রমজান আলী। এক যুগ পর প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে আসেন গত শুক্রবার। প্রায় আট ঘণ্টা উড়োজাহাজে কাটিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখার পরই হয়ে পড়েন আবেগাপ্লুত। তবে বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে শাহজালালের বহুতল কার পার্কিংয়ে আসামাত্র বিড়ম্বনা তাকে ছেঁকে ধরে। এক ঘণ্টা পার করে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার আগে কয়েকজন দালাল ‘বকশিশ’ দাবি করে বসেন। দিতে না চাইলে গালিলাজের মুখে পড়েন রমজান আলী। নিরুপায় হয়ে ১০০ টাকা একজনের হাতে গুঁজে দিয়ে কোনোমতে পরিত্রাণ পান। কার পার্কিংয়ের মতো আগমনী দুটি টার্মিনালের ভেতর ও বাইরেও নানা বিশৃঙ্খলায় ভরপুর। আর এটাই দেশের প্রধান বিমানবন্দরের প্রতিদিনের ‘স্বাভাবিক’ চিত্র।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি অংশে অরাজকতার যেন শেষ নেই। কার পার্কিং থেকে শুরু করে ক্যানোপি, ইমিগ্রেশনসহ সবখানেই সীমাহীন বিশৃঙ্খলা। নেই শক্ত নিরাপত্তার বালাই। সর্বত্র অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। যেখানে-সেখানে পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি বা বিমান চলাচল নিরাপত্তা বিভাগের (এভসেক) সঙ্গে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার আছে দূরত্ব। কার পার্কিং নিয়ন্ত্রণের জন্য ইজারাদার না থাকায় বাধ্য হয়ে পরিচালনা করছে বেবিচক। পার্কিং এলাকায় যত্রতত্র দোকানপাট ও ভাসমান হকারে ভরপুর।
বিমানবন্দরের টয়লেটের অবস্থা শোচনীয়। অনেক জায়গায় ফ্লোরে আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নির্দিষ্ট সময় পর পর ময়লার প্যাকেট বা ঝুড়ি সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। এই বিমানবন্দরে প্রায় ৩০ বছর ধরে একই ইজারাদার একে ট্রেডার্স পরিচ্ছন্নতার কাজ পাচ্ছে। অভিযোগ আছে প্রতিটি সরকারের সময়েই উচ্চমহলের সঙ্গে সখ্যের জোরে তারা কাজ পাচ্ছে। তবে পরিচ্ছন্নতার চিত্রে দিন দিন অবনতি ঘটছে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিজের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘যেকোনো যাত্রীর জন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যতবারই আমরা ভ্রমণ করেছি, প্রতিটি শৌচাগার থেকেই অ্যামোনিয়ার তীব্র গন্ধ পেয়েছিলাম। বিমানবন্দরের টার্মিনালে প্রবেশপথে অব্যবস্থাপনা, মানুষের ভিড়, সার্ভারের জটিলতা, ট্রলি সংকট, লাগেজ পেতে অযৌক্তিক বিলম্ব সবকিছু যেন একটা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। প্রতিটি যাত্রীর জন্য এটা পুরোপুরি নির্যাতনের মতো। কোনো জবাবদিহি কিংবা উন্নতির লক্ষণ নেই।’
ওই পোস্টে একজন মন্তব্য করেন, ‘দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাবার পর সত্যিই কষ্ট হয়, বিশেষ করে বাচ্চাদের। আমাদের আবার চট্টগ্রামের কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার জন্য ডমেস্টিকেও বসে বসে মশার কামড়ও খেতে হয়।’
সিন্ডিকেটের প্রভাব : বেবিচক সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। এটি প্রবাসী ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিংয়ের প্রথম বিন্দু। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটির কার পার্কিং, আগমন-বহির্গমন টার্মিনাল এলাকা এবং বহিঃপ্রাঙ্গণের সামগ্রিক যাত্রীসেবা বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। তদারকি ও সমন্বয়ের অভাব, সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং ‘সর্দারহীন’ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার প্রবাসী, বিদেশি পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীরা। পার্কিং এলাকার অনিয়ম, ভাসমান ও ভবঘুরেদের দাপট, বকশিশের নামে অর্থ আদায়, ট্রলি আটকে রাখার সিন্ডিকেট এবং নিরাপত্তাকর্মীদের চোখের সামনেই চলা মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে যাত্রী হয়রানি সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
একসঙ্গে তিনটির বেশি ফ্লাইট নামলেই সেবা এলোমেলো : বিমানবন্দরে একসঙ্গে তিনটির বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নামলেই যাত্রীসেবা এলোমেলো হয়ে পড়ে। স্ক্যানিং মেশিন কম থাকার কারণে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। উড়োজাহাজ থেকে বেল্টে লাগেজ আসতেও বেশি সময় লেগে যায়। সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্য ও কলকাতা থেকে আসা যাত্রীদের তল্লাশির মুখে পড়তে হচ্ছে বেশি। সরেজমিন দেখা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টা ২৫ পর্যন্ত সময়ে ৯টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিমানবন্দরে নামে। এর মধ্যে ছয়টি ফ্লাইট মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। এ সময় যাত্রী ও লাগেজের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে দেখা গেছে বিমানবন্দরের কর্মীদের।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, শুধু নতুন নতুন পরিকল্পনা নিলে হবে না, প্রয়োজন কঠোর তদারকি। আইকাও-এর মানদণ্ড বজায় রাখতে না পারলে দেশের কালো তালিকায় পড়ার ঝুঁকি আছে। তবে বেবিচক-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, শাহজালালের নিরাপত্তা বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভিআইপি ও ভিভিআইপি যাত্রীদের লাগেজ স্ক্রিনিংয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে বলা হয়। মেটাল ডিটেক্টর ও এক্স-রে মেশিনে স্ক্যানের পরও অবশ্যই ম্যানুয়ালি পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে আগাম অনুমতির বাধ্যবাধকতা কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
নতুন নির্দেশনাও অকার্যকর : বিমানবন্দরে যাত্রীদের বিদায় জানানো বা অভ্যর্থনা জানাতে আসা ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছরের ২৫ জুলাই নতুন নির্দেশনা জারি করে বেবিচক। তবে এতে কোনো কাজ হয়নি। নির্দেশনায় বলা হয়, একজন যাত্রীকে বিদায় বা অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্থান বা আগমন এলাকায় দুজনের বেশি প্রবেশ করতে পারবে না। তবে সরেজমিনও দেখা গেছে, একেক যাত্রীর সঙ্গে ৮ থেকে ১০ জনও আসছেন। দর্শনার্থীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
কার পার্কিংয়ে অতিরিক্ত ফি ও সিন্ডিকেটের দাপট : শাহজালালের কার পার্কিং ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে একটি নির্দিষ্ট বলয় ও অব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে গাড়ি পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট ফি থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। রাতে ও ভোরের শিফটে টার্মিনাল এবং পার্কিং এলাকায় পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় নির্ধারিত পার্কিং ফির তুলনায় তিনগুণ টাকা আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। ইজারাবিহীন পার্কিং এলাকা মাসখানেক ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে বেবিচক। এর আগে পলাশ ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ দায়িত্বে ছিল। তাদের বিরুদ্ধে নিজেদের ইচ্ছামতো ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। দেখা গেছে, যাত্রী বা দর্শনার্থীদের যানবাহন থেকে তিন ঘণ্টার জন্য ৩০০ টাকা রাখা হয়। অতিরিক্ত সময়ের জন্য দিতে হয় বাড়তি টাকা। অথচ অর্থ দিয়েও যথাযথ সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সরেজমিন দেখা গেছে, নিচতলা থেকে শুরু করে তৃতীয়তলা পর্যন্ত নোংরা পরিবেশ। পার্কিংয়ের ভেতরে কনফেকশনারির দোকান বসানো হয়েছে। সেখানে সারাক্ষণ ভিড় লেগেই থাকে। টয়লেটের অবস্থাও শোচনীয়। গাড়ির চালকরা বিভিন্ন স্থানে বসে আড্ডা দেন। কেউ কেউ গাঁজা বা ধূমপান করে পার্কিং এরিয়ার পরিবেশ খারাপ করে তুলছে।
ভবঘুরেদের দাপট : টার্মিনাল ভবন থেকে বের হওয়া মাত্রই ভবঘুরেরা প্রবাসীদের ভারী লাগেজ অনেকটা জোর করে ট্রলিতে তুলে দেয়। এরপর নির্দিষ্ট ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘বকশিশ’ দাবি করে তারা। টাকা দিতে না চাইলে বা কম দিলে জোটবেঁধে যাত্রীদের হয়রানি করতে দেখা গেছে। বিদেশিদের কাছেও অর্থ দাবি করছে তারা। অভিযোগ আছে পুলিশের চোখের সামনেই ঘটছে এসব ঘটনা।
ক্যানোপি এলাকা বিশৃঙ্খল : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বিমানবন্দরে ক্যানোপি ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, দুই বছর পরও তা ঠিক হয়নি। দেখা গেছে, আগমনী যাত্রীর সঙ্গে ক্যানোপির ভেতরেই গাড়ি ভর্তি লোকজন উঠে যাচ্ছেন। তাদের কেউ বাধা দিচ্ছেন না। বহির্গমন ক্যানোপিতে সৌদি আরবগামী যাত্রী ওয়াব মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে বিদায় জানাতে স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, মা ও বাবার পাশাপাশি কয়েকজন প্রতিবেশী একটি হাইয়েস গাড়ি ভাড়া করে এসেছেন। বিধিনিষেধের বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’
এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, ‘আমরা ক্যানোপির ভেতরে অতিরিক্ত মানুষ না আসার জন্য প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছি এবং সচেতন করার চেষ্টা করছি। কিন্তু মানুষ কোনো কথাই শুনতে চায় না। তারপরও আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
ইমিগ্রেশনে ধীরগতি : আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শাহজালালে প্রতি ৩ মিনিটে একজনের ইমিগ্রেশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। ‘যাচাই-বাছাই’-এর নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। প্রায়ই দেখা যায়, পর্যাপ্ত জনবল থাকার পরেও একেকটি ডেস্কের সামনে যাত্রীদের অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার বৈধ কাগজপত্র থাকা অনেক যাত্রীকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এভসেকের সঙ্গে অন্য সংস্থার সমন্বয়ের ঘাটতি : বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, শাহজালালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার যাত্রী ও দর্শনার্থী আসা-যাওয়া করেন। বিমানবন্দরে নিরাপত্তার জন্য একাধিক সংস্থা নিয়োজিত থাকলেও সমন্বয়হীনতা ও কার্যকর জবাবদিহির অভাবে অপরাধী ও বহিরাগতদের তৎপরতা কমছে না বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে এভসেকের সঙ্গে পুলিশসহ আরও কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ের ঘাটতির কারণেই এটি ঘটছে। নাম প্রকাশ না করে এপিবিএনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এভসেক সদস্যরা আমাদের মানুষই মনে করেন না। আমাদের দায়িত্বে তারা হস্তক্ষেপ করেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাহজালালসহ দেশের সবকটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা দিতে আমরা একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছি। যাত্রী সেবার মান বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েও কাজ চলছে। ইতিমধ্যে সেবার মান বেড়েছে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না।’
