দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ ঘটনাকে ‘জঘন্য হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ শোক ও নিন্দা জানানো হয়। এর আগে গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ জেলার জিবদিন এলাকায় তাদের আবাসস্থলে ইসরায়েলের বিমান হামলায় তারা মারা যান। তারা হলেন সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৩৮) ও একই জেলার আশাশুনির কাদাকাটি এলাকার আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম (২৬)।
স্থানীয় ও নিহতদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, সংসারের অভাব ঘোচাতে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে আর সন্তানদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে লেবাননে যান শফিকুল ও নাহিদুল। কিন্তু ইসরায়েলের বিমান হামলায় শেষ করে দিল সব স্বপ্ন। পরিবার দুটি স্বজন হারানোর বেদনা আর মাথার ওপর ঋণের বোঝায় এখন দিশেহারা।
আফসার আলীর একমাত্র ছেলে শফিকুল ছিলেন পরিবারের শেষ ভরসা। অভাবের সংসারে বড় হওয়া শফিকুল একসময় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে থাকতেন। পরে তিনটি এনজিও থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একটি ঘর নির্মাণ করেন। সে ঋণের চাপ আর সংসারের টানাপড়েন থেকেই মাত্র তিন মাস আগে লেবাননে যান তিনি। বিদেশে গিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করতেন শফিকুল। গত মাসে প্রথম কিস্তিতে ৪০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। স্ত্রী রুমা খাতুন ও দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন কেবল কান্নার গল্প।
শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী রুমা খাতুন বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। দুই শিশুকন্যা নির্বাক হয়ে বসে আছে। বাবা আর কোনোদিন ফিরবে না, সেটি তারা এখনো বুঝতে পারছে না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমা খাতুন বলেন, ‘আমার দুই মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিল। এখন আমি কীভাবে বাঁচব? সরকার যেন দ্রুত ওর মরদেহ দেশে আনে।’ বৃদ্ধ আফসার আলী চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম সুখের আশায়। এখন সে লাশ হয়ে ফিরছে। আমি শুধু শেষবার ছেলের মুখটা দেখতে চাই।’
একইভাবে শোকের ছায়া নেমে এসেছে আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামেও। নাহিদুল ইসলাম ছিলেন দরিদ্র পরিবারটির একমাত্র আশার আলো। বাবার ঋণের বোঝা কমাতে নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করে এবং সুদের টাকা নিয়ে লেবাননে পাড়ি জমান তিনি। যাওয়ার পর মাত্র এক মাস আগে ৩৭ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন বাড়িতে। অশ্রুসজল কণ্ঠে নাহিদুলের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, ‘ছেলে বলেছিল সব ঋণ শোধ করবে। আজ ছেলে নেই, আমি এ ঋণের বোঝা নিয়ে কী করব?’ মা নুরুন্নাহার খাতুন ছেলের শোকে শয্যাশায়ী। পুরো কাদাকাটি গ্রামজুড়ে এখন শোকের আবহ।
ধুলিহর ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘পরিবার দুটি অত্যন্ত অসহায়। ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিল। এখন সন্তান হারিয়ে তারা মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব।’ গতকাল শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান সাতক্ষীরা সদর ইউএনও অর্ণব দত্ত। পরিবার দুটিকে সহযোগিতার জন্য সব ধরনের চেষ্টার আশ্বাস দেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, লেবাননে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে এবং নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সহিংসতা ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিতে বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগ জানায়। এ পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।
আরও এক যুবকের মৃত্যু : লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ড্রোন হামলায় শুভ কুমার দাস (২৮) নামে সাতক্ষীরার আরও এক যুবক নিহত হয়েছেন। গত সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলের সময় ড্রোন হামলায় মারা যান তিনি। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানান কলারোয়া ইউএনও আরিফুল ইসলাম। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিহতের পরিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ নিয়ে সোমবার ইসরায়েলের পৃথক হামলায় লেবাননে তিনজন বাংলাদেশি মারা গেল। তারা সবাই সাতক্ষীরার বাসিন্দা।
নিহত শুভ দাস কলারোয়া উপজেলার শ্রীপ্রতিপুর গ্রামের সুরঞ্জন দাসের ছেলে। সুরঞ্জন দাস জানান, শুভ দাস প্রায় তিন বছর ধরে লেবাননে আছে। সেখানে একটি বাড়ি ও সংলগ্ন ফলের বাগান দেখাশোনার কাজ করত। তার আয়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিল তাদের পরিবার।