আজ ১৩ মে। টাঙ্গাইলবাসীর স্মৃতিতে শোক, বেদনা ও আতঙ্কের এক কালো অধ্যায়। আজ থেকে ৩০ বছর আগে ১৯৯৬ সালের এই দিনে ভয়াবহ টর্ণেডোর আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। মুহূর্তের সেই প্রাকৃতিক তাণ্ডবে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় হাজার হাজার ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা।
১৯৯৬ সালের ১৩ মে সোমবার বিকেলে আঘাত হানা ভয়াবহ ওই টর্ণেডো জেলার গোপালপুর, কালিহাতী, ঘাটাইল, বাসাইল ও সখীপুর উপজেলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২৩৭ জন নিহত হলেও বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। আহত হন ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৮৫ হাজার ঘরবাড়ি, ৮৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১৭ মসজিদ ও ১৪ মন্দির।
অনেক পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। স্বজন হারানোর সেই আর্তনাদ আজও ওইসব এলাকার মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
জানা যায়, বিকেল ৪টা ১৭ মিনিটে গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের বেলুয়া গ্রাম থেকে টর্ণেডোটি শুরু হয়ে আলমনগর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। মাত্র ২ থেকে ৩ মিনিট স্থায়ী হলেও এর ভয়াবহতা ছিল অকল্পনীয়। গোপালপুর উপজেলার বরভিটা, বরখালী, মির্জাপুর, জয়নগর, আলমনগর, দিঘলআটা, বরশিলাসহ অন্তত ১৬ গ্রাম সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। এতে ১০৪ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়। ধ্বংস হয়ে যায় ফসলের মাঠ, গবাদিপশু ও অসংখ্য মানুষের সহায়-সম্বল।
একই দিন বিকেল সোয়া ৫টার দিকে কালিহাতী উপজেলার রামপুর ও কুকরাইল গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আরেকটি টর্ণেডোতে প্রাণ হারান আরও ১০৫ জন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্যও ছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে অনেক মরদেহ গণকবরে দাফন করতে হয়।
অন্যদিকে বাসাইল উপজেলার মিরিকপুর এলাকায় তখন চলছিল ধান কাটার মৌসুম। বহিরাগত শ্রমিকদের একটি দল আশ্রয় নিয়েছিল মিরিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। কিন্তু টর্ণেডোর আঘাতে বিদ্যালয়টি ধসে পড়লে অনেকে চাপা পড়ে মারা যান। পরদিন খাল, বিল ও পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় বহু মরদেহ।
এ দুর্যোগে বাসাইল উপজেলার প্রায় ১৭ গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতির মুখে পড়েন প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার মানুষ। সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় প্রায় তিন হাজার ঘরবাড়ি। প্রাণ হারায় শত শত গবাদিপশু। ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নলকূপ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই ভয়াল দিনের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি টাঙ্গাইলের মানুষ।
প্রতি বছরের মতো এবারও ১৩ মে উপলক্ষে গোপালপুরের আলমনগর, কালিহাতীর রামপুর খামারবাড়ি ও বাসাইলের মিরিকপুরে দোয়া মাহফিল, স্মরণসভা, প্রার্থনা ও কাঙালিভোজের আয়োজন করা হয়েছে। নিহতদের স্মরণে স্থানীয়রা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।