শ্বেতপদ্মের স্বর্গীয় শোভা

‘এক সে পদমা চৌষঠ্ঠী পাখুগী।

তঁহি চড়ি নাচঅ ডোম্বি বাপুড়ী ॥ ...

সরবর ভাঞ্জিঅ ডোম্বি খাঅ মোলাণ।

মারমী ডোম্বি লেমি পরাণ ॥’

কাহ্নপাদ (চর্যাপদ ১০)

বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের এ পঙ্ক্তিগুলোতে রয়েছে পদ্মফুলের কথা। এ পংক্তিগুলোর অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘এক সেই পদ্ম, চৌষট্টি তার পাপড়ি। তার উপর নাচছে ডোমনি। ... ওগো ডোমনি! তুমি সরোবর ভেঙে মৃণাল খাও, আমি তোমাকে বধ করব, প্রাণ কেড়ে নেব।’ কিন্তু ঘোর লাগল, এখানে যে পদ্মফুলের কথা বলা হয়েছে সে কোন পদ্ম? জাতকের এক জায়গায় মহাসত্ত্ব দীঘি খননের পর তাকে পঞ্চবিধ পদ্ম-বিভূষিত করেছিলেন। তাহলে কি পদ্ম আছে পাঁচ রকমের? এ দেশে দুই রকমের বেশি চোখে পড়েনি সাদা আর গোলাপি পদ্ম। রামায়ণে রামচন্দ্র কোথায় খুঁজে পেয়েছিলেন একশ সাতটি নীলপদ্ম, তা রামায়ণ রচয়িতা বাল্মিকীই ভালো জানেন।

নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া তার গাছপালা তরুলতা বইয়েও পাঁচ রকমের পদ্ম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে লিখেছেন ‘ত্রয়োধর্ম জাতকে দুই রকমের কুমুদ, তিন রকমের উৎপল ও পাঁচ রকমের পদ্মের উল্লেখ আছে। এই উৎপল ও নীল উৎপলের কথা আরও কয়েকটি জাতকে পাওয়া যায়। এতে মনে হয় হিমালয় অঞ্চলে এখনো হয়তো নীল উৎপল আছে। পদ্মের রং প্রধানত সাদা, লাল ও নীল হয়। লাল ও হালকা লাল দুই রকমের পদ্ম থাকলেও নীল পদ্মের অস্তিত্ব নিয়ে এখন যথেষ্ট মতভেদ আছে।’ তবে মিশ্র রং ও আকারভেদে পাঁচ রকমের পদ্ম যে আছে তা প্রাচীন বেশ কয়েকটি গ্রন্থে পাওয়া যায়। এমনকি কালিদাসের ঋতুসংহারের তৃতীয় সর্গে শরৎকালের বর্ণনায় শ্বেতপদ্মের উল্লেখ আছে। আর আধুনিককালে এসে এখন সংকরায়িত শতরকমের পদ্ম দেখাও অসম্ভব না।

পদ্ম জন্মে পাঁক বা পঙ্কে, এজন্য এর আর এক নাম পঙ্কজ। পদ্মফুলের পাপড়ির সংখ্যা জানি না একশটা কি না, না হলে এর আর এক নাম শতদল হলো কেন? চর্যাপদে তো চৌষট্টিটা পাপড়ির কথা বলাই হয়েছে। আসলে কয়টি? আবার একালে উদ্ভিদ প্রজননবিদরা পদ্ম ফুলের প্রজনন ঘটিয়ে হাজার পাপড়ির হাইব্রিড পদ্মেরও সৃষ্টি করেছেন যা বাগানীদের কাছে ‘সহস্রদল পদ্ম’ নামে পরিচিতি হয়ে উঠেছে। সংকরায়িত এসব জাতের পদ্মগুলো লালিত বা পালিত, বন্য না।

বুনো পদ্ম বলতে যা বোঝায় তা হলো প্রধানত দুই রকমের পদ্ম সাদা ও লাল-গোলাপি। পদ্ম নিলাম্বোনেসী গোত্রের জলজ বিরুৎজাতীয় গাছ। সাদা পদ্ম  বা শ্বেতপদ্ম (Nelumbo nucifera) ও গোলাপি পদ্মের প্রজাতিগত নাম একই, শুধু রং আলাদা। জলের নিচে পাঁক বা কাদায় থাকা কন্দ থেকে বেরিয়ে আসা ফেঁকড়ির নাম মৃণাল। মৃণালের মাথায় গম্বুজের মতো কুঁড়ি হয়, কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটে সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। দুপুর পর্যন্ত ফুল ফুটে থাকে, এরপর ধীরে ধীরে পাপড়ি বন্ধ হতে শুরু করে। শাপলার সঙ্গে পদ্মের এই একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। শাপলা বা কুমুদ ফোটে রাতে, সকালে কিছুক্ষণ থাকার পর বন্ধ হয়ে যায়। পদ্ম ফুল ফোটে গ্রীষ্ম-বর্ষায়, শরতেও থাকে। পদ্মের সঙ্গে সম্বন্ধ দিনের, আর শাপলার সঙ্গে সম্বন্ধ রাতের।

পদ্ম ফুল ফোটার এ রহস্য সত্যি কি না তা যাচাই করতে কয়েক বার পদ্মবিলে ও পুকুরে নানা সময়ে ঢুঁ মেরেছি। বৈশাখ মাসে দিন কয়েক আগে দুপুরের পর গিয়েছিলাম রমনা কালী মন্দিরের পুকুরটায়। অসংখ্য পদ্ম গাছে পুকুরের জলতল ছেয়ে আছে, জলের দেখা পাওয়াই মুশকিল। ফুলও অনেক, কিন্তু পূর্ণ প্রস্ফুটিত ফুল নেই একটাও। হলো না, ছবি তুলতে না পেরে ফিরে এলাম। অবশেষে উনিশে বৈশাখ ভোর ৬টায় গেলাম, সূর্য ওঠার সাথে সাথেই দেখব সেসব পদ্ম ফুলের পূর্ণরূপ। মন্দিরে সুউচ্চ চূড়ার ওপর দিয়ে পূর্বদিকে থেকে রোদ পড়েছে সে পুকুরের উপর। চিকচিক করছে শত শত শে^তপদ্ম ফুল, থালার মতো গোল গোল বিশাল পাতা। দূর থেকে সে দৃশ্য আহা কি মনোরম! জানিনা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার সেই ভ্রমররা পদ্মফুলের মাথায় খেলা করে কি না। এত কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে নিশ্চয়ই সেসব ফুলে ফুলে ভ্রমররা ঘুরে বেড়াচ্ছে। না হলে মাঝেমধ্যে ডাঁটির মাথায় কাপের মতো যে সবুজ সবুজ ফল দেখছি সেগুলো কি করে গঠিত হতো? সেসব ফলও নমপেনের ফুটপাতে দেখেছি বিক্রি হতে, সেখানকার মানুষরা সেসব ফল কিনে তার ভেতর থেকে বীজ বের করে শাস খায়। স্বাস্থ্যের জন্য নাকি দারুণ উপকারী।

চিরঞ্জীব বনৌষধি বইয়ের লেখক শিবকালী ভট্টাচার্য পদ্মের ভেষজ গুণের কথা লিখেছেন ‘এই জলজ উদ্ভিদটির মূল থেকে ফুল পর্যন্ত প্রতিটি অংশই রোগ প্রতিকারের কাজে লাগানো হয়।’ জ্বরে গায়ে দাহ হলে পদ্মপাতার ওপর শুয়ে থাকলে তা কমে যায়। ছোটবেলায় দেখেছি, গ্রামের হাটবাজারে পদ্মপাতায় লবণ, শক্ত গুড়-পাটালি, মিষ্টি, বাতাসা ইত্যাদি মোড়ক করে বিক্রি করতে। এমনকি শ্রাদ্ধ বাড়িতে পদ্মপাতাকে থালার মতো ব্যবহার করে তাতে আহার করেছি। এখন পলিথিন, প্লাস্টিক, মেলামাইন এসে সেসব পরিবেশবান্ধব চর্চা সমাজ থেকে উঠে গেছে। তা ছাড়া অতীতে বিল-ঝিলে যে পরিমাণ পদ্মগাছ ছিল, এখন কি আর তা আছে? দিন দিন জলাশয় কমছে, পদ্মরাও হারিয়ে যাচ্ছে।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ