওয়াকিটকি সেট, পুলিশ লেখা স্টিকার, লেজার লাইট, সেনাবাহিনীর মাস্কসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া হ্যান্ডকাফ দুটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থানা থেকে লুট হওয়া বলে জানিয়েছে র্যাব।
গত ২৫ এপ্রিল উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে সালমান মাহবুব জয় নামে এক ব্যবসায়ীকে র্যাব পরিচয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে ৬৫ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এর সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। যাদের একজন পুলিশ থেকে চাকরিচ্যুত বলে জানা গেছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় ডিবি পরিচয়ে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে প্রায় ১৪ টন রড ডাকাতি করা হয়। র্যাব, ডিবি ও অন্য সংস্থাগুলোর নামে এ রকম ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। গত বছরের ১৮ জুলাই মতিঝিল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে সংঘবদ্ধ ডাকাতদলের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ১৩৩টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ডিএমপিতে ১২টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া এ তিন মাসে সারা দেশে দস্যুতার মামলা হয়েছে ৪৩৯টি, আর ঢাকায় তিন মাসে হয়েছে ৭৬টি।
এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পরিচয়ে সড়কে বাস ও মাইক্রোবাস থামিয়ে অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান সামগ্রী লুটের ঘটনা ঘটছে। তারা মূলত র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে থাকে। গত শনিবার এ সংঘবদ্ধ চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. আলামিন ও মো. রায়হান। এদের মধ্যে আলামিন চক্রের মূল হোতা ও রায়হান গাড়িচালক ও সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। ভুয়া র্যাব ও আসল র্যাব চেনার উপায় সম্পর্কে র্যাবের মুখপাত্র বলেন, প্রথমত, অভিযানের সময় সদস্যদের র্যাবের কটি থাকে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেকের মনোগ্রামযুক্ত আইডি কার্ড থাকে। অভিযানে গেলে র্যাব সদস্যদের পরিচয় ঠিকভাবে উপস্থাপনের নির্দেশনা আছে। সারা দেশে ছদ্মবেশী ডাকাতদলের সংখ্যা বা তালিকা প্রসঙ্গে ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, তালিকা একটা চলমান প্রক্রিয়া। সার্বক্ষণিক তালিকাগুলো হালনাগাদ করা হয়। তালিকায় নতুন করে নাম সংযোজিত হতে থাকে। আর পুরনোদের তথ্য-উপাত্ত হালনাগাদ হতে থাকে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের ডিসি এন এম নাসিরুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানান, এসব ছদ্মবেশী অপরাধীচক্র দমনে পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য বাহিনী গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম জোরদার করেছে। এসব সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।