দেশে আগের তুলনায় কয়েকগুণ নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে, নার্সের সংখ্যা বেড়েছে, পদমর্যাদাও বেড়েছে কিন্তু বাড়েনি সেবার মান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী নার্সের যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি অভাব রয়েছে দক্ষ নার্সেরও। একদিকে এই সংকট, অন্যদিকে রয়েছে নানা অব্যবস্থাপনা। রয়েছে রোগীদের সঙ্গে নার্সদের আচরণ নিয়েও বিস্তর অভিযোগ।
এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নার্স দিবস। প্রতি বছর ১২ মে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের নার্স। আমাদের ভবিষ্যৎ। ক্ষমতায়িত নার্সরাই জীবন বাঁচান’ এই প্রতিপাদ্যটির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে নার্সদের ক্ষমতায়ন নিয়ে সচেতনতা ও বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে নার্সরা ক্ষমতায়িত তথা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত থাকলে স্বাস্থ্যসেবায় উন্নত পলিসি গঠনে সহায়ক হবে এবং তা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে পারবে, যা স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এমনটাই মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ নার্সিং সেবা। একজন রোগীর চিকিৎসা ও সেবার বড় অংশই নির্ভর করে দক্ষ নার্সের ওপর। অথচ দেশে এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ নার্স তৈরি হচ্ছে না। সরকারি ও বেসরকারি নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত প্রশিক্ষণের অভাব, শিক্ষক সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব, বদলি বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় পুরো খাতই যেন এক অদৃশ্য সংকটে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালগুলোতে নার্স থাকলেও অনেকের নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কিংবা রোগী ব্যবস্থাপনার আধুনিক অভিজ্ঞতা। একটা অংশ আবার রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে কর্মস্থলে ফাঁকি দিয়ে থাকেন। নিজে কাজ না করে আয়া বুয়া ওয়ার্ড বয় দিয়েও কেউ কেউ কাজ করান। আলাদা অধিদপ্তর হওয়ায় চিকিৎসক নার্সদের মধ্যেও নেই সমন্বয়। ফলে চিকিৎসাসেবার মানও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে একটি তাদের প্রতি কিছু নার্সের আন্তরিকতার ঘাটতি থাকা।
দেশে ২০১০-২০ সাল এই ১০ বছরে নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩৫৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সালে নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট ছিল মোট ৮৭টি। নার্সিং কলেজ ছিল ৩০টি, নার্সিং ইনস্টিটিউট ৫৭টি। ২০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯৭টিতে। নার্সিং কলেজ ১৭৪টি এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট ২২৩টি। ২০১০ থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়েছে ৪২৪ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা অত্যন্ত কম। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় ল্যাব নেই, নেই পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা না দিয়েই শুধু পরীক্ষামুখী পাঠদান চলছে। রোগীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার আচরণ করতে হবে তা নিয়ে খুব একটা পড়ানো হয় না। এতে সনদধারী নার্স তৈরি হলেও গড়ে উঠছে না দক্ষ জনবল।
সরকারি ও বেসরকারি হেলথ পলিসি গঠনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নার্সদের অংশগ্রহণ প্রায় শূন্যের কোঠায়। অথচ দেশের স্বাস্থ্য খাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নার্সরা সম্মুখ সারিতে অবস্থান করে। তাই দেশের হেলথ পলিসি গঠনে নার্সদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নার্স দিবসের অন্যতম দাবি। সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটস (এসএনএসআর)-এর মহাসচিব সাব্বির মাহমুদ তিহান বলেন, দেশে নার্সদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা না গেলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। নার্সদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করে রোগীবান্ধব হেলথ পলিসি গঠনের দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে মহাপরিচালক ও পরিচালকসহ পদের ৯১ শতাংশ পদেই নিয়োগ পাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারসহ নার্সিং পেশার বাইরের লোকজন। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান নার্সিং কাউন্সিলও দখলে প্রশাসন ক্যাডারদের। নার্সদের পেশাগত দিক দেখভালের পরিবর্তে তারা পেশাগত সনদ দিচ্ছেন। নিবন্ধন দিচ্ছেন বেসরকারি নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটের। এসব অনুমোদনে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
রোগীর সঠিক সেবা নিশ্চিত করতে একজন চিকিৎসকের পাশাপাশি তিনজন নিবন্ধিত নার্স প্রয়োজন। বাংলাদেশে ১ লাখ ৪০ হাজার চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স প্রয়োজন ৪ লাখ ২০ হাজার। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার নিবন্ধিত নার্স রয়েছে। এই হিসাবে দেশে নার্স সংকট প্রায় ৩ লাখ। নার্স সংকটে রোগীরা পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছেন না। রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার অন্যতম কারণও এটা বলে দাবি করেন সাব্বির মাহমুদ তিহান।
সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটস (এসএনএসআর)-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সরাসরি রোগীর সেবাদানকারী প্রায় ৯৯ শতাংশ নার্স মনে করছেন তারা কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতায়নের পরিবর্তে অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৯৪ শতাংশ নার্স মানসিক বিষণœœতায় ভুগছেন। পাশাপাশি অধিক দায়িত্ব ও কাজের চাপ কিন্তু কম বেতনে কাজ করছেন প্রায় ৯২ শতাংশ নার্স।
এদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে কর্মরত নার্সদের বদলি নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। অভিযোগ উঠেছে, পছন্দের কর্মস্থলে যেতে কিংবা শহরাঞ্চলে পদায়ন পেতে গোপনে চলছে বদলি বাণিজ্য। প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ কিংবা আর্থিক লেনদেন ছাড়া অনেক নার্স বছরের পর বছর প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়ে থাকছেন। আবার কেউ কেউ অল্প সময়েই একাধিকবার বদলি সুবিধা পাচ্ছেন। এই খাতে সবচেয়ে দুনীতি হয় বদলিতে, যা ওপেন সিক্রেট। মন্ত্রণালয় এবং নার্সিং অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নার্স নেতারা মিলেমিশে বদলি বাণিজ্য করে থাকেন। বছরে কয়েকশ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় শুধু বদলিতে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স জানান, ‘দূরবর্তী এলাকায় কাজ করেও অনেক সময় কোনো মূল্যায়ন পাওয়া যায় না। অন্যদিকে টাকার বিনিময়ে অনেকে রাজধানী বা বড় শহরে বদলি হয়ে আসে। এতে অনেকের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।’
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, দক্ষ নার্সের সংখ্যা কম। তাদের আরও দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এজন্য নার্সিং কাউন্সিলের আরও সোচ্চার হওয়া দরকার। নার্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো যেন আরও মানসম্মত করা হয়। শুধু প্রতিষ্ঠান বাড়লে হবে না। মানও বাড়াতে হবে।
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের সভাপতি ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, বিভিন্ন দেশে বিশেষজ্ঞ নার্স আছে। আমাদের দেশে সেরকম নেই। যেমন কেউ বক্ষব্যাধির ওপর বিশেষজ্ঞ, কেউ কিডনির ওপর বিশেষজ্ঞ। তারা ওই ধরনের রোগী ম্যানেজমেন্ট করে থাকেন, আমাদের দেশে সেরকম নেই। কোনো কোনো নার্সের ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়। রোগীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হবে এগুলো সেভাবে পড়ানো হয় না। এ বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়াতে হবে। কারিকুলাম ঠিক করতে হবে। ডাক্তার হিসেবে নার্সের রেশিও কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যে প্রশিক্ষণগুলো দেওয়া হয় সেগুলো আরও ভালো করতে হবে। এ ছাড়া বদলিতে যে নৈরাজ্যের কথা শোনা যায় এটা দূর করতে হবে।