যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বাঁধভাঙা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একের পর এক আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর থেকে আস্থা হারানোর কথা বলছেন। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের পর নিজ দলের সংসদ সদস্যদের ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছেন স্টারমার। অন্তত ৭২ জন এমপি সরাসরি তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। তবে এতকিছুর পরও ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ স্টারমার। দলীয় এমপির পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এখনই ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়ছেন না তিনি। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে স্টারমার বলেন, লেবার পার্টিতে নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ এক ভাষণের পর থেকেই ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য সমালোচনা বাড়তে থাকে। একজন লেবার আইনপ্রণেতা বিবিসিকে বলেন, ভাষণটি ছিল ‘অবিশ্বাস্য রকম বাজে’। সংক্ষিপ্ত হলেও এ মন্তব্য ছিল অত্যন্ত কঠোর। পরে স্টারমারের অন্যান্য দলীয় সহকর্মীর কাছ থেকে যে তীব্র সমালোচনার ঢল নামে, সেটি যেন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল এ মন্তব্য। ইতিমধ্যে মন্ত্রীদের ৬ সহযোগী (পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি) হয় পদত্যাগ করেছেন, নয়তো স্টারমারকে তার পদত্যাগের সময়সীমা নির্ধারণের ডাক দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের ৭২ এমপিও প্রধানমন্ত্রীর সরে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের আবাসন ও কমিউনিটি-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুনিয়র মন্ত্রী মিয়াত্তা ফানবুলে গতকাল মঙ্গলবার সরকারের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ফানবুলে বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করছিÑ যেন তিনি দেশ ও দলের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নেন এবং একটি সুশৃঙ্খল উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সীমা নির্ধারণ করেন।’ এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি, উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের মতো প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও স্টারমারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী, নেতা পরিবর্তনের জন্য অন্তত ২০ শতাংশ বা বর্তমানে ৮১ জন এমপির লিখিত সমর্থন প্রয়োজন। বিরোধীরা এখনো সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি এবং স্টারমারের বিকল্প হিসেবে একক কোনো নেতার নাম নিয়েও ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দলটির ডানপন্থি অংশ থেকে ওয়েস স্ট্রিটিংকে সম্ভাব্য প্রার্থী বিবেচনা করা হচ্ছে। এমপিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় অ্যান্ডি বার্নহামের নামও ঘুরেফিরে আসছে। তবে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের এই মেয়র এখন পার্লামেন্টে না থাকায় অনেকে স্টারমারকে কয়েক মাস পর পদত্যাগ করতে বলছেন, যেন এর মধ্যে বার্নহামকে উপনির্বাচনে জিতিয়ে আনা যায়। আলোচনায় রয়েছে সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রায়নার নামও।
পদত্যাগের দাবি নাকচ করে স্টারমার যুক্তি দিয়েছেন, এই মুহূর্তে নেতা পরিবর্তন করলে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। কনজারভেটিভ আমলের ১৪ বছরে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ফলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, তার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এমন অস্থিতিশীলতা কাম্য নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে বিশাল জয় এনে দিয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। তিনি দাবি করেছেন, ভোটারদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আরও সময় প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশু দারিদ্র্য হ্রাস, অভিবাসন সংখ্যা কমানো এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বা এনএইচএস-এ চিকিৎসার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য তিনি সময় চেয়েছেন। ইংল্যান্ডের এবারের স্থানীয় নির্বাচনে লেবাররা প্রায় দেড় হাজার কাউন্সিলর হারিয়েছে। উত্থান ঘটেছে ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকের। এমনকি লেবারের ঘাঁটি বলে অনেক এলাকা গ্রিনদের পকেটেও চলে গেছে। এখানেই শেষ নয়। ১৯৯৯ সালের পর ওয়েলসে প্রথমবার ক্ষমতা হারিয়েছে লেবাররা; স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্টেও তারা ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে ফল করেছে।