বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে প্রতি বছর ৫ হাজার কোটি টাকা সরকারের জিওবি ফান্ড থেকে ব্যয় হবে। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা হবে। চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পদ্মা ব্যারাজ (১ম পর্যায়) প্রকল্প প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। একই সভায় আরও ৮টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে কার্য তালিকায় ১১ নম্বরে ছিল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। এর আগের একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলেও অনুমোদন মেলেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও প্রকল্পটি একনেক সভায় উঠেছিল।
সভা শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা পূর্ণ হবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিও হবে। ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে ওই অঞ্চলের মানুষ মাত্র ১৫ শতাংশ পানি পায়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে খরার সৃষ্টি হয়। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা এ ক্ষতিটা পুষিয়ে ওই অঞ্চলের মানুষকে সুবিধা দিতে পারব। কৃষি খাতসহ অন্যান্য দিক বিবেচনায় এটি ‘মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আজকে (বুধবার) সেটা বাস্তবায়নের জন্য একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। সাত বছর লাগবে প্রকল্পটি শেষ করতে। প্রকল্পে প্রতি বছর ৫ হাজার কোটি টাকা সরকারের জিওবি ফান্ড থেকে ব্যয় হবে।
জানা গেছে, মূলত ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে দেশে যে পানির অভাব দেখা দেয় এবং এর ফলে যে লবণাক্ততার সৃষ্টি হয়, তা রোধ করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এ ছাড়া প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা। পদ্মা ব্যারাজের মোট প্রকল্প এলাকা দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা চারটি বিভাগের ২৬টি জেলার ১৬৩টি উপজেলায় বিস্তৃত।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ হবে রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট (প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার), ১৮টি আন্ডার সøুইসগেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক, দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস ও ব্যারাজের ওপর দিয়ে একটি রেলওয়ে সেতু। পাশাপাশি প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। গড়াই অফটেক এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে ১৫টি স্পিলওয়ে, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক, গাইড বাঁধ, অ্যাপ্রোচ এমব্যাংকমেন্ট করা হবে। চন্দনা অফটেক অবকাঠামোতে চারটি স্পিলওয়ে নির্মাণ হবে। হিসনা অফটেক অবকাঠামোতে পাঁচটি স্পিলওয়ে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদী ব্যবস্থায় প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা কমবে, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা পাবে এবং প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও সরকারের পরিকল্পনা বিভাগ সূত্র জানায়, অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পের মধ্যে নতুন তিনটি এবং সংশোধিত প্রকল্প রয়েছে পাঁচটি। এ ছাড়া অন্য একটি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। ৯টি প্রকল্পে ব্যয় হবে ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৬ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অনুমোদন পাওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দুটি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি করে প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। সভায় পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের দুটি প্রকল্পের বিষয়ে অবহিত করা হয়। প্রকল্প দুটি হলো ময়মনসিংহ জিলা স্কুল-ময়মনসিংহয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ও বিমানবাহিনী ঘাঁটি কুর্মিটোলায় বিমানসেনা ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প।