গ্রামীণ ও স্থানীয় শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প খাতে সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গঠনে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে এমন বিভিন্ন তহবিল গঠন করা হলেও বিতরণ প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে তহবিলের অর্থ মাঠপর্যায়ে পৌঁছায় না, অব্যবহৃত থেকে যায়। বাংলাদেশ ব্যংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি আবেদন যাচাই-বাছাই, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং তহবিল ব্যবহারের ওপর নিবিড় তদারকি করা হবে।
জানা গেছে, গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত ৫ হাজার কোটি টাকার ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ থেকে গ্রামীণ ও স্থানীয় শিল্পের উন্নয়নে আলাদাভাবে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালার আওতায় পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানি এবং দেশীয়ভাবে উৎপাদিত গ্রিন প্রযুক্তি ক্রয়ের বিপরীতে এই অর্থায়ন সুবিধা দেওয়া হবে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, জ¦ালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ উন্নয়নের মতো খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মাত্র ১ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী ঋণের মেয়াদ হবে ২ থেকে ৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা রাখা হয়েছে।
একজন উদ্যোক্তা এই তহবিলের আওতায় সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। মোট আমদানি বা যন্ত্রপাতি ক্রয়মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ থাকবে।
তবে ঋণ সুবিধা পেতে উদ্যোক্তাদের কিছু শর্তও মানতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের অন্তত ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস, যেমন সৌরবিদ্যুৎ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ তহবিলের আওতায় কোনো সুবিধা পাবে না।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংক এ তহবিলের আওতায় ঋণ বিতরণ করতে পারবে। তবে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের নিচে থাকতে হবে। যেসব ব্যাংক ইতিমধ্যে ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’-এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি সম্পন্ন করেছে, তাদের নতুন করে চুক্তি করতে হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই তহবিল গ্রামীণ শিল্প খাতে সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমাতে, জ¦ালানি দক্ষতা উন্নত করতে এবং স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ প্রসঙ্গে জলবায়ু অর্থায়ন ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রামীণ শিল্প খাতের সবুজ রূপান্তরে বাংলাদেশ ব্যাংক অতীতেও বিভিন্ন তহবিল গঠন করেছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কার্যকর ও সহজ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ব্যাংক অতিরিক্ত কাগজপত্র, জটিল শর্ত ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ফলে অনেক সময় বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তহবিলের অর্থ মাঠপর্যায়ে পৌঁছায় না কিংবা অব্যবহৃত থেকে যায়।’
তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত ও সহজভাবে অর্থ পৌঁছে দিতে এনজিওভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। কারণ এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ছাড়া রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে এসএমই খাতকে আরও সম্পৃক্ত করা গেলে উদ্যোগটি বেশি কার্যকর হতে পারত। তার মতে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বিত ও বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে শুধু তহবিল গঠন করে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া সম্ভব হবে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে অর্থায়নের আওতায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ঋণ বিতরণ করবে। ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি আবেদন যাচাই-বাছাই, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং তহবিল ব্যবহারের ওপর নিবিড় তদারকি করা হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম, পক্ষপাত বা কাগুজে প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার সুযোগ যাতে না থাকে, সে জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি তহবিলের অর্থ প্রকৃত উৎপাদনমুখী ও পরিবেশবান্ধব খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’
এই তহবিলের মাধ্যমে গ্রামীণ শিল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই শিল্পায়নকে উৎসাহিত করা হবে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, কুটির শিল্প এবং সবুজ প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এ তহবিল থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুবিধা পাবেন বলে জানান আরিফ হোসেন খান।