মধ্যবিত্তের পকেটে বিদ্যুতের ছুরি

বিদ্যুৎ বিতরণের ধাপ বদল করে মধ্যবিত্তের পকেট কাটতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ। ভর্তুকি সামলাতে বিদ্যুৎ বিতরণের শুরুর ধাপটি বদলে দেওয়ার আবদার করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এতে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় হবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) যে সমিতিগুলো শহর ও শিল্পাঞ্চল-লাগোয়া, তারা তাদের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দামে পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে। এতে শ্রমিকদের বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবে।

এখন বিদ্যুৎ বিতরণের মোট ছয়টি ধাপ রয়েছে।

তৃণমূলের গ্রাহকরা ০-৫০ ইউনিট ব্যবহার করেন। এ ধাপে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ বিতরণ করে। তবে কোনো গ্রাহকের মাসিক ব্যবহার ৫০ ইউনিট ছাড়ালে তিনি উঠে আসেন মধ্যবিত্ত গ্রাহকের তালিকায়। বিদ্যুৎ ব্যবহারের সাধারণ যন্ত্রাংশ অর্থাৎ লাইট-ফ্যানের সঙ্গে একটি ছোট রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ ব্যবহার করলেই ৫০ ইউনিটের সীমা অতিক্রম করে। তখন ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ আর থাকে না। মানুষের জীবনমান বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ রয়েছে এমন ঘরে একটি ছোট ফ্রিজ থাকা এখন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

এর পরের দুই ধাপ শূন্য থেকে ৭৫ এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট মধ্যবিত্তের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধাপ হিসেবে বিবেচিত। এ দুই ধাপে গ্রাহকসংখ্যা সর্বোচ্চ। কোনো বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির বেশিরভাগ গ্রাহকই এ দুই ধাপের গ্রাহক। এ দুই ধাপের বাইরে ২০১-৩০০, ৩০১-৪০০ ইউনিট বিদ্যুতের ব্যবহারকারীরা উচ্চ মধ্যবিত্ত হিসেবে বিবেচিত। এর পরের ধাপ ৪০১-৬০০ এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা উচ্চবিত্ত গ্রাহক। উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো মাথাব্যথা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো এলাকায় বসবাসকারী মানুষের বিদ্যুতের দামের বিষয়ে তেমন মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। কারণ লোডশেডিং হলে এসব এলাকার মানুষ উচ্চমূল্যের ডিজেলে নিজস্ব জেনারেটরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন। ডিজেল জেনারেটরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন কমপক্ষে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা খরচ হয়।

যেখানে পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে : বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড তাদের খুচরা দাম বাড়ানোর আবেদনে বলেছে, বিদ্যমান আবাসিক ট্যারিফের দ্বিতীয় ধাপ ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের পরিবর্তে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট করা হলে খুচরা পর্যায়ে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি ১২ লাখ টাকা আয় বাড়বে। পাইকারি বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের অর্থ ঘাটতি কমানো যাবে। বৃহত্তর ঢাকা ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্রাহকদের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর জন্য পৃথক দাম নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে। সাধারণত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো গ্রামে বিদ্যুৎ বিতরণ করে। গ্রামের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা শহরের মানুষের তুলনায় কম থাকায় তাদের গড় বিক্রয়মূল্য শহরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির তুলনায় খানিকটা কম। আরইবির ক্ষেত্রে এমনটি করা হলে শিল্পাঞ্চলের আশপাশে যে শ্রমিকরা থাকেন তাদের বিদ্যুৎ বিল বেড়ে গিয়ে জীবনমান কমে যাবে।

নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর আঘাত : ০-৭৫ এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের গ্রাহকদের মধ্যে প্রথম ধাপে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয় ৫.২৬ টাকায় এবং দ্বিতীয় ধাপে বিদ্যুৎ বিক্রি হয় ৭.২০ টাকায়। একটি এক টনের শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র যদি গড়ে ৬ ঘণ্টা করে চলে, তাহলে মাসে ১৪৪ ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ ২০০ ইউনিটের মধ্যে ১৪৪ ইউনিট যদি শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে ব্যবহৃত হয় তাহলে বাকি বিদ্যুৎ দিয়ে তিনটি পাখা, পাঁচটি লাইট, একটি ফ্রিজ, একটি টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন, মোবাইল চার্জ এবং ইন্টারনেট রাউটার চালানো সম্ভব নয়। সঙ্গত কারণে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণায় এ শ্রেণির গ্রাহক অনেক সময় এসি কেনার সাহস করেন না। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০১৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ২৫ ভাগ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হবে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক গত বছরের প্রতিবেদনে বলেছে, দারিদ্র্যের হার ২০২৪ সালের ২০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাবে। এখন যেহেতু শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ রয়েছে, সঙ্গত কারণেই বিদ্যুতের দাম বাড়লে এসব মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়বে তা বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ শ্রেণির গ্রাহকসংখ্যা কত হতে পারে : বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে যারা মধ্যবিত্তের পকেটে কাটতে চাইছে, সেই পিডিবির হিসেবেই দেখা গেছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের মোট আবাসিক গ্রাহক ছিলেন ৩৮ লাখ ৩০ হাজার ৪০৬ জন। এর মধ্যে লাইফলাইন ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বাদ দিলে পরের ধাপ ০-৭৫ ইউনিট বিদ্যুতের গ্রাহকের সংখ্যা ৪ লাখ ৮০ হাজার ৩০১ জন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ১৮ লাখ ২০ হাজার ৫৪৫ জন। মোট গ্রাহকের মধ্যে এ শ্রেণির গ্রাহকের হার ৬০ শতাংশ। অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলো এভাবে বিদ্যুতের ধাপ বিবেচনা করে দাম বাড়ানোর আবেদন করেনি। দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ৫০ ভাগের বিতরণকারী পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কোনো ধাপ রহিত করার কথা বলিনি। প্রতিটি ধাপ রেখেই দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছি।’

উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের বিদ্যুতের দাম কেমন : এখন ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটের বিদ্যুতের দাম ৮.০২ টাকা, ৪০১-৬০০ ইউনিটের বিদ্যুতের দাম ১২.৬৭ টাকা এবং ৬০১ ইউনিটের দাম ১৪ টাকা ৬১ পয়সা। সাধারণত এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি নিয়ে খুব একটা চিন্তা থাকে না। এ শ্রেণির গ্রাহকের সংখ্যাও অনেকটা কম। এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের কোনো ধাপে পরিবর্তন করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য : কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ¦ালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিলের ধাপ পরিবর্তন করে শুধু নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর চেষ্টা করা অন্যায্য। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে মানুষের জীবন এমনিতেই অতিষ্ঠ, নতুন করে এমন সিদ্ধান্ত চাপানো হলে মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে।’ তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ঘাটতি সমন্বয় করা হোক। কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে যেন টার্গেট না করা হয়।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সাবেক সদস্য আমজাদ হোসেন বলেন, ‘কেবলমাত্র পৌরসভা হলেই হবে না, ওই এলাকার মানুষের পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান আছে কি না, তাও বিবেচনা করতে হবে।’ তিনি বলেন, দিনাজপুর, নওগাঁ, কুড়িগ্রামে যেসব পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি রয়েছে, সেখানকার মানুষের আয় তো কোনো কারণে হঠাৎ বেড়ে যায়নি যে তারা বেশি দাম দিতে প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলের কোম্পানি আর আরইবির সমিতিগুলোর ধারণা আলাদা। শহরে মানুষ করপোরেট কালচারে অভ্যস্ত হওয়ায় তাদের জন্য বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি করা হয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি করা হয়েছে। ওই সমিতির পরিচালনায় গ্রাহকরাও যুক্ত থাকেন। সরকার এ ধারণা থেকে বের হয়ে গেলে গ্রামের মানুষের সঙ্গে আরইবির কর্মকর্তাদের দূরত্ব তৈরি হবে, যা সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনমানে প্রভাব ফেলবে।