নিজে ছিলেন পেসার, বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন তিনটি টেস্ট। চার ইনিংসে বোলিং করে উইকেটের স্বাদ নিতে পারেননি। উইকেট নেই, ক্যারিয়ার থেমে গেছে; এটা আলমগীর কবিরের জীবনের বিবর্ণ এক অধ্যায়। আনন্দ মেলেনি, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ছোট্ট পথচলায় দুঃসহ স্মৃতি আজও সঙ্গী তার। পেসার হয়ে আরেক পেসারের দুর্ধর্ষ স্পেল মুখ বুঝে সহ্য করে নিতে হয়েছিল সাবেক এই ক্রিকেটারকে। ২০০৩ সালে পেশোয়ারে দারুণ অবস্থায় থাকা বাংলাদেশকে একাই গুঁড়িয়ে দেন ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গতিময় পেসার শোয়েব আখতার। ২৩ বছর আগে গতির কাছে হার মেনে নেওয়া সেই দলের সদস্য আলমগীরই এখন পাকিস্তানের বিপক্ষে গতির কারণে গর্বিত, তিনিই যে বাংলাদেশের পেস সেনসেশন নাহিদ রানার প্রথম গুরু।
৪.৫ ওভার, ১০ রান, ৪ উইকেট। ছোট্ট একটি স্পেল, কিন্তু এখানে গতির ঝড়, বাউন্সার, রিভার্স সুইং কী নেই! রানার আগুনে ছারখার পাকিস্তান অসহায় আত্মসমর্পণে ম্যাচ হারে ১০৪ রানে। আগে এক উইকেট নেওয়া ডানহাতি এই তরুণের ঝুলিতে মোট ৫ উইকেট, যা চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে প্রথম। মাত্র ১০ টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঠে নামা রানার করা এমন ঝলমলে পারফরম্যান্সে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই আলমগীরের। গর্ব করে বলতে পারছেন, ‘ওকে আমি কোচিং করিয়েছি, আমাদের নিয়মিত কথা হয়।’ রাজশাহীর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে প্রথম দিন রানাকে দেখেই ভবিষ্যৎ তারকার ছবি আঁকা আলমগীরের বিশ্বাস, তার ছাত্র একদিন বিশ্বসেরা পেসার হবে।
রানা প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় প্রিয় শিষ্যের সঙ্গে পরিচয়, তাকে নিয়ে কাজ করা, ছেলের মতো স্নেহ দেওয়া, তার কাছে প্রত্যাশাসহ অনেক কিছু নিয়ে কথা বলেছেন আলমগীর। সবার আগে জানালেন পাকিস্তানের বিপক্ষে রানার পারফরম্যান্সে নিজের ভালো লাগা ও গর্বের কথা। বললেন, ‘খুবই ভালো লাগছে, গর্ব তো হবেই। ও এখন অনেক ধারাবাহিক। সবাই বলতো ও অনেক শর্ট বল করে, সেখান থেকে বেরিয়ে নিজে গুছিয়ে নিচ্ছে সে। আগেই বলেছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয়ে উঠবে ও। সেটা হচ্ছে, ভালো পারফর্ম করছে, এটা আমার জন্য খুবই ভালো লাগার। নিজের কাছে অন্যরকম লেগেছে এবং সুখ কাজ করেছে। মনে হয়েছে যে, না আমি তাকে নিয়ে যে কাজ করেছি।’
১৪৭ কিমি গতির ডেলিভারিতে রিভার্স সুইং, ধন্ধে পড়ে ব্যাট না চালিয়ে বোল্ড মোহাম্মদ রিজওয়ান। রানার এমন ডেলিভারিতে বিস্মিত নিজ দলের অনেকেই। কিন্তু আলমগীরের কাছে এটা স্বাভাবিক, ‘এটা নিয়ে প্রথম থেকেই কাজ করেছি। কারণ ও যখন টেপ টেনিসে বোলিং করত, দুই দিকেই সুইং হতো। বলের ভারী দিকে সুইং হতো। যখন দেখেছি, তখন থেকেই মনে হতো ও জোরে বল করলে যেমন একটা সুইং থাকবে তার, একসময় রিভার্স সুইং করাতে পারবে এবং এটা স্বাভাবিক। সেটাই ও করে দেখাচ্ছে। অনেকেই বলছে, এটা আশ্চর্য হওয়ার মতো, কিন্তু এটাই ন্যাচারাল। বয়সভিত্তিক পর্যায়েই ওর সঙ্গে এটা নিয়ে কাজ করতাম। বিগত দিনগুলোতেও করত, হয়তো শর্ট অফ লেন্থ বেশি করত বলে বোঝা যেত না, কতটা রিভার্স সুইং করছে। সে যত উপরে বোলিং করবে, তত বোঝা যাবে তার সুইংটা কতটা ভেতরে বা বাইরে যাচ্ছে।’
ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে কোচিং করাতেন আলমগীর। সেখানে একদিন রানাকে দেখে চমকে যান তিনি। সেই গল্প শোনাতে গিয়ে স্থানীয় এই কোচ বলেন, ‘ক্লেমন আমার একজন বন্ধু ছিল, তিনিও কোচ। উনি বললেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটা লম্বা ছেলে আছে, জোরে বল করে, দেখতে পারেন। দেখলাম টেপ টেনিসে অনেক জোরে বল করে। তো আমি বললাম, ক্রিকেট বলে এ রকম পারবে কি না। ও বলে, হ্যাঁ পারব। তারপর ওকে বলি, কাল থেকে তাহলে সিনিয়র গ্রুপে ঢুকবে। পরে দেখলাম অনূর্ধ্ব-১৮ পর্যায়ের। ওই সময় এক বছর কাজ করে পরপর দুবার অনূর্ধ্ব-১৮ খেলেছে। দুর্ভাগ্যবশত অনূর্ধ্ব-১৯ খেলা হয়নি, তখন অনেক ভালো বোলার ছিল। তো এভাবে শুরু। আস্তে আস্তে কাজ শুরু করি, পরে ও অনেক উন্নতি করে। একাডেমিতে প্রথম দিন দেখেই বুঝেছি, ও ভালো কিছু করবে, সুপারস্টার হবে।’
পেশোয়ার থেকে মিরপুর, শোয়েব আকতার থেকে রানা। মনে করাতেই আলমগীর বলে উঠলেন, ‘সেই সময় আমাদের একজন নাহিদ রানা দরকার ছিল।’ স্মৃতির পাতা উল্টে তিনি বলতে লাগলেন, ‘এটা অবশ্যই রোমন্থনের মতো কথা। শোয়েব আক্তার এসে ছয় উইকেট নিয়ে আমাদের কোণঠাসা করে দেয়। যে রকম কাল (মঙ্গলবার) রানা করেছে। এখানে বলতে চাই, মুলতানে আমরা হয়তো এভাবে জিততে পারতাম, যদি কি না রানার মতো আমাদের একজন আগ্রাসী পেসার থাকত। তালহা, মাশরাফি, মঞ্জু ভাই বা তাপস বৈশ্য; আমাদের এভারেজ পেস ছিল। রানার মতো কেউ থাকলে আমরা হয়তো জিততে পারতাম। এতদিন পরে এসে রানা সেটা করে দেখিয়েছে। আশা করি, ও সুস্থ থেকে দীর্ঘদিন দেশের জন্য ভালো ভালো পারফরম্যান্স দেবে।’
আলমগীরের কোচিং, নিজের কঠোর পরিশ্রমে তিন বছরেই জাতীয় দলে চলে এসেছেন ১৮ বছর বয়সে একাডেমিতে ভর্তি হওয়া রানা। জাতীয় দলে প্রায় সব ফরম্যাটেই তাকে সেরা পছন্দ মনে করা হচ্ছে। গতির ঝড় তুলে রানা পাড়ি দিতে চান বহু পথ, হতে চান বিশ্বের এক নম্বর বোলার। আলমগীরের বিশ্বাস রানা সেটা হতে পারবেন, ‘ওর সঙ্গে যখন কথা হয়, ও আমাকে একটা কথা বলে যে, আমি এক নম্বর বোলার হতে চাই। ও নিজেকে বিশ্বের এক নম্বর বোলার হিসেবে দেখতে চায়। আমিও বিশ্বাস করি যে, ওর দ্বারা সম্ভব। দোয়া করি, সুস্থ থাকুক, ইনজুরিমুক্ত থাকুক, তাহলেই ও পারবে।’
এবারের মিরপুরের উইকেটকে পেস সহায়ক বলা হলেও স্পিনও ধরেছে। প্রথম ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজ নেন পাঁচ উইকেট, তাইজুল ইসলাম পান দুটি। পরের ইনিংসে এ দুজন মিলে নেন তিন উইকেট, সব মিলিয়ে এই টেস্টে স্পিনাররা পেয়েছেন ১০ উইকেট। এমন উইকেটেই আগুনঝরা বোলিংয়ে নিজের কর্র্তৃত্ব জানান দিয়েছেন রানা। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে সিলেটের স্পোর্টিং উইকেটেও যে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের জন্য আতঙ্কের নাম হবেন রানা, তা মুখস্থের মতো করেই বলে দেওয়া যায়।