গল্পটা খুব সাধারণ। ক্লাস নিতে গিয়ে প্রায়ই দেখি, ছাত্ররা আজকাল আর খবরের কাগজ খুলে খবর খোঁজে না খবরই তাদের খুঁজে নেয়। ক্লাস শুরুর আগে কেউ টিকটক স্ক্রল করছে, কেউ ফেসবুক রিলে ডুবে, কেউ ইউটিউব শর্টসে। মাঝেমধ্যে একজন আরেকজনকে বলে ওঠে, ‘দোস্ত, এই ভিডিওটা দেখছস?’ তারপর আবার সবাই ফিরে যায় নিজ নিজ স্ক্রিনে। একই বেঞ্চে বসেও যেন তারা, আলাদা আলাদা জগতে বাস করছে। আমি চল্লিশ পেরুনো এক শিক্ষক। মাঝে মাঝে ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, এরা যেন অন্য এক সময়ের মানুষ স্ক্রিনের আলোয় তৈরি এক ‘আলোকিত’ নতুন প্রজন্ম। আমরা যারা নন-অ্যান্ড্রয়েড যুগে বড় হয়েছি, দুপুর কাটাতে পারতাম বই, মাঠ কিংবা আড্ডায়; এদের কাছে ওসব এখন প্রায় লোককথার মতো শোনায়। আমাদের সময়কার খবরের কাগজ সকালে দরজা গলিয়ে আসত। এখন খবর আসে মোবাইলের নোটিফিকেশনে। বাংলাদেশে শুধু নয়, পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই এখন একই বাস্তবতা। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট বলছে, তরুণদের বড় অংশ এখন সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের আগে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে খবর পায়। বাংলাদেশেও ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক এখন কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এগুলো হয়ে উঠেছে তথ্য, মতামত ও রাজনৈতিক আবেগ তৈরির প্রধান জায়গা।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ‘যা ভাইরাল, তাই দৃশ্যমান’ আর অনেক সময় দৃশ্যমানতাই সত্যের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এই জায়গাটিই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগে সম্পাদক ঠিক করতেন, কোন খবর গুরুত্বপূর্ণ। এখন সেই কাজটা করছে অ্যালগরিদম। ফেসবুকের নিউজফিড, ইউটিউবের রিকমেন্ডেশন সিস্টেম বা টিকটকের For You Page অদৃশ্যভাবে ঠিক করে দিচ্ছে আমরা কী দেখব, কী নিয়ে হাসব, কী নিয়ে রাগ করব, এমনকি কোন বিষয়ে ক্ষুব্ধ হব। আমরা ভাবি ‘আমরা তথ্য খুঁজছি’; বাস্তবে তথ্যই আমাদের খুঁজে নিচ্ছে। মিডিয়া স্টাডিজে একে বলা হয়, অ্যাটেনশন ইকোনমি বা মনোযোগের অর্থনীতি। এখানে মানুষের সময়টাই সবচেয়ে বড় পণ্য। আপনি যত বেশি স্ক্রিনে থাকবেন, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখবেন, তত বেশি ডেটা তৈরি করবেন। ফলে হাজারো অ্যাপ, নোটিফিকেশন, রিল, ভাইরাল ভিডিও আমাদের মনোযোগ দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে কানাডীয় দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহানের বিখ্যাত ধারণা ‘দি মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ’ নতুন অর্থ পায়। ম্যাকলুহান বলেছিলেন, কেবল বার্তা নয় মাধ্যম নিজেও সমাজকে বদলে দেয়। আজকের সোশ্যাল মিডিয়া সেটির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। টিকটকের শর্ট ভিডিও ফরম্যাট শুধু বিনোদনের ধরন বদলায়নি; এটি মানুষের মনোযোগের ধরনও বদলে দিয়েছে। দীর্ঘ বিশ্লেষণের বদলে এখন দ্রুত প্রতিক্রিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সমাজ ধীরে ধীরে ‘ডিপ থিংকিং’ থেকে ‘ইনস্ট্যান্ট রিয়েকশন’-এর দিকে সরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল বাস্তবতায় এর প্রভাব খুব স্পষ্ট। ধরুন, একটি ভিডিও ভাইরাল হলো কোনো রিকশাচালকের কান্না, কোনো শিক্ষার্থীর প্রতিবাদ, কিংবা কোনো অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত মুহূর্ত। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি লাখো মানুষের টাইমলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা ঘটনার প্রেক্ষাপট জানার আগেই আবেগে প্রতিক্রিয়া জানাই। কমেন্ট করি, শেয়ার করি, ক্ষুব্ধ হই, বিচার করে ফেলি। পরে সত্যি বেরোলেও তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। ভাইরাল সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই এটি মানুষের আবেগকে চিন্তার আগেই সক্রিয় করে। যোগাযোগবিদ্যার ভাষায়, এটি কেবল তথ্যপ্রবাহ নয়; এটি আবেগপ্রবাহও। সোশ্যাল অ্যামিফ্লিকেশন অব রিস্ক ফ্রেমওয়ার্ক (এসএআরএফ) নামে একটি তত্ত্ব আছে, যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে কোনো ছোট ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত হয়ে বিশাল সামাজিক অভিঘাতে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই তত্ত্ব খুবই প্রাসঙ্গিক। একটি অস্পষ্ট ভিডিও, একটি কাটা স্ক্রিনশট, কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ ক্যাপশন মুহূর্তেই সেটিকে ‘জাতীয় সংকট’ বানিয়ে ফেলতে পারে। ফেসবুক গ্রুপ, ইনফ্লুয়েন্সার পেজ, ইউটিউব থাম্বনেইল, টিকটকের শর্ট ভিডিও সবকিছু যেন এখন এক ধরনের ‘amplification station ’। এগুলো শুধু তথ্য ছড়ায় না; তথ্যকে আবেগে রূপ দেয়। ফলে ভাইরাল হওয়া মানেই সত্য নয়; অনেক সময় এটি কেবল আবেগের জয়। এই জায়গায় এসে জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাসের জনপরিসর তত্ত্বও নতুনভাবে ভাবতে হয়। হাবারমাস মনে করতেন, গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন এমন একটি জনপরিসর, যেখানে মানুষ যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে মত গঠন করবে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেই জনপরিসর ক্রমশ অনলাইনভিত্তিক আবেগনির্ভর হয়ে উঠছে। অ্যালগরিদম যুক্তির চেয়ে উত্তেজনাকে বেশি পুরস্কৃত করে। ফলে বিতর্কের জায়গায় আসে ট্রল, সংলাপের জায়গায় আসে হ্যাশট্যাগ যুদ্ধ। আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের মনস্তত্ত্বে। আগে মানুষ স্বীকৃতি খুঁজত পরিবারে, সমাজে, কর্মে। এখন সেই স্বীকৃতির বড় অংশ নির্ভর করছে অনলাইন পরিসরে; লাইক, শেয়ার ও ভিউয়ের ওপর। হিউম্যান কমিউনিকেশন বা মানবীয় যোগাযোগবিদ্যায় একে বলা যায় ভ্যালিডেশন ইমপালস বা অন্যের চোখে দৃশ্যমান হওয়ার আকাক্সক্ষা। ভাইরাল হওয়া মানে এখন শুধু জনপ্রিয় হওয়া নয়; এটি এক ধরনের ডিজিটাল অস্তিত্বের প্রমাণ। বিশেষ করে তরুণদের জন্য এটি আরও তীব্র। একটি রিল ভাইরাল হওয়া, কয়েক হাজার রিঅ্যাকশন পাওয়া কিংবা ট্রেন্ডিংয়ে উঠে আসা এ সবই এখন আত্মমূল্যায়নের অংশ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে সমাজবিজ্ঞানী এরভিং গফম্যানের ‘প্রেজেন্টেশন অব সেলফ’ তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ। গফম্যান বলেছিলেন, মানুষ সমাজে নিজেকে এক ধরনের মঞ্চে উপস্থাপন করে। সোশ্যাল মিডিয়া সেই মঞ্চকে অসীম করে দিয়েছে। এখন প্রত্যেকেই নিজের জীবনের সম্পাদক, পরিচালক ও অভিনেতা। কে কোথায় ঘুরতে গেল, কী খেল, কার সঙ্গে সম্পর্ক সবকিছুই এখন ডিজিটাল পারফরম্যান্সের অংশ। ফলে ‘বাস্তব জীবন’ আর ‘ডিজিটাল জীবন’ এর সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অনেক তরুণের কাছে এখন কোনো অভিজ্ঞতার চেয়ে সেই অভিজ্ঞতার পোস্টটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণের আনন্দের চেয়ে ইনস্টাগ্রাম স্টোরি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতিবাদের চেয়ে প্রতিবাদের ছবি বেশি দৃশ্যমান। এখানে আবার ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলসের ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি’ ধারণা ফিরে আসে। ক্যাস্টেলস বলেছিলেন, আধুনিক সমাজে ক্ষমতা তথ্য নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। আজকের বাংলাদেশে সেটি খুব স্পষ্ট। আগে রাজনৈতিক দল জনমত গঠন করত সভা-সমাবেশে; এখন তা হয় ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব টকশো ও ভাইরাল ক্লিপে। আগে সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরি হতো বই, চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনের মাধ্যমে; এখন তা তৈরি হয় মিম, রিল ও ট্রেন্ডিং অডিও দিয়ে। এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো অ্যালগারিদমিক গেটকিপিং।
আগে সংবাদপত্রের সম্পাদক গেটকিপার ছিলেন। এখন সেই ভূমিকা নিয়েছে মেশিন। কোন পোস্ট বেশি মানুষ দেখবে, কোন ভিডিও চাপা পড়ে যাবে সেটি নির্ধারণ করছে অ্যালগরিদম। ফলে সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ও শিল্প সবকিছুর ওপর তৈরি হয়েছে নতুন চাপ : দ্রুত হতে হবে, আবেগি হতে হবে, ভাইরাল হতে হবে। এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি সম্ভবত মনোযোগের ওপর। নিকোলাস কার তার ‘দ্যা শ্যালোস’ (The Shallows) বইয়ে লিখেছিলেন, ইন্টারনেট মানুষের চিন্তার গভীরতাকে খণ্ডিত করে দিচ্ছে। আজকের তরুণদের দিকে তাকালে সেটি আরও স্পষ্ট। দীর্ঘ লেখাপড়ার ধৈর্য কমছে, মনোযোগের স্থায়িত্ব কমছে, দ্রুত উত্তেজনা ছাড়া অনেক কিছুই ‘বোরিং’ মনে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে এই পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখি। ছাত্ররা প্রায়ই বলে, ‘স্যার, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম’ তখন আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কোথায় দেখলে? কে পোস্ট করেছে?’ কারণ এখন তথ্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তথ্যের উৎস যাচাই করা। মিডিয়া লিটারেসি বা ডিজিটাল সাক্ষরতা তাই এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিক দক্ষতা। তবে ভাইরালের দুনিয়া পুরোপুরি অন্ধকারও নয়। বাংলাদেশে বহু সামাজিক উদ্যোগ ভাইরাল হয়ে মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। কোনো অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার টাকা উঠেছে ফেসবুক ক্যাম্পেইনে, কোনো অন্যায়ের ভিডিও ভাইরাল হয়ে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছে। বিশ্বজুড়েও অত্যাচার, যুদ্ধ বা বৈষম্যের দৃশ্য সাধারণ মানুষের মোবাইল থেকেই প্রকাশ্যে এসেছে। প্রযুক্তি এখানে মুক্তির পথও দেখিয়েছে। সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আমরা ধীরে ধীরে ‘জনপ্রিয়’ আর ‘সত্য’ এই দুই জিনিসকে এক করে ফেলছি। ভাইরাল হলেই সেটি যেন গুরুত্বপূর্ণ, বেশি শেয়ার হলেই যেন সেটি বিশ্বাসযোগ্য। ফলে অ্যালগরিদম এখন শুধু তথ্য নিয়ন্ত্রণ করছে না; আমাদের মনোযোগ, আবেগ এবং বাস্তবতাবোধও নিয়ন্ত্রণ করছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই প্রযুক্তির নয়, মানুষের। আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করবে? তরুণ প্রজন্ম কি স্ক্রল থামিয়ে একটু ধীরে ভাবতে শিখবে? নাকি আমরা সবাই ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে ঢুকে পড়ব, যেখানে সত্যের চেয়ে দ্রুততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? এর উত্তর আমি জানি না।
প্রশ্ন তোলাটা জরুরি মনে করে এই লেখার অবতারণা। কারণ ভাইরালের এই দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো তথ্যের নয় মানুষের। দশ বছর আগেও ‘ভাইরাল’ শব্দটি আমাদের দৈনন্দিন ভাষার অংশ ছিল না। এখন একটি দিনও কেটে যায় না এই শব্দটি ছাড়া। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা দেখি কেউ রাতারাতি তারকা, কেউ এক ভিডিওতে খলনায়ক, কেউ আবার কয়েক সেকেন্ডের আবেগে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মনে হয়, পৃথিবী এখন আর ধীরে চলে না; এটি চলে শেয়ার, রিল আর অ্যালগরিদমের গতিতে। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। তাদের জীবনের বড় অংশ এখন স্ক্রিনের ভেতরে। বন্ধুত্ব থেকে রাজনীতি, প্রেম থেকে প্রতিবাদ সবকিছুই ক্রমশ ডিজিটাল হয়ে উঠছে। ফলে বাস্তব জীবন আর ভার্চুয়াল জীবনের সীমারেখাও ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। নতুন বাস্তবতায় মানুষ শুধু তথ্য গ্রহণ করছে না; তথ্যের দ্বারাই গঠিতও হচ্ছে। আমরা কী দেখব, কোন বিষয়ে উত্তেজিত হব, কী নিয়ে হাসব কিংবা ক্ষুব্ধ হব এসবের বড় অংশই এখন নির্ধারণ করছে অদৃশ্য অ্যালগরিদম। আর সেই কারণেই আজকের বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু রাজনীতি বা সমাজ নয়, বুঝতে হবে ভাইরাল সংস্কৃতি, সোশ্যাল মিডিয়া এবং নেটাগরিকের নতুন জীবনও।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
rajibnandy@cu.ac.bd