হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না

মাতৃগর্ভে থাকা শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ রোধে উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছে, গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ ও তা প্রকাশ করা অবৈধ, বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক। এ সংক্রান্ত রুল নিষ্পত্তি করে দুই বছরের বেশি সময় আগে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের ৯ পৃষ্ঠার রায় গতকাল সোমবার হাতে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

মাতৃগর্ভে থাকা শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ বন্ধে ২০২০ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। আবেদনের যুক্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে কোনো গর্ভবতী মায়ের কন্যাসন্তান হওয়ার খবর শুনে একশ্রেণির পরিবার বিষয়টি নেতিবাচকভাবে দেখে। কোনো কারণে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার কন্যাসন্তানের খবর শোনার পর ওই গর্ভবতী মায়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। এতে করে গর্ভবতীর যেমন সমস্যা হয়, তেমনি অনাগত কন্যাসন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। ভারত, চীন, নেপাল, ভিয়েতনাম ও ইউরোপের অনেক দেশে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কারণ ছাড়া ভ্রূণের লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন প্রশ্নে স্বাস্থ্যসচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্দেশ্যে রুল দেয়।

আইনজীবী জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা করেছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি, সংগঠন, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবরেটরি, নার্সিং হোম কোনো লেখা, চিহ্ন বা অন্য কোনো উপায়ে মাতৃগর্ভে থাকা শিশুর লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না।  

অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান হাইকোর্টের রায়ের বরাত দিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গর্ভের শিশুর লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ করতে সক্ষম এমন ব্যক্তি বা চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান তাদের সক্ষমতার বিষয়টি প্রকাশ করবে না। এ ছাড়া যেখানে গর্ভের শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ পরীক্ষা হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানে আসা গর্ভবতী নারীর তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যভা-ারে সংরক্ষণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন, অনুযায়ী চিকিৎসকদের নৈতিক মানদ- মেনে চলা বাধ্যতামূলক। চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া শুধু লিঙ্গপরিচয়ের তথ্য দেওয়া চিকিৎসকদের জন্য একটি পেশাগত অসদাচরণ বলে রায়ে বলা হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও অন্যান্য ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে গর্ভের সন্তানের লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে কন্যাভ্রণ হত্যা, লিঙ্গ ভারসাম্যহীনতা এবং নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এটি অনাগত শিশু ও মায়ের জীবনের অধিকার এবং মর্যাদার সরাসরি লঙ্ঘন।’

হাইকোর্ট বলেছে, ‘অনাগত শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ জন্মের আগেই বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। কেবল লিঙ্গের ভিত্তিতে জীবন ধ্বংস করার সুযোগ তৈরি করা সুস্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক।’

রায়ে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) এবং সিডও সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ ও এর মাধ্যমে বৈষম্য সৃষ্টি করা এসব আন্তর্জাতিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ‘আদালত এ মামলাটি কন্টিনিউয়াস ম্যান্ডামাস অর্থাৎ চলমান রেখেছেন যাতে, হাইকোর্টের এ রায়ের ব্যত্যয় হলে বিষয়টি দৃষ্টিগোচরে আনা যায়।’