২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় যখন বিজয়ের উল্লাস শুরু হয়, তার ঠিক আগমুহূর্তে রাজশাহীর রাজপথে বয়ে যায় রক্তধারা। ওইদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার আগমুহূর্তে রাজশাহী নগরীর আলুপট্টি, শাহ মখদুম কলেজ এলাকায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারান সাকিব আঞ্জুম ও আলী রায়হান। আহত হন অনেকেই। তবে সেই ঘটনায় দুই জুলাই শহীদের পরিবার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে হতাশ।
জুলাই অভ্যুত্থানে রাজশাহীর আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সমন্বয়করাও বলছেন, যে আশা নিয়ে তারা জীবনবাজি রেখেছিলেন, দুই বছরে তার অনেক কিছুই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। তবে পরিবর্তিত মুক্ত পরিবেশ এবং কথা বলার অধিকার ফিরে পাওয়াকে তারা স্বস্তির জায়গা হিসেবে দেখছেন।
জানা যায়, ৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী নগরীতে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। আন্দোলনকারীদের ওপর মুহুর্মুহু গুলি চালানো হয়। দুপুর প্রায় সোয়া ১টা পর্যন্ত আলুপট্টি ও শাহ মখদুম কলেজ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। নিহত হন সাকিব ও রায়হান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয়ভাবে সেদিন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। আন্দোলনকারীরা সকাল থেকেই নগরীর তালাইমারী মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। তালাইমারীসহ আশপাশের এলাকায় ছাত্র-জনতা জড়ো হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা মিছিল নিয়ে নগরীর সাহেববাজারের দিকে রওনা হন। সে সময় সাহেববাজারের কিছুটা আগেই আলুপট্টি মোড়ে অবস্থান নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশও। আন্দোলনকারীদের মিছিলের সামনের অংশ শাহ মখদুম কলেজ অতিক্রম করতেই হামলা শুরু হয়। এরপরও তারা সামনে এগিয়ে যান। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা পিছু হটলে একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনকারীরা। শুরু হয় ত্রিমুখী সংঘর্ষ। ওইদিন বিকেলে প্রাণ হারান সাকিব। শতাধিক আহত হন, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন ৩০ জন। মাথায় গুলিবিদ্ধ শিবির নেতা আলী রায়হান চিকিৎসাধীন মারা যান। তবে এর কিছুক্ষণ পরই শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজশাহী মহানগরের রাস্তায় নেমে আসে লাখো মানুষ।
রাজশাহীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিনল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাকিব। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। ছেলে হারানোর শোকের পাশাপাশি বিচারহীনতার আশঙ্কাও তাড়া করছে তার পরিবারকে। সাকিবের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। তার খুনিদের বিচার হলে কিছুটা সান্ত¡না পাব।’ তার বাবা মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘দুই বছরেও সেই আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন দেখছি না। মামলারও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। দেশটাও বদলায়নি। এখন আমাদের একটাই চাওয়া, সঠিক বিচার।’
রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী শহীদ আলী রায়হানের ভাই রানা ইসলাম বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু সেটি পূরণ হয়নি। মামলার চার্জশিট হলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে আমাদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।’
রাজশাহীর আলোচিত এই দুই হত্যাকান্ডের বিচার কার্যক্রম এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুই হত্যা মামলার চার্জশিট দেয় রাজশাহীর পুলিশ। দুই মামলায় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক রাসিক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনসহ ২৪৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এরপর মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিচারপ্রার্থীরা ক্ষুব্ধ হলেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই তারা কাজ করছেন।
অন্যদিকে এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এতে খায়রুজ্জামান লিটনসহ ৩৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) এ অভিযোগ দাখিল করে।
জুলাই আন্দোলন প্রসঙ্গে রাবির তৎকালীন সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, রাবি ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করতে পারার পর এ অঞ্চলের আন্দোলনে বাড়তি গতি আসে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্ররাও আন্দোলনে যুক্ত হয়। আন্দোলনে রাবির ছাত্রীদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন শিক্ষকও যুক্ত হন।
