দুই হাজার চব্বিশের জুলাই-আগস্ট প্রেক্ষাপট সৃষ্টির অধ্যায় সম্পর্কে সচেতন মানুষ-মাত্রেরই জানা। ওই অভ্যুত্থানের অংশীজনদেরই শুধু নয়, অভ্যুত্থানের দুই বছরের মধ্যেই জনপরিসরেও প্রশ্ন উঠেছে, এর কাক্সিক্ষত ফল কি রাষ্ট্র পরিচালকরা দৃশ্যমান করতে পেরেছেন? বাংলাদেশে ক্ষমতার হস্তান্তর ইতিমধ্যে বহুবার ঘটেছে, কিন্তু কোনো রূপান্তর ঘটেনি। রাষ্ট্রে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটিয়েও কেন রূপান্তর ঘটেনি, কিংবা ঘটতে পারেনি। এ নিয়ে ইতিপূর্বে বিস্তর কথা হয়েছে ও বারবার একই কথা সামনে এসেছে এবং তা হলো, বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে অবস্থা পরিবর্তনের আশা দুরাশা বৈ কিছু নয়। তবে ছাত্র-জনতার ওই অভ্যুত্থান একটি সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে, সেটি তারুণ্যের শক্তি। এমনিতেই তারুণ্য যা করতে পারে, বার্ধক্য তা করতে অপারগ। আর আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বয়স্করা যা দেওয়ার এরই মধ্য দিয়ে ফেলেছেন, তরুণরাই যদি পারে তবে নতুন কিছু দেবে। কারণ তরুণদের আছে সাহস ও সংবেদনশীলতা; বয়স বাড়লে বরং উল্টো পথ ধরে।
এটা তো অস্পষ্ট নয় যে, চব্বিশের জুলাই-আগস্টে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটেছে, কিন্তু একে সম্পূর্ণ ‘বিপ্লব’ বলা যায় না। বলা যায় না দ্বিতীয় স্বাধীনতাও। বিপ্লব একটি দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর প্রক্রিয়া, যা সমাজে আমূল পরিবর্তন আনে। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের মাধ্যমে একটি চরম কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে, যা রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি বড় ঝাঁকুনি, কিন্তু সমষ্টিগত মানুষের কাক্সিক্ষত ‘সামাজিক বিপ্লব’ বা অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত বৈষম্যের অবসান কিন্তু ঘটেনি। হ্যাঁ, তাতে বিচলিত বোধ করার কারণ আছে বৈকি। ওই অভ্যুত্থানে ডানপন্থার কেন উত্থান ঘটছে, সে কারণ দেখা দরকার। যারা ক্ষমতায় আছেন ও থাকেন, তারা সবাই ডানপন্থিই, কেউ-ই বামপন্থি নন। বামপন্থিরা ক্ষমতার রাজনৈতিক মঞ্চে অনুপস্থিত। অভ্যুত্থানে তাদের অনুসারী ছাত্ররাও ছিল; কিন্তু তারা নেতৃত্ব দিতে পারেনি। ভয়ংকর চরিত্রের একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছে। ফলে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, শূন্যতা পূরণ করবে কারা?
আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাৎক্ষণিকভাবে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল সমাজ-পরিবর্তনে বিশ্বাসী বামপন্থিদের কর্তব্য ছিল সেটি পূরণ করে বুর্জোয়াদের বিকল্প শক্তি হিসেবে দৃশ্যমান হওয়া এবং দেশবাসীকে আশান্বিত করা যে সত্যিকারের পরিবর্তন সদ্য সদ্য না ঘটলেও আগামীকাল ঘটবে। ওই কাজের জন্য আবশ্যক ছিল একটি সমাজ বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট গঠন। অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনে তারা সম্মত হলেন ঠিকই, কিন্তু দেখা গেল সেটি বিপ্লবী আন্দোলনের যুক্তফ্রন্ট না হয়ে রূপ নিয়েছে নির্বাচনী জোটে। বামপন্থিরা তৎপর হলেন বুর্জোয়াদের সঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন যে বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াই ভিন্ন অন্যকিছু নয়, এবং সেখানে যে বুর্জোয়া ভিন্ন অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সেই স্থূল বাস্তবতাটাকে বুঝবার মতো বিবেচনার অভাবের কারণে কিনা জানি না, বামপন্থি জোটের শরিকরা নিজ নিজ পরিচয়ে নির্বাচনী-যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জামানত হারানো তো সামান্য ব্যাপার, এমন করুণ সংখ্যক ভোট পেলেন যেটার গুরুভারে তারা নিজেরাই এখন বিব্রত; হয়তো লজ্জিতও, নিজেদের কাছেই।
সমাজতন্ত্রীরা বুর্জোয়াদের চাইতেও অধিক তীক্ষè বুদ্ধির অধিকারী হবেন এটাই প্রত্যাশিত, নির্বুদ্ধিতা আর যাদেরই সাজুক সমাজতন্ত্রীদের সাজে না। যাই হোক, নির্বাচনের পরে দেশের ভূমি-বন্দর, সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিতে যে জোট তারা শেষমেশ গঠন করেছেন সে জন্য তাদেরকে অভিনন্দন; এবং সামনে যেহেতু কোনো সংসদীয় নির্বাচন নেই তাই তারা আন্দোলনেই থাকবেন এমনটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক বিপ্লব সম্ভব নয়, এটা তো ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত এবং এখন বিশ^জুড়ে সত্য বলে প্রতিভাত। এমনকি অভ্যুত্থানও যে বিপ্লবী চরিত্র গ্রহণ করবে না, যদি না লক্ষ্যটা হয় সমাজবিপ্লবী, এটাও তো খুবই মোটা দাগে সত্য। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি প্রায়ই উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হয়, হতে থাকে। সার্বভৌমত্বের একটা পরীক্ষা ঘটে সীমান্তে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত; ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভারতের সহায়তা ছিল যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি ফলপ্রসূ। কিন্তু সীমান্তে পরিস্থিতি নিয়ে উৎকণ্ঠা কমছে না। বাংলাদেশের নাগরিক বলে অভিযুক্ত করে ভারত থেকে মানুষকে সীমান্ত দিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এবং জোর করে ঠেলে পাঠানোর অমানবিক তৎপরতা সমানে চলছে। এ ব্যাপারে ভারতের বর্তমান সরকারের উৎসাহ অত্যন্ত প্রবল, মিয়ানমার যেমনটা করছে পারলে তেমনটাই করে। উদ্দেশ্য নিজ দেশের মানুষের শ্রেণি-সচেতনতা, গরিব মানুষের দুর্দশাবৃদ্ধি, শিক্ষিত মানুষের বেকারত্ব, কৃষক-বিক্ষোভ এ রকমের নানা রকমের সমস্যাকে ধামাচাপা দেওয়া।
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল যে ভৌগোলিক সীমান্তে পরীক্ষিত হয় তা তো নয়, প্রতিনিয়ত তার পরীক্ষা চলে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাতেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যে অত্যন্ত অসম বাণিজ্যচুক্তিটি স্বাক্ষর করে রেখে গেছে অন্য অনেক ক্ষতির সঙ্গে সেটি যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপরও হস্তক্ষেপ করবে সেটা মোটেই অপরিষ্কার নয়। প্রতিবাদ হচ্ছে; বামপন্থিরা করছেন, দেশপ্রেমিক সংগঠনগুলোও করছে, কিন্তু এ ব্যাপারে জাতীয় সংসদে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। সরকারি দল নিশ্চুপ, বিরোধী দলও সাড়া-শব্দহীন। প্রতিবাদ তো নয়ই, এমনকি বৈদেশিক চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ সংসদে উপস্থাপনের যে সাংবিধানিক আবশ্যিকতা রয়েছে সেটি মান্য করার দাবিটুকুও সংসদীয় দুই মহলের কোনোটির পক্ষ থেকেই তোলা হয়নি। তাতে সেই প্রমাণিত সত্যটিরই নবতর পরিচয় পাওয়া যায় যে, দুই পক্ষের ভেতর আত্মীয়তাটা অতিঘনিষ্ঠ ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের এবং তাদের যে ঝগড়া সেটাও ভ্রাতৃকলহের অধিক কিছু নয়।
বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে এবং সেখানেও যেমনটা ঘটা স্বাভাবিক তেমনটাই ঘটেছে। বুর্জোয়ারাই জিতেছে। যারা সরকার গঠন করেছেন এবং যারা বিরোধী দলের আসনে আসীন হয়েছেন তারা কিছুদিন আগেও এক সঙ্গেই ছিলেন, রীতিমতো জোট বেঁধে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা তখন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগ এখন নেই, তাই লড়াইটা বেধেছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের। দুটিই বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক দল একটির পরিচিতি উদারনীতিক হিসেবে, অপরটি ঘোষিত রূপেই কট্টর দক্ষিণপন্থি; তফাত ওইটুকুই; তার বাইরে তারা উভয়েই সম্পদের ব্যক্তিমালিকানার তথা পুঁজিবাদেরই সমর্থক এবং সামাজিক মালিকানার ঘোরতর বিরোধী। এক কথায় বলতে গেলে, উভয়েই পুঁজিবাদী উন্নয়নের আদর্শে দীক্ষিত, যে কারণে তাদের পক্ষে জোট বাঁধা কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা যে একটি রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হবে সেটা তাদের আচরণই বলে দিচ্ছিল। সেটি তারা গঠন করেছেনও। ওই তরুণদের আওয়াজ ছিল নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েম করার, রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন সব সংস্কার নিয়ে আনবার যেগুলো হবে রীতিমতো বৈপ্লবিক। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তাদের আস্ফালিত বন্দোবস্তটা দাঁড়িয়েছে অতি পুরনো জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধা এবং তাদের সংস্কারসূচি যে জামায়াতের অনুমোদনের বাইরে যাবে না সেটাও ধারণার বাইরে ছিল না। এখন এনসিপির সঙ্গে বিএনপির দেশের নানা জায়গায় বিরোধ-সংঘাতের চিত্র ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি হয়। বাণিজ্যি চুক্তিতে বাণিজ্যের কথাই বলা হয়েছে, কিন্তু অসম বাণিজ্য যে কী বস্তু সেটা তো আমরা উপমহাদেশের মানুষেরা ইংরেজ বণিকদের আগমনের পরেই টের পেয়েছিলাম। ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য দিয়েই শুরু করে এবং বাণিজ্যপথেই আস্ত ও মস্ত একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। আমেরিকা পুরনো পদ্ধতি শারীরিকভাবে আসবে না, কিন্তু বাণিজ্য চুক্তির যেসব শর্ত বাংলাদেশকে মানতে বাধ্য করবে তাতে দ্বিপাক্ষিকতা নগণ্য, সমস্তটাই একপাক্ষিক। দেশের অল্প ক্ষেত্রেই থাকবে যেখানে এই অন্যায় চুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। বলাই বাহুল্য সর্বাধিক ক্ষতিটা হবে মেহনতি মানুষদের। কিন্তু তাদের হয়ে কাজ করার যারা দাবিদার সেই সমস্ত সংগঠনের পক্ষ থেকে তো কোনো আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না। ট্রেড ইউনিয়নগুলো চুপচাপ, এনজিওদের তো কথা বলার কথাই নয়।
বাস্তবতা হলো, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে দেশে রাজনৈতিক শক্তির পরিবর্তন ঘটলেও মানুষের আকাক্সিক্ষত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন হয়নি। দেশবাসী যে প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির খোঁজ করছে, তা অর্জিত হয়নি। শুধু শাসকের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রকাঠামো ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আগের মতোই বহাল রয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারেরা যা করে থাকে, আমাদের বিগত সরকারও তেমনটিই করেছে। কিছু মানুষকে টেনে নিয়েছে কাছে; লুণ্ঠনের সুযোগ করে দিয়ে এবং প্রলোভন দেখিয়ে। বাংলাদেশের যে সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটল, সেটি পুঁজিবাদীই শুধু নয়, পরিণত হয়েছিল পুরোপুরি ফ্যাসিবাদীতে। আগের দুটি অভ্যুত্থানের সঙ্গে ওই অভ্যুত্থানের চরিত্রেও একটি পার্থক্য রয়েছে। সেটি হলো এই যে তাতে জনতার অংশগ্রহণ ছিল আগের তুলনায় অনেক বেশি। তরুণদের নিজস্ব সাহসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাদের প্রতি জনগণের সহানুভূতি ও আস্থা। বড় বড় রাজনৈতিক নেতাকে মানুষ দেখেছে, তাদের ওপর আস্থা তো নয়ই, অনাস্থাই জমে উঠেছে ভেতরে ভেতরে। মনে হচ্ছে, অনাস্থাটা বাড়তে পারে। কিন্তু দেশের মানুষ শান্তি চায়। চায় ব্যবস্থার পরিবর্তন। বৈষম্যের নিরসন। অধিকার প্রতিষ্ঠা। আন্দোলন, অভ্যুত্থান বারংবার হয়েছে কিন্তু মানুষের মুক্তি নিশ্চিত হলো না।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
